সিটি নির্বাচনে ইসির কমিটি-লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরিতে
আসন্ন গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরিবেশ সুষ্ঠু রাখা ও সবার জন্য সমান সুযোগ ( লেভেল প্লেইং ফিল্ড) তৈরির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আলাদা দুটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গাজীপুর সিটির জন্য ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার ও খুলনা সিটির জন্য খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের কমিটিতে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তাদেরও রাখা হয়েছে। গত মঙ্গলবার পৃথক দুই চিঠিতে এসব কমিটি গঠনের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ইসির পাঠানো চিঠিতে আচরণবিধি প্রতিপালনের জন্য গাজীপুরে ১০ জন ও খুলনায় পাঁচজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েনের নির্দেশনা দিয়েছে। ঢাকা ও খুলনার বিভাগীয় কমিশনারদের এ সংক্রান্ত পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। ইসি সচিবালয়ে সূত্রে জানা গেছে, দুই সিটি নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশ সুষ্ঠু রাখার স্বার্থেই সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটিকে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি সভা করতে বলা হয়েছে। ওই সভার কার্যবিবরণী নির্বাচন কমিশনকে জানাতে বলা হয়েছে যা থেকে কমিশন নির্বাচনী এলাকার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নিতে পারবেন। গাজীপুর সিটি করপোরেশনের জন্য গঠিত সমন্বয় কমিটিতে আহ্বায়ক করা হয়েছে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারকে। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে গাজীপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে। এ কমিটির সদস্যরা হলেন- ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক, বিজিবির সেক্টর কমান্ডার, গাজীপুরের ডিসি ও এসপি, গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার, র‌্যাবের সংশ্লিষ্ট অধিনায়ক, আনসার ও ভিডিপির সংশ্লিষ্ট পরিচালক, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) যুগ্ম-পরিচালক, ডিজিএফআই কর্মকর্তা ও ঢাকার সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। এ কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে চিঠিতে বলা হয়েছে- নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত এবং লেভেল প্লেইং ফিল্ড তৈরিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম মনিটর করা। বিরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে তা সমাধানের ব্যবস্থা নেয়া এবং ইসিকে তা জানানো। নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সার্বিক সহায়তা করা। একই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।ওই কমিটির কার্যপরিধিও গাজীপুরের মতোই একই ধরনের নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে দুই সিটিতে আচরণবিধি তদারকি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করতে ঢাকা ও খুলনার বিভাগীয় কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে ইসি। চিঠিতে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের জন্য ১০ জন ও খুলনা সিটি করপারেশনের জন্য পাঁচজন ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করতে বলা হয়েছে। এসব ম্যাজিস্ট্রেট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন অর্থাৎ পহেলা এপ্রিল পর্যন্ত ২৪ দিন মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবেন। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর নির্বাচনী এলাকাগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেটের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। এছাড়াও এরই মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামের তালিকা ইসিতে পাঠাতেও চিঠি দিয়েছে ইসি।
গাজীপুর ও খুলনায় তোড়জোড় প্রার্থী চূড়ান্তে
১৫ মে অনুষ্ঠিত হবে গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচন উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মেয়র প্রার্থী চূড়ান্তকরণ নিয়ে শুরু হয়েছে তোড়জোড়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই ভোট হওয়ায় দুই দলের জন্যই সিটি নির্বাচনের ফলাফল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখাতে জনসমর্থন সরকারের পক্ষ্যে জানান দিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য এই ভোট অগ্নি পরীক্ষার সমতুল্য। অন্যদিকে দুই সিটিতে মেয়র পদ ধরে রাখা এবং ক্ষমতাসীনরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন বার্তা দেশবাসীকে দিতে বিজয় বিএনপির জন্য খুবই জরুরী। আবার মিটিং মিছিল করতে না দেয়ায় সারাদেশের নিষ্ক্রিয় ও হতাশ নেতাকর্মীদের জানান দেয়া যে হতাশ হওয়ার কিছু নেই সময় মতো জনগণ ফুঁসে উঠবে। এদেশের মানুষ ভোট পাগল; নির্বাচনের দিক তথা একদিনের রাজা। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ভোটের পর জনগণের তেমন খোঁজখবর না রাখলেও নির্বাচনে ভোট দেয়ার জন্য মানুষ মুখিয়ে থাকেন। নির্বাচনকে (জাতীয় ও স্থানীয়) মানুষ মনে করে উৎসব। নির্বাচন এলেই প্রার্থী এবং ভোটার দুই পক্ষই মেতে উঠে উৎসবে, আনন্দ-উল্লাসে। কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ে ভোটের অধিকার হারিয়ে মানুষ সংক্ষুব্ধ। কিছুদিন আগে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে উৎসবে মেতে ওঠে ওই এলাকার ভোটার। হঠাৎ করে নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত হওয়ায় উৎসবের সেই আনন্দ ধপ করে নিভে যায়। এখন গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় দুই সিটির বিভিন্ন পাড়ায় মহল্লায় শুরু হয়ে গেছে উৎসবের আবহ। মানুষের মধ্যে চলছে ভোট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক। কোন প্রার্থী কেমন, কোন প্রতীকের ফলাফল ভাল করতে পারে চলছে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ। দুই সিটির (গাজীপুর-খুলনা) সাধারণ ভোটাররা যখন ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে; তখন মূল প্রতিদ্ব;িদ্ব আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে চলছে তুমুল উত্তেজনা। ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের আগে দুই সিটি কর্পোশনের নির্বাচনকে মনে করছে প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা। সিটি কর্পোরেশন স্থানীয় নির্বাচন এবং সীমিত পরিসরে ভোট হলেও আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এই ভোট প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে করছে এই ভোট তাদের জন্য অগ্নি পরীক্ষা। এই ভোটে বিজয়ী হলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার শ্লোগান দিয়ে দেশবাসীর কাছে ভোটের জন্য যাওয়া সহজ হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবলও বাড়বে। তাছাড়া সারাদেশের জনগণকে বার্তা দেয়া যাবে মানুষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মকান্ডে খুশি এবং নৌকার সঙ্গেই রয়েছে। অন্যদিকে দুই সিটির বর্তমান মেয়র বিএনপি থেকে নির্বাচিত। বিএনপি চায় দুই সিটি নিজেদের পূর্বাবস্থা ধরে রাখতে। একই সঙ্গে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেশবাসী ও ক্ষমতাসীন দলকে বার্তা দিতে চায় জনগণ আওয়ামী লীগের সঙ্গে নেই। জুলুম নির্যাতন করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে বিএনপির দিকে মানুষ ঝুকে পড়েছে। এখন শুধু জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রহর গুনছে। একই সঙ্গে দুই সিটি কর্পোরেশনের এই নির্বাচন সিইসি এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের জন্য বিশেষ পরীক্ষাও বটে। এখনো তারা সবার আস্থা অর্জন করতে পারেনি। ইসি যদি সরকারের প্রভাব উপেক্ষা করে দুই সিটির নির্বাচন নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করতে পারে তাহলে তাদের প্রতি কিছুটা হলেও মানুষের আস্থার সৃষ্টি হবে। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা তাদের পক্ষ্যে দুতিয়ালী করবেন। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমদ ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, দুই সিটির নির্বাচন হচ্ছে এটা খুশির খবর। কিন্তু ঢাকা উত্তরসহ বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট সিটি নির্বাচন কেন হচ্ছে না সেটা বড় প্রশ্ন। গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত মেয়ররা বেশির ভাগ সময় স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেননি। নির্বাচিত মেয়ররা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় হয় কারাগারে নয়তো বরখাস্তের তকমা নিয়ে কাজ করা থেকে বিরত ছিলেন। গাজীপুরে ২০১৩ সালের ৬ জুলাই এবং খুলনায় ২০১৩ সালের ১৫ জুন ভোট অনুষ্ঠিত হয়। খুলনা সিটির সঙ্গে একই দিনে রাজশাজী, বরিশাল ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনেও ভোট হয়। সবগুলো সিটি কর্পোরেশনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বিজয়ী হওয়ায় নির্বাচিত মেয়রদের ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়তে হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতাবলে সিটি মেয়রদের দফায় দফায় দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি, কোর্টের রায়ে আবার দায়িত্ব গ্রহণ আবার অব্যাহতি; পুনরায় কোর্টের নির্দেশে দায়িত্ব পুনর্বহাল করার ঘটনা ঘটে। শুধু তাই নয় নির্বাচিত মেয়রদের একের পর এক মামলায় জড়িয়ে গ্রেফতার এবং বছরের পর বছর কারাগারে বন্দী রাখা হয়। জামিনে বের হয়ে আসার পর আবার গ্রেফতার করে কারাগারে নেয়া হয়। নির্বাচনের পর থেকেই মন্ত্রণালয় ও নির্বাচিত মেয়রদের এই টম-জেরি খেলা সাধারণ ভোটাররা ভালভাবে নেননি। ফলে জুলুম নির্যাতনের শিকার মেয়রদের ওপর সাধারণ মানুষের সহানুভুতি আরো বেড়ে গেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাড়ে ৬ মাস আগে হচ্ছে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা এবং বিএনপির ধানের শীষ মার্কার প্রার্থীদের মধ্যে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে তা প্রায় নিশ্চিত। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস বাকী থাকলেও নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের পাড়া মহল্লায়। নির্বাচন পাগল সম্ভাব্য প্রার্থী ও ভোটাররা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু না করলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে ভোটের ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে। সিটি এলাকাগুলোয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভোট চাচ্ছেন। মেয়রসহ বিভিন্ন পদে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কর্মী-সমর্থকরা নেমে পড়েছেন জনসংযোগে। কেউ কেউ মিছিলও করছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নিজ নিজ দলের প্রার্থী মনোনয়নে তোড়জোর শুরু হয়ে গেছে। দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মাঝে ফরম বিতরণ করবে আওয়ামী লীগ ৫ ও ৬ এপ্রিল। পরের দিন ধানমন্ডিস্থ দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে মনোনয়নের আবেদন ফরম জমা নেয়া হবে। মনোনয়নপত্রের আবেদন ফরম জমা নেয়ার পর দলের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠক ডেকে আগ্রহীদের ইন্টারভিউ নিয়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করে তাকে দলের মনোনয়ন দেওয়া হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এখনো মনোনয়ন পত্র বিতরণ শুরু না হলেও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বাগেরহাট-৩ আসনের এমপি তালুকদার আবদুল খালেকের নাম প্রায় চূড়ান্ত। তবে দলের আরো দুই তিনজন দলীয় মনোনয়নের জন্য দৌঁড়ঝাপ করছেন। আর গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশি বেশ কয়েকজন হলেও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান আজমত উল্লাহ খান, ও যুব নেতা মোঃ জাহাঙ্গীর আলমের মধ্যে যে কোনো একজনকে মেয়র প্রার্থী করা হতে পারে। এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ৫ এপ্রিল দলীয় কার্যালয় থেকে ফরম ক্রয়ের জন্য আহবান জানানো হয়েছে। এখনো ফরম ক্রয়- বিক্রয় শুরু না হলেও খুলনা ও গাজীপুর থেকে বেশ কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশী মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নের জন্য চেষ্টা তদবির শুরু করেছেন। তবে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে অনেকেই প্রার্থীতার জন্য দোঁড়ঝাপ করলেও খুলনায় ধানের শীর্ষের প্রার্থী বর্তমান মেয়র মনিরুজ্জামান মনিকে মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বর্তমান মেয়র অধ্যাপক আবদুল মান্নানের বাইরে দল কাউকে প্রার্থী হিসেবে ভাবছে না। তবে দীর্ঘ ৫ বছর জুলুম নির্যাতন-হামলা মামলা এবং কারাভোগের কারণে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অধ্যাপক মান্নান। তিনি যদি এবার মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী না হন তাহলে তার অনুমতি নিয়েই হাসান উদ্দিন সরকারকে ধানের শীষের প্রার্থী করার সম্ভাবনা রয়েছে।
খালেদার মুক্তি আগে তারপর নির্বাচন
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি বাংলাদেশের মানুষ নিশ্চিত করবে রাজপথে, আদালতে যদি না পারি। খালেদা ছাড়া নির্বাচন হবে না। খালেদার মুক্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রশ্ন না করাই ভালো। আগে তার মুক্তি নিশ্চিত করবো তারপর নির্বাচনে অংশ নেবো। বুধবার সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে অপরাজেয় বাংলাদেশ আয়োজিত আলোচনা সভায় এ মন্তব্য করেন মওদুদ আহমদ। মওদুদ বলেন, এই সরকারের আমলে বিচারের আগে রায় হয়ে যায়। মামলা চলমান অবস্থায় পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন যে, খালেদা জিয়া চোর। আমরা একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন বক্তব্য প্রত্যাশা করি নাই। অপরাজেয় বাংলাদেশের সভাপতি ফরিদা মনি শহিদুল্লাহর সভাপতিত্বে এ সময় উপস্থিত ছিলেন আয়োজক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন সিরাজী, সাবেক সংসদ সদস্য ইসমাঈল হোসেন বেঙ্গল, ওদুদ ভূইয়া, এনডিপির মহাসচিব মঞ্জুর হোসেন ঈসা প্রমুখ।
কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না নেত্রীর মুক্তি না দিলে:রিজভী
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলের সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন,৭৩ বছর বয়স্ক এই জাতীয় নেত্রীর প্রকৃত শারীরিক অবস্থা কী তা এখনো আমরা জানি না। তার মুক্তি নিয়ে যে টালবাহানা শুরু করেছেন, তা বন্ধ করুন। তা না হলে কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। বুধবার নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। রিজভী বলেন,দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচন এদেশে হবে না। এটাই শেষ কথা। তিনি বলেন,জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ার সরকারি ঘোষণা চাপাবাজি। রাজকোষ কেলেঙ্কারিসহ সমস্ত ব্যাংক লুট করে ফোকলা করে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের স্বাভাবিক লেনদেনেও বর্তমানে প্রভাব পড়ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ কমতে কমতে এখন সর্ব নিম্ন পর্যায়ে। রেমিটেন্সে ধস নেমেছে, দুঃশাসনের কবলে পড়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে, রপ্তানি আয় কমছে ব্যাপক হারে। উন্নয়নের নামে চলছে দেশজুড়ে হরিলুট। বিএনপির এ নেতা আরও বলেন, গ্লোবাল কম্পোজিটিভ ইনডেক্স বলছে, এশিয়ার মধ্যে নেপালের পরই সবচেয়ে খারাপ রাস্তা বাংলাদেশে। তার পরও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ার সরকারি ঘোষণা চাপাবাজি। বর্তমানে আওয়ামী লীগ একটি বিরাট দুর্নীতি ও চুরির মহাবিদ্যালয় এমন মন্তব্য করে করে বিএনপির এই নেতা বলেন,যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের শিক্ষা দেয়া হয়। চুরি বিদ্যা মহাবিদ্যা একমাত্র আওয়ামী লীগই অর্জন করেছে। আর এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হিসেবেই খালেদা জিয়াকে মিথ্যা জালিয়াতির নথির মাধ্যমে বানোয়াট মামলায় বন্দী রাখা হয়েছে। কিন্তু এতে সরকারের শেষ রক্ষা হবে না। এক প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন,২০ দলীয় জোট এখনো ঐক্যবদ্ধ আছে। অলি ভাই (অলি আহম্মেদ) অনেক প্রোগ্রাম করছেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য। তবে সরকারের পক্ষ থেকে সেল গঠন করা হয়েছে। তাদের কাজ প্রপাগান্ডা চালানো। আসন বণ্টন নয়, আগামী নির্বাচনের আগে নেত্রীকে মুক্ত করতে হবে। তার নেতৃত্বেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হবে। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান, কবির মুরাদ, সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু, বেলাল আহমেদ প্রমুখ।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের চিঠি দেবে বিএনপি
বাংলাদেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের চিঠি দেবে বিএনপি। আগামী ১৬-২০শে এপ্রিল লন্ডনে অনুষ্ঠিতব্য কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনকে সামনে রেখে এই চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির আন্তর্জাতিক কমিটি। বাংলাদেশে বর্তমানে গণতন্ত্রের সংকুচিত অবস্থা, বিরোধীদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ ও বিরোধী রাজনৈতিক জোটের শীর্ষ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করে রাখা এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন- এই তিনটি ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে চিঠিটি লেখা হবে। দলের পক্ষে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বা মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষরে চলতি সপ্তাহেই একযোগে চিঠিগুলো পাঠানো হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আসন্ন কমনওয়েলথ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গত শনিবার বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কূটনীতিক তৎপরতা বৃদ্ধির ব্যাপারে আলোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা প্রত্যেকেই তাদের মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ একটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশ। সংস্থাটি সদস্যভুক্ত প্রত্যেক দেশে সরকারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতাসহ কমনওয়েলথের মৌলিক রাজনৈতিক মূল্যের বিষয়েও সহায়তা করে। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামী জাতীয় নির্বাচন ইস্যুতে সার্বিক বিষয়গুলো কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের অবহিত করা প্রয়োজন। কমনওয়েলথের দায়বদ্ধতার কারণেই বিএনপির পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের নানা অনিয়ম আর নির্যাতনের চিত্র দেশগুলোর সরকার প্রধানদের অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তারই প্রেক্ষিতে সভায় সিদ্ধান্ত হয়, কমনওয়েলথ সম্মেলনের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার প্রধানদের কাছে চিঠি দেয়া হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরী, বিএনপির কূটনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত দলের বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ, সহ আন্তর্জাতিক সম্পাদক এডভোকেট ফাহিমা মুন্নী, নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মীর হেলাল ও তাবিথ আউয়াল অংশ নেন। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে প্রধান করে এ ব্যাপারে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সে সঙ্গে চিঠিটি তৈরির দায়িত্ব পান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক কূটনীতিক রিয়াজ রহমান। সে বৈঠকের ধারাবাহিকতায় চিঠি তৈরি নিয়ে মঙ্গলবার আরেকটি বৈঠক করেছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান রিয়াজ রহমান ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহমেদ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চিঠিতে উল্লেখ করা হবে- বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিশ্বাস করে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের ফলাফলের মাধ্যমই সরকার গঠন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের একমাত্র পথ। আর বাংলাদেশে রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সার্বিকভাবে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তা থেকে উত্তরণে একটি জনগণের সরকারের বিকল্প নেই। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটসহ সরকারের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলের একটিই কমন দাবি- একটি সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইতিহাস সুখকর নয়। অথচ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা ও ফলাফলে তার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি জনগণের সরকার গঠনে সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে সবার দাবি নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন আয়োজন। চিঠিতে উল্লেখ করা হবে, বর্তমান সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলকে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ দিচ্ছে না। পুলিশি অনুমতির বেড়াজালে আটকে ফেলা হয়েছে বিরোধীদের রাজনীতি চর্চার অধিকার। বিএনপিসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের খুন-গুমসহ চলছে চরম দমন-পীড়ন। বাংলাদেশে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখতে বিচারবিভাগে প্রভাব খাটিয়ে সাজানো মামলায় সাজা দেয়ার মাধ্যমে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করে রেখেছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতে পর্যন্ত নতুন নতুন নজির সৃষ্টি করে তার জামিন প্রক্রিয়া প্রলম্বিত ও জামিন স্থগিত করে কারাবাস দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। কারাগারে প্রাপ্য মর্যাদাসহ সুচিকিৎসা পাচ্ছেন না তিনি। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে তাদের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সূত্র জানায়, কমনওয়েলথভুক্ত সরকার প্রধানদের কাছে চিঠি পাঠানোর পাশাপাশি সম্মেলন চলাকালে দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বাংলাদেশ ইস্যুতে আলোচনার উদ্যোগ নেবেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। উল্লেখ্য, কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে- যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ব্রুনেই, সাইপ্রাস, দক্ষিণ আফ্রিকা, ক্যামেরুন, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, উগান্ডা, তানজানিয়া, জাম্বিয়াসহ এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়ান ও প্যাসিফিক অঞ্চলের ৫২টি দেশ। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি অবহিত করতে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশ ও সংস্থার কূটনীতিকদের দুই দফা ব্রিফ করেছে বিএনপি। সর্বশেষ ২১শে মার্চ কূটনীতিকদের ব্রিফে বিশেষ ২০টি পয়েন্ট উল্লেখ করেছিল বিএনপি। মানবজমিন
কোন্দলে হুঁশিয়ারি,শেখ হাসিনা কঠোর
সদ্য সমাপ্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যক্তিস্বার্থে যারা নৌকার বিরোধিতা করেছেন, তারা এমপি পদে দলীয় মনোনয়ন পাবেন না। তারা দলীয় পদধারী হলে বহিষ্কৃত হবেন। দলীয় নেতা-কর্মী ও এমপিদের প্রতি এমন হুঁশিয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে কেন্দ্রীয় নেতা ও দলের এমপিদের এ বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসতে প্রার্থী বাছাইয়ে চমক দিয়ে ঝুঁকিমুক্ত হতে চান তিনি। চার স্তরের রিপোর্ট ও ব্যাপক যাচাই-বাছাই শেষে তিনি তুলে দেবেন দলীয় প্রতীক নৌকা। যারা ক্ষমতায় থেকে জনবিচ্ছিন্ন, দখলবাজ, নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে সাংগঠনিক ক্ষতি করেছেন, এলাকায় গডফাদারের ভূমিকায় দলকে করেছেন বিতর্কিত, এমন এমপি-মন্ত্রী নৌকায় চড়তে পারবেন না। এ ব্যাপারে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা কঠোর। দলীয় সূত্রমতে, আগামী ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের জোর সম্ভাবনা রয়েছে। আর মাত্র নয় মাসের কম সময় হাতে রয়েছে। এ নির্বাচনে হ্যাটট্রিক জয় করাই আওয়ামী লীগের প্রধান লক্ষ্য। এজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বছর আগেই দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। বর্তমানে মন্ত্রী-এমপিদের কে কী করছেন সে তথ্য ছাড়াও তিনি সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া অব্যাহত রেখেছেন। অনেককে ডেকে এনে তিনি সংশোধন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগকে সবচেয়ে ভাবনায় ফেলেছে অভ্যন্তরীণ দলাদলি। দলীয় কোন্দলই আওয়ামী লীগের বিজয়ের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে দলের উচ্চ পর্যায় মনে করছে। জেলায় জেলায় নেতার সঙ্গে এমপির, এমপির সঙ্গে মন্ত্রীর, এমনকি এমপির সঙ্গে নিজ দলের স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধির দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে। শুধু এমপিই নয়, আওয়ামী লীগ সমর্থিত পেশাজীবীদের দ্বন্দ্বের চিত্রও এখন প্রকাশ্যে। সদ্য সমাপ্ত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের হারের কারণ হিসেবে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত শনিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে এ দুটি নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। সভায় খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবী নেতার নাম উল্লেখ করে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের মধ্যে একটা কথা প্রচলন আছে,ওকে শোয়াইয়া দাও। আমাদের দলের প্রার্থীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হচ্ছে সিনিয়র কয়েকজন নেতা। তারা চাননি বলেই আমাদের প্রার্থীদের শোয়াইয়া দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ চিহ্নিত করতে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইউপি নির্বাচনে যারা বিদ্রোহী ছিলেন, যেসব নেতা ও এমপি-মন্ত্রী নিজের বলয় ঠিক রাখতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের মাঠে রেখেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যুগ্ম ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ব্যক্তিস্বার্থে সদ্য সমাপ্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যারা নৌকার বিরোধিতা করেছেন, তারা যদি এমপি হয়ে থাকেন বা এমপির জন্য মনোনয়ন চান, আমার হাত থেকে তারা মনোনয়ন পাবেন না। সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চার ধাপে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করছেন। ইতিমধ্যে দলীয় প্রার্থীদের ব্যাপারে তার হাতে কয়েক দফা রিপোর্ট এসেছে। কিছু কিছু এমপি-মন্ত্রীর এলাকায় গডফাদারের ভূমিকা, বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের দলে ভেড়ানো, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানো, নির্বাচনী এলাকার জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা ও এলাকায় খুবই কম যাওয়া, নিজস্ব বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের বিভক্ত করে রাখা, স্বজনপ্রীতি ও অযোগ্যদের দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া, চাকরি দেওয়ার কথা বলে নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে চাকরি না দেওয়া ও টাকা ফেরত না দেওয়া, বিরুদ্ধে বললেই হামলা-মামলা দিয়ে হয়রানি বা পঙ্গু করে দেওয়া অথবা জীবন নিয়ে নেওয়া, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং বিদ্যুতের লাইন দেওয়ার নাম করে জনসাধারণের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে পুলিশকে ব্যবহার করে নিজ দলীয় নেতা-কর্মীদের হয়রানির মতো অভিযোগও আছে কোনো কোনো এমপির বিরুদ্ধে। এমন অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে রয়েছে, তাদের এবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল মতিন খসরু বলেন,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিষ্কার বার্তা হচ্ছে- জনসম্পৃক্ততা না থাকলে একাদশ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন নয়। শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও তিনি পরিষ্কারভাবে বলেছেন, যাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আছে, তাদের তাঁর (শেখ হাসিনা) হাত থেকে মনোনয়ন দেবেন না। তিনি বলেন,উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে একাদশ সংসদ নির্বাচনে আমাদের বিজয় অর্জন করতে হবে। এজন্য যেখানে যেমন প্রার্থী প্রয়োজন, সেখানেই তাই দেওয়া হবে। যত বড় প্রভাবশালীই হোন না কেন, বিতর্কিতরা নৌকা পাবেন না। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন,সমাজ, দল-নৈতিকতাবিরোধী কেউ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না। জনসম্পৃক্ত, সমাজহিতৈষী ও দলের প্রতি কমিটমেন্ট এমন গুণ যাদের আছে, তারাই দলের প্রার্থী তালিকায় থাকবেন।
চার সিদ্ধান্ত বিএনপি নেতাদের বৈঠকে
সিনিয়র নেতাদের বৈঠকে চারটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। সরকারের কৌশল ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন, দলের সাংগঠনিক সফর ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে প্রতিবেদন তৈরি, চলমান আন্দোলন জোরদার করা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সর্বাত্মক নির্বাচন পরিচালনার কৌশল প্রণয়ন। বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক নেতা এ তথ্য জানিয়েছেন। বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানান, কারাগারে যাওয়ার আগে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পরামর্শে ও সিনিয়র নেতাদের সমন্বিত মতামতের মাধ্যমে দল পরিচালনার নির্দেশনা দিয়ে গেছেন খালেদা জিয়া। সে অনুযায়ী দলের সিনিয়র নেতাদের সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত করা হচ্ছে সব সিদ্ধান্ত। নেতারা জানান, বৈঠকের শুরুতেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একটি নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। বিএনপি নেতারা জানান, সরকারের ধারণা ছিল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা পেয়ে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে রাজনীতির মাধ্যমে বড় ধরনের ইমেজ সংকটে পড়বেন তিনি ও তার দল। অন্যদিকে চাপ ও লোভে ফেলে নেতাদের একাংশের মাধ্যমে বিএনপিতে ভাঙন ধরানো যাবে। কিন্তু সরকারের দুটি ধারণাই মিথ্যা প্রমাণ করেছে দেশের মানুষ ও দলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে বিশ্বাস করেনি দেশের মানুষ। কারাগারে গিয়ে ইমেজ সঙ্কটের চেয়ে উল্টো জনপ্রিয়তা বেড়েছে খালেদা জিয়ার। অন্যদিকে দলের নেতাকর্মীদের নানা ক্ষোভ-বিক্ষোভও ভুলিয়ে দিয়েছে খালেদা জিয়ার কারাবাস। নেতৃত্বের সর্বস্তরে সবধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে এককাতারে অবস্থান করছেন নেতারা। দলে ভাঙন ধরানোর ব্যাপারে যাদের নিয়ে গুঞ্জন তৈরি করা হয়েছিল বাস্তবে তারাই বেশি সক্রিয় আইনি লড়াই ও রাজপথের কর্মসূচিতে। নেতারা জানান, প্রাথমিক কৌশলে ব্যর্থ হয়ে সরকার এখন নতুন কৌশলে এগোনোর চেষ্টা করছে। বিএনপি নেতাদের দ্বন্দ্ব ও পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস তৈরির অপচেষ্টা চলছে। অন্যদিকে কারাগারে প্রথম তিনদিন ডিভিশন না দেয়া, প্রাপ্যসুবিধা বঞ্চিত করা, পরিত্যক্ত ভবনে রাখা ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সাক্ষাতের সুযোগ না দেয়ার পরও মানসিকভাবে টলেনি খালেদা জিয়ার মনোবল। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই বয়সজনিত কিছু অসুস্থতা রয়েছে ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়ার। ফলে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরির মাধ্যমে নতুন কৌশল করছে সরকার। একদিকে অসুস্থতার কথা বলে গত বুধবার তাকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আদালতে হাজির করা হয়নি। একই কারণে বাতিল করা হয়েছে তার সঙ্গে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বুধবার ও বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত সাক্ষাৎ। বৃহস্পতিবার সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে একটি চিকিৎসক টিম ও রোববার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি টিম কারাগারে গিয়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। কিন্তু কারাবিধি মেনে বারবার আবেদনের পরও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের সাক্ষাতের সুযোগ দেয়নি কারা কর্তৃপক্ষ। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে পাঠানোর একটি গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মহলে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার ছোটভাই শামীম এস্কান্দার ও তার পরিবার এবং জিয়া পরিবারের ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমানের স্ত্রী শর্মিলী রহমানসহ স্বজনরা কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিবের একটি বক্তব্যকে বিকৃত করে খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে সে গুঞ্জনকে জোরদার করে তোলা হয়। নেতারা জানান, বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে- নেতাদের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে সন্দেহ-অবিশ্বাস সৃষ্টি, খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপারে সরকারের সকল কৌশলের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। এসব ব্যাপারে বক্তব্য দেয়ার সময় সতর্কতার সঙ্গে কথা বলতে হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী সবাইকে একই সুরে কথা বলতে হবে। এ ব্যাপারে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, দীর্ঘ একযুগ ক্ষমতার বাইরে রয়েছে বিএনপি। বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় নেতাকর্মীরা কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পায়নি। তারপরও এ সময় একজন নেতাকর্মী দল ছেড়ে যায়নি। এটা প্রমাণ করে বিএনপিতে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করে সফল হবে না সরকার। তারপরও আমাদের সবাইকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। আরেক ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, এটা খুবই অভাবনীয়, সিনিয়র নেতাদের ঐক্য দেখে আমাদের দলের নেতারা উজ্জীবিত। নেতারা জানান, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর আন্দোলনের অংশ হিসেবেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডগুলো অব্যাহত ও নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখার অংশ হিসেবে জেলাপর্যায়ের সাংগঠনিক সফরের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে সিনিয়র নেতাদের নেতৃত্বে বেশকিছু টিমও গঠন করা হয়। এ সফরে বিএনপির আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি দলের মধ্যে কোনও সমস্যা থাকলে তা সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে- নেতাদের যাকে যে জেলায় সাংগঠনিক সফরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা যেন সফরগুলো সম্পন্ন করেন। সেই সঙ্গে আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সাংগঠনিক প্রতিবেদন তৈরি করে যথাযথ সময়ে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে জমা দেন। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট নেতাকে জবাবদিহি করতে হবে। নেতারা জানান, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির চলমান আন্দোলনের নানাদিক পর্যালোচনা করা হয় বৈঠকে। বেশির ভাগ নেতাই চলমান আন্দোলনের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন। বিশেষ করে খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে বিএনপি কড়া আন্দোলনের যাবে এবং সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বিএনপি নেতাকর্মীদের ঘাড়েই তার দায়ভার চাপাবে সরকার সমর্থকরা- এমন একটি আশঙ্কা ছিল বিএনপির। অতীত আন্দোলনের পূর্বাপর থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার সে পথে হাঁটেনি। এতে একদিকে সরকার যেমন বিরোধী নেতাকর্মী দমনে সফল হয়নি তেমনি দেশের মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি বিএনপির আন্দোলন। বরং বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচি এবং সেসব কর্মসূচিতে সরকারের বাধার কারণে বেড়েছে জনমত ও জনপ্রিয়তা। চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় জনসম্পৃক্ততামূলক নতুন কিছু কর্মসূচি দেয়ার কথা বলেন নেতারা। সে আলোচনায় ঢাকাসহ সারা দেশে সমাবেশ আয়োজনে পুলিশের অনুমতির অপেক্ষা এবং পুলিশি অনুমতির সরকারি কৌশল সম্পর্কে পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে নেতারা বলেন, পুলিশি অনুমতির মাধ্যমে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে সরকার। কিন্তু কর্মসূচি পালনে সবসময় এ অনুমতির অপেক্ষা কর্মীদের মনোবল নষ্ট করতে পারে। বৈঠকে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলন আরও কীভাবে জোরদার করা যায় তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে- শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে পর্যায়ক্রমে জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে পুলিশের অনুমতি ছাড়াই সভা-সমাবেশ আয়োজনের পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে এক্ষেত্রে কোনোভাবেই তাড়াহুড়ো বা হঠকারি কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। নেতারা জানান, মামলাগুলো আইনিভাবে মোকাবিলাকে প্রাধান্য দেয়ার নির্দেশনা ছিল চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। কিন্তু সরকার পদে পদে নানা কৌশল করে জামিন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করেছে। বৈঠকে নেতারা মত দেন, এ পর্যায়ে এসে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে সরকার যদি কোনো সমঝোতায় না আসে, তাহলে রাজনৈতিক দল হিসেবে যে ধরনের কঠোর আন্দোলনে যাওয়া দরকার আমরা যাবো, সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। নেতারা জানান, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে বিএনপি। তারা এখন পর্যন্ত সে লক্ষ্য থেকে সরে আসেনি। এছাড়া বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ও নির্বাচন পরিচালনার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে ভোটের মাঠে বিএনপির উপস্থিতি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছানো যায়। এতে একদিকে সাংগঠনিক ভিত মজবুত হয় অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচনের কিছুটা প্রস্তুতিও সারা হয়। তাই জাতীয় নির্বাচনের বছরে আন্দোলনের অংশ হিসেবে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে অংশগ্রহণ জরুরি। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টি সিনিয়র নেতাদের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বৈঠকে নেতারা একবাক্য নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়- আসন্ন গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেবে বিএনপি। সার্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বিজয় ছিনিয়ে আনার লক্ষ্যেই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে হবে। সরকারের কৌশলগুলো বিবেচনায় রেখেই প্রচারনা ও নির্বাচন পরিচালনায় বিএনপিকে পাল্টা কৌশল ঠিক করতে হবে। নির্বাচনী প্রচার ও পরিচালনায় কাজে লাগাতে হবে দক্ষ, বিশ্বস্ত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের। দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত। বৈঠকে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নাম নিয়েও আলোচনা হয়। তবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- দলের পক্ষ থেকে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামত সংগ্রহ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে স্থায়ী কমিটিসহ সিনিয়র নেতারা প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করবেন। বৈঠক সূত্র জানায়, গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে পরিবর্তন আসতে পারে। এক্ষেত্রে গাজীপুরে হাসান উদ্দিন সরকার ও খুলনায় মনিরুজ্জামান মনি আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন। এ ব্যাপারে বৈঠক শেষে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, সুষ্ঠু ভোট নিয়ে সংশয় থাকলেও আমরা গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেব। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে আন্দোলনের অংশ হিসেবেই আমরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখা, জনগণের অধিকার প্রয়োগের সৃযোগ সৃষ্টির জন্য আমরা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বৈঠকে সকল নেতাই একমত পোষণ করেছেন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই আগামী নির্বাচনে যাবে বিএনপি। এদিকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। দুটি নির্বাচনই দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের যে প্রান্তেই নৌকার পক্ষে ভোট চান না কেন তা ঘোষিত তফসিলের মধ্যে পড়ে এবং সেটা নির্বাচনী আচরণ বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। সূত্র: মানবজমিন
আ লীগের জন্য পরীক্ষা সিটি নির্বাচন
আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয় নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। সোমবার দুপুরে রাজধানীর মৌচাক এলাকায় খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে লিফলেট বিতরণকালে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন। আব্বাস বলেন, এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য একটা পরীক্ষা তারা কতটুকু সুষ্ঠু করতে পারে। আমরা মনে করি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই নির্বাচনে তারা কিছু করতে পারবে না। বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করবে। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বিএনপির মহাসচিবসহ তিনি দেখা করার চেষ্টা করেও দেখা করতে পারেননি জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, উনি কতটুকু সুস্থ, কতটুকু অসুস্থ, সরকার যা বলছে আমরা সেটুকুই মনে করছি। আসলে উনি কতটুকু অসুস্থ আছেন, আমরা তো ভালোই দেখে আসছিলাম। সেদিন জেলখানা থেকে যখন আনলো না আদালতে, তখন স্বাভাবিকভাবে একটা প্রশ্ন ওঠে। এখন আমরা আইনের দিক এবং কর্মসূচির মাধ্যমে এগিয়ে যাবো। বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে সরকারের বাধার অভিযোগ তুলে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ভয়াবহ করুণ পরিণতির জন্য এই স্বৈরাচারী সরকারকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
সরকার দুর্নীতিকেও এক দলীয় করেছে: খসরু
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আপনি দুর্নীতি করতে চাইলেই তা করতে পারবেন না। আওয়ামী লীগ দুর্নীতিকেও একদলীয় করে ফেলেছে। এখন দুর্নীতিও একদলীয়ভাবে চলছে। তাদের বাইরে কারো দুর্নীতি করার কোন সুযোগ নেই। আপনি দুর্নীতি করতে চাইলে তাদের সঙ্গে থাকতে হবে। সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জাতীয়তাবাদী প্রজন্ম ৭১ কর্তৃক আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় তিনি এ কথা বলেন। আমির খসরু বলেন, এই সরকার ১৭ বছর আগে দুর্নীতির জন্য স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন পেয়েছে স্বৈরতন্ত্রের স্বীকৃতি। আগামীতে শ্রেষ্ঠ দুর্নীতিবাজ সরকারের স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায় আছে। ইতিমধ্যে মানুষের কাছে সে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে। আমির খসরু বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যেমন সন্ত্রাস হচ্ছে তেমনি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি হচ্ছে অভিযোগ করে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যখন দুর্নীতি হয় সেটা ছোট সংখ্যায় হয়না। হাজারর হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি হচ্ছে। কুইক রেন্টালের নামে কুইক দুর্নীতি হয়েছে আর মেগা প্রজেক্টে মেগা দুর্নীতি হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের সমস্ত সম্পদ কেড়ে নিয়েছে। ব্যাংকে এখন টাকা নেই। ঋণের মাধ্যমে ব্যাংক খালি করেছে। আর এটা পূরণ করছে ট্যাক্সের টাকা দিয়ে। খালেদা জিয়ার কারাবাসের বিষয়ে তিনি বলেন, উনি জেল খাটছেন গণতন্ত্রের জন্য। বাড়ি হারাতে হয়েছে, আদরের ছেলেকে হারিয়েছেন এই গণতন্ত্রের জন্য। আগামীতে উনি বিশ্বনেতা হবেন। বিশ্ববাসীর কাছে গণতন্ত্রের মাতা হিসেবে পরিচিত হবেন। আজ যারা তাকে কারাগারে রেখেছেন তারা বুঝতে পারছেন না কাকে আটকে রেখেছেন। প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ঢালী আমিনুল ইসলাম রিপন। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান ভবরকত উল্লাহ বুলু, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবীব লিংকন, বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, নির্বাহী সদস্য আবু নাসের রহমত উল্লাহ, রফিক শিকদার, নিপুণ রায় চৌধুরী প্রমুখ।