শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ
২০মে,সোমবার,অনলাইন ডেক্স,নিউজ একাত্তর ডট কম: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৩৮ তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করেছে দেশবাসী। ১৯৮১ সালের ১৭ মে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায় রচনা করে কতিপয় জঘন্য এবং বিপদগামী সেনা সদস্য। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা ইতিহাসে আজীবন ঘৃনীত হয়ে থাকবে।সেই কালো রাতে বিদেশে অবস্থান করার কারণে প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। পরে দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ভারত হয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে প্রিয় মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। লাখো জনতা সেদিন অভ্যর্থনা জানায় গনতন্ত্রের মানস কন্যা শেখ হাসিনাকে। সেদিন শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানানোর জন্য শুধুমাত্র বিমানবন্দরেই উপস্থিত হয় ১৫ লক্ষ্য মানুষ। ১৯৮১ সালের ফ্রেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। দেশে ফিরেই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন শুরু করেন শেখ হাসিনা। এরই ধারাবাহিকতায় ৯০ এর গণ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন হয় এবং বিজয় হয় গণতন্ত্রের। ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪ এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে মোট চার মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয় শেখ হাসিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন। ছিলেন রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও। শিক্ষা জীবন থেকেই শেখ হাসিনা গণ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বিরোধী শক্তি কমপক্ষে ১৯ বার সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আল্লাহর অশেষ রহমতে প্রত্যেকবারই প্রাণে বেঁচে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করে সংসদ ভবন চত্বরে সাব জেলে পাঠায়। প্রায় ১ বছর পর ২০০৭ সালের ১৯ জুন তিনি মুক্তি লাভ করেন। গণতন্ত্রের মানস কন্যা শেখ হাসিনা মিয়ানমার সামরিক সরকারের হাতে নির্যাতিন এবং বিতাড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে আশ্রয় প্রদান করে সৃষ্টি করেছেন মানবতার এক অনন্য উদাহরণ। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও। শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে নিচ্ছে। সমুদ্র বিজয় শেখ হাসিনার অন্যতম সাফল্য। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ২১ টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার যে মহৎ উদ্দেশ্য তা সমৃদ্ধ করেছে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বকে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, বেড়েছে মাথাপিছু আয়। নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জায়গায়। যা বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে কল্পনা করা যেত না। কিছু দিনের মধ্যেই পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এর মত বড় বড় প্রকল্প গুলো বাস্তবায়ন দেখবে এ দেশের জনগন। ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়ন কেবল মাত্র শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব বলে এদেশের জনগণ ইতিমধ্যে বিশ্বাস এবং আস্থা স্থাপন করে ফেলেছে। শিক্ষাখাতে যে পরিবর্তন বাংলাদেশে ঘটেছে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনও ঘটেনি। উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিত করণের লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের মানুষ এখন খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ন। অর্থাৎ সার্বিক উন্নয়ন বলতে যা বুঝায় শেখ হাসিনা তা করে দেখিয়েছেন। পরিশেষে বলা যায়, মানুষ বেঁচে থাকে তার কর্মে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও মানুষের হৃদয় মন্দিরে সহস্র শতাব্দি ধরে বেঁচে থাকবে নিজ কর্মগুণে। লেখক: মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী , সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট , গবেষক ও সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন ভীষণ বাবাভক্ত
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী :হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন তিনি শেখ লুৎফর রহমান। শেখ মুজিব বঙ্গবন্ধু হতে পেরেছিলেন লুৎফর রহমানের মত আদর্শ বাবা এবং সায়েরা খাতুনের মত আদর্শ মা পেয়েছেন বলেই। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সকল প্রকার আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর বাবা-মায়ের জোরালো সমর্থন ছিল। বাবা লুৎফর রহমান তাঁদের আদরের খোকাকে আর্থিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সহযোগিতা করে গেছেন সবসময়।শেখ লুৎফর রহমানের পূর্বপুরুষবৃন্দ ইরাক থেকে এ দেশে আসেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। তাঁর বাবার নাম শেখ আবদুল হামিদ। পূর্ব পুরুষদের মত তিনিও ছিলেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ আদালতে সেরেস্তাদারের কাজ করতেন। তিনি যৌবনে তাঁর ভাই, বোনদের দায়িত্ব কাঁধে নেন। শেখ মুজিবুর রহমান মেট্রিক পাসের পর কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়তে যাওয়ার দিনই শেখ লুৎফর রহমান চাকুরি থেকে অবসর নেন। গ্রামের সকলেই তাঁকে মান্য করত। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন বলে মুসলমানরা তো বটেই, হিন্দু ও অন্য ধর্মের লোকজনও তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইয়ের ১৩তম পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, সকলেই আমার আব্বাকে সম্মান করতেন।শৈশবে শেখ মুজিব ছিলেন ভীষণ বাবাভক্ত ছেলে। তিনি বাবার আশেপাশে থাকতে ভালবাসতেন। বঙ্গবন্ধু শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছেন, তাঁর গলা ধরে রাতে না ঘুমালে আমার ঘুম আসত না। শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ে জানতে পারি, শেখ লুৎফর রহমান খেলাধুলা পছন্দ করতেন, নিজে ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি স্থানীয় অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুরও খেলাধুলায় ঝোঁক থাকার কারণে মাঝে মাঝে তাঁর বাবার টিমের সাথে তাঁদের খেলা পড়ত। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, আর আমি মিশন স্কুলের ক্যাপ্টেন ছিলাম। আব্বার টিম আর আমার টিমে যখন খেলা হত তখন জনসাধারণ খুব উপভোগ করত।শেখ মুজিবুর রহমান ছোটবেলা থেকে সাধারণ মানুষের সুখ, দুঃখ, বেদনা নিয়ে ভাবতেন। অসহায় গরিবদের সাধ্যমত সহযোগিতা করতেন। গায়ের চাদর দিয়ে, ক্ষুধার্তকে খাবার দিয়ে তাঁর সাধারণ অসহায় মানুষদের পাশে থাকার অসংখ্য নজির রয়েছে। শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুন ছেলের কর্মকান্ডে খুশি হতেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেখ মুজিব আমার পিতা বইতে তাঁর দাদা-দাদী সম্পর্কে লিখেছেন, ''আমার দাদা-দাদী অত্যন্ত উদার প্রকৃতির ছিলেন। আমার আব্বা যখন কাউকে কিছু দান করতেন তখন কোনোদিনই বকাঝকা করতেন না বরং উৎসাহ দিতেন। আমার দাদা ও দাদীর এই উদারতার আরও অনেক নজির রয়েছে।''শেখ লুৎফর রহমান সংস্কৃতিমনা ছিলেন। পত্রপত্রিকা পড়তে পছন্দ করতেন বলে নিয়মিত খবরের কাগজ রাখতেন। আনন্দবাজার, আজাদ, বসুমতি, মোহাম্মদী, সওগাত পত্রিকা পড়তেন তিনি। তাঁর দেখাদেখি শেখ মুজিব শৈশব থেকে পত্রিকা পড়তে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। আমরা জানি, শেখ মুজিব জীবনের তিনভাগের একভাগ সময় জেলে কাটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে কোন জেলে রাখা হয়েছে তা অনেকসময় সহজে জানা যেত না। তখন শেখ লুৎফর রহমান ছেলের খোঁজখবর নিতে ছুটে বেড়াতেন এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে। পুত্রের অনিশ্চিত জীবন জানা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে দূরে থাকতে কখনো বলেননি। উল্টো তিনি শেখ মুজিবের পাশে থেকেছেন এবং সাহস যোগাতেন। শেখ মুজিব জেলে গেলে তিনি তাঁকে টাকা পাঠাতেন নিয়মিত, তিনি ছেলের জন্য সবসময় কী খেলো না খেলো, শরীরটা শেখ মুজিবরের কেমন যাচ্ছে কিংবা কারাগারে কী রকম কষ্ট দিচ্ছে, তা নিয়ে চিন্তায় থাকতেন। বঙ্গবন্ধু স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, 'আমি আস্তে আস্তে রাজনীতির মধ্যে প্রবেশ করলাম। আব্বা আমাকে বাধা দিতেন না, শুধু বলতেন, লেখাপড়ার দিকে নজর দেবে।' বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেন-এ নিয়ে মানুষের মাথা ব্যথার শেষ ছিল না। কেউ কেউ বিচার দিত বাবা শেখ লুৎফর রহমানের কাছে। একবার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি তাঁকে হুশিয়ারি করে বলেছেন, আপনার ছেলে যা আরম্ভ করেছে সে জেল খাটবে, তার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। ঐ গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সেইদিন এক ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছিলেন বাবা শেখ লুৎফর রহমান। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ''দেশের কাজ করছে, অন্যায় তো করছে না; যদি জেল খাটতে হয়, খাটবে; তাতে আমি দুঃখ পাব না। জীবনটা নষ্ট নাও তো হতে পারে, আমি ওর কাজে বাধা দিব না।'' এমনই দেশ প্রেমি পিতা ছিলেন শেখ লুৎফর রহমান। তাঁর বলিষ্ঠ অবস্থানের কারণে বঙ্গবন্ধু সক্রিয় রাজনীতি করতে পেরেছিলেন।অল্প বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন শেখ মুজিব। তাঁর স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা শেখ পরিবারে বড় হয়েছেন। শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুন তাঁকে মেয়ের মত করে সংসারে স্থান দিয়েছেন। অপরদিকে সংসারের বড় ছেলে হয়েও বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করে বেড়িয়েছেন, সংসার সামলানোর কাজ করে গেছেন শেখ লুৎফর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান বলেছেন, ''আমি তো আব্বার বড় ছেলে। আমি তো কিছুই বুঝি না, কিছুই জানি না সংসারের। কত কথা মনে পড়ল, কত আঘাত আব্বাকে দিয়েছি, তবু কোনোদিন কিছুই বলেন নাই, আমার বাবা একজন সাদা মনের মানুষ ছিলেন। সকলের পিতাই সকল ছেলেকে ভালবাসে এবং ছেলেরাও পিতাকে ভালবাসে ও ভক্তি করে। কিন্তু আমার পিতার যে স্নেহ আমি পেয়েছি, আর আমি তাঁকে কত যে ভালবাসি সে কথা প্রকাশ করতে পারব না।'' বাবা হিসেবে শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন শেখ মুজিবের মাথার ওপর বটবৃক্ষ। পিতা হিসেবে তিনি যথার্থই শেখ মুজিবকে বাংলার মানুষের জন্যে উৎসর্গ করেছিলেন।পিতা হিসেবে শেখ মুজিবকে নিয়ে শেখ লুৎফর রহমান গর্বিত বোধ করতেন। স্বাধীনতার পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, 'শেখ মুজিব সৎসাহসী ছিল। উদ্দেশ্য তার সবসময় নেক উদ্দেশ্য ছিল।....গরিবের প্রতি ছোটবেলা থেকে তার খুব দয়া ছিল। সে যেখানেই যেত সেখানেই নেতৃত্ব দিত। শেখ মুজিবকে শৈশবে তাঁর পিতামাতা 'খোকা' বলে ডাকতেন। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে তিনি হয়েছেন বাঙ্গালি জাতির জনক, তখনও তিনি শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের কাছে আদরের 'খোকা'ই ছিলেন। আবার আজকের বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনারও শৈশব কেটেছে দাদা-দাদীর সাথে। তাঁদের আদর যতে টুঙ্গিপাড়ায় বেড়ে উঠেন অতি আদরের নাতনি হাসু হিসেবে। সেই নাতনি শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী, দেশকে ছাড়িয়ে আজ পৃথিবীর ইতিহাসে শেখ লুৎফর রহমানের নাতনি শেখ হাসিনা পৃথিবীর দ্বিতীয় সৎ প্রধানমন্ত্রী, শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে এক ইতিহাস হিসেবে নিয়ে গেছেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোলমডেল, আমাদের মহান সৃষ্টকর্তার কাছে প্রার্থনা থাকবে শেখ লুৎফর রহমানের নাতনি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা যেন দীর্ঘজীবী হন এবং আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকেন।শেখ লুৎফর রহমান আজীবন সাদামাটা জীবনযাপন করে গেছেন। তিনি জীবত অবস্থায় বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও পরে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তিনি (শেখ লুৎফর রহমান) বঙ্গভবনে থাকতেন না, বরং গ্রামেই সাধারণের মত জীবনযাপন করতেন। এত সাদামাটা জীবনযাপন আর কোন প্রধানমন্ত্রীর বাবা করেছেন বলে আমার জানা নেই। শেখ লুৎফর রহমান ১৯৭৫ সালের ২৯ মার্চ ইন্তেকাল করেন। তাঁকে নিজ গ্রাম গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করা হয়। তাঁর নামে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে। প্রতিবছর আওয়ামী লীগ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালন করে। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন। আর যতদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন, ততদিন কৃতজ্ঞতার সাথে জাতি স্মরণ করবে এই মহৎপ্রাণ পিতা, শেখ লুৎফর রহমানকে। লেখক :মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সিনিয়র সাংবাদিক,কলামিষ্ট ও গবেষক,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম ।
সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই
৩ মে শুক্রবার, একাত্তর ডট কম,মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী : রমজানে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পায়, আমরা এমন দৃশ্য দেখতেই অভ্যস্ত। কারণ প্রতি রমজানে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে একটি অবৈধ চক্র বরাবরই নিজেদের স্বার্থ হাসিলে তৎপর থাকে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে ওঠে। কিন্তু এবার আমরা তার ব্যতিক্রম লক্ষ করছি। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের মূল্য এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। রাজধানীর বাজারগুলোতে সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের দাম ডজনে কমেছে ১০ টাকা। শাকসবজি, মাছ-মাংসের দাম এখনো স্থিতিশীল। তবে বাজারভেদে পেঁয়াজের দাম কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা।ব্যবসায়ীদের মন্তব্য, রোজার কারণে পেঁয়াজের দাম একটু বেড়েছে। সামনে হয়তো আরেকটু বাড়তে পারে। তবে গত বছরের তুলনায় এবার পেঁয়াজের দাম বাড়ার প্রবণতা তুলনামূলক কম। আর এসবের মূলে রয়েছে সরকারের একটি বিশেষ উদ্যোগ, তা হলো রমজানে নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সাত সংস্থাকে বাজার তদারকির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি; যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ, RAB ভ্রাম্যমাণ আদালত, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি), কৃষি বিপণন অধিদফতর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশনের বাজার মনিটরিং সেল ও পুলিশ বাহিনী খুচরা বাজার থেকে শুরু করে দেশের পাইকারি ও মোকামগুলোয় অভিযান চালাবে, যাতে রমজানকে পুঁজি করে কারসাজির মাধ্যমে কেউ অতি মুনাফা লুটতে না পারে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। আমরা সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।রমজানে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা যেন অব্যাহত থাকে।মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম
বসবাসযোগ্য হোক ঢাকা পরিকল্পিত শিক্ষার আশা
লন্ডনভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্যা ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা ইআইইউ বাসযোগ্যতা নির্ণয়ে বিশ্বের ১৪০টি শহরের যে তালিকা প্রকাশ করেছে সেখানে বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে এবারও দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। এটি অবশ্য প্রকাশ করেছে ১৪ আগস্ট ২০১৮ সালে। তাদের জরিপ অনুযায়ী বিশ্বের বাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে প্রথম ১০টি হলো- অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, অস্টেলিয়ার মেলবোর্ন, জাপানের ওসাকা, কানাডার ক্যালগেরি, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, কানাডার ভ্যাঙ্কুভার, জাপানের টোকিও, কানাডার টরেন্টো, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন ও অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড। বিপরীতে বিশ্বের সবচেয়ে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর প্রথমে রয়েছে সিরিয়ার দামেস্ক। তালিকার পরবর্তী শহরগুলো হলো- ঢাকা, নাইজেরিয়ার লাগোস, পাকিস্তানের করাচি, পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মরিসবি। ২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায় দেশি-বিদেশি বহুমুখী যুদ্ধ চলছে। বিমান হামলা, বোমা বিস্ফোরণ এমনকি রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারও হচ্ছে সেখানে। ফলে দামেস্কের বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় এক নম্বরে থাকা অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু আমাদের স্বপ্নছোঁয়া উন্নয়নশীল দেশের রাজধানী ঢাকা বছরের পর বছর বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকার তলানিতে থাকাটা গভীর বেদনা আর শংকা তৈরি করে। যদি সিরিয়ায় যুদ্ধ না থাকত তবে ঢাকা বসবাস অযোগ্য নগরীর তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করত, এই ভাবনাও আমাদের কাচুঁমাচুঁ করে। অবশ্য আশংকা তো আর নতুন নয়। রাজধানী ঢাকা আর নাগরিক সমস্যা সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে বহু আগেই। আমাদের প্রাণের শহর বর্তমানে ঢাকার ভেতরের চিত্র দিন দিন প্রত্যাশার বেড়াজাল ছিন্ন করছে। শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী দখলদারিত্বের কবলে পড়ে আবদ্ধ জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে ঐতিহাসিক এই নদ-নদী। নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে দুর্বিষহ যানজট, গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি সংকট, পয়ঃনিস্কাশনের জটিলতা, দুর্গন্ধময় ও বিষাক্ত বাতাস, দূষিত পরিবেশ, অসম্ভব ঘনবসতি, ভেজাল খাবার, গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়া, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্দশা, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, চাঁদাবাজি, মাদকের ভয়াল ছোবল, ছিনতাই, আকাশছোঁয়া দ্রব্যমূল্য, লাগামহীন বাসা ভাড়া, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ইত্যাদি নানা সমস্যা। অসংখ্য সমস্যার মধ্যে যেটি প্রধান হয়ে উঠেছে তা হচ্ছে যানজট। এ সমস্যা এখন নিত্যদিনের নৈমিক্তিক বিষয়। যানজটে মানুষের কী পরিমাণ ক্ষতি হয়, তার হিসাব বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সময়ে দিয়েছে। বুয়েটের এক গবেষণায় বলা হয়েছে যানজটের কারণে বছরে ২২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিপিআরসি বলেছে ২০ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ জাতিসংঘের ইউএনডিপি এক গবেষণায় বলেছে, যানজটে বছরে ক্ষতি হয় ৩৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। বাস্তবতা হয়তো আরো ব্যাপক, ভিন্ন, আমাদের অন্তরাত্মা বিমর্ষ বিদির্ণ। ঢাকা মহানগরে যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ও বিভিন্ন নির্মাণকাজের কারণে বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনক; মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরে মাত্রা সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পার্টিকুলেট ম্যাটার (পিএম) ১৭২ মাইক্রোগ্রাম। অথচ জাতীয়ভাবে পিএম ৬৫ মাইক্রোগ্রাম। জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতিও ভয়াল ভয়াবহ। মশাবাহিত রোগ; যেমন- চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু প্রভৃতির ঝুঁকি রয়েছে যথেষ্ট মাত্রায়। ময়লা-আবর্জনার কারণে দূষিত পরিবেশ; পেটের পীড়া, জন্ডিস ও টাইফয়েড আক্রান্ত হয় মানুষ। ঢাকার একটি বার্ষিক উপদ্রব ডায়রিয়া। বছরে দুবার, বর্ষার শুরুতে ও শেষে এ উপদ্রব দেখা দেয়। পয়োনিস্কাশন ভালো নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ঢাকার মলমূত্রের মাত্র ২ শতাংশের নিরাপদ নিষ্কাশন হয়। বাকিটা মিশে যায় প্রকৃতিতে, পানির উৎসে। বিবিএস ও ইউনিসেফের তথ্য মতে, ঢাকায় সরবরাহ করা পানির দুই-তৃতীয়াংশে মলবাহিত জীবাণু থাকে। এটি জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় ঝুঁকি। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভালো নয় বলে একটু বৃষ্টি হলেই স্যুয়ারেজ, ড্রেন আর পাইপের পানি একাকার হয়ে যায়। বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা প্রকট সমস্যা। ঘন্টাখানেকের টানা বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় ঢাকার রাস্তাঘাট। কিছু এলাকা; যেমন- মিরপুর, মানিকনগর, মালিবাগ, ওয়্যারলেস, তেজগাঁও, পল্লবীর কালশী রোড, দৈনিক বাংলা মোড়ে রাস্তায় পানি থইথই করে। ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও অফিসগামী যাত্রীরা। বেশির ভাগ রাস্তা ও গলি অপ্রশস্ত, ইট-খোয়া-বিটুমিন ওঠা, ময়লায় ভর্তি। এসবের ফল যানজট। রাস্তার সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ নেই। সারা বছর খোঁড়াখুঁড়ি চলে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক না হলেও সন্তোষজনক নয়। ছিনতাই-রাহাজানি নিত্য ঘটনা; খুনখারাবি আছে। বাজারও নিয়ন্ত্রণহীন, বিশেষ করে শাকসবজির বাজার। পাইকারি ও খুচরা দরে পার্থক্য অনেক। বাসযোগ্যতার সূচকে এসব তথ্য-উপাত্ত বিবেচনা করেই তালিকা চূড়ান্ত করে। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলশ্রুতিতে যেসব সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে তার সবগুলোর উপস্থিতি এখানে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কোনো কোনো সমস্যা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে, সেগুলোর সমাধান আদৌ সম্ভবপর কিনা তা ভাবনার বিষয়। দেশের রাজধানী শহরে বসবাসকারী নাগরিকদের যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার কথা তার ধারে কাছেও নাই অভাগা নগরবাসী। তারপরও প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ঢুকছে এ শহরের পেটে। বিদ্যমান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরো কিছু মানুষ, সেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যা আর প্রকট হয়ে উঠছে পুরাতন সমস্যা। এক দুঃসহ জীবন পার করছে এই নগরবাসী। বিভিন্ন সময় ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য করার উপায় নিয়ে অনেক নগরবিশারদ, জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি তাদের মতামত তুলে ধরার চেষ্টা করেন। প্রতিটি সরকারই বিভিন্ন সময়ে তাদের নানামুখী পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করে নগরবাসীকে আশ্বস্ত করে থাকে। কখনো কখনো কিছু বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ চোখেও পড়ে। এসব পদক্ষেপের বেশির ভাগই সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতে পারে না। মাঝপথেই হোঁচট খায়, অর্থের অপচয় হয়, জনগণের ভোগান্তি যে স্তরে ছিল সেই স্তরেই আটকে থাকে। ভাবা হয়ে থাকে অতিরিক্ত জনসংখ্যাই মূল সমস্যা। যে পরিমাণ মানুষ এখানে বাস করে তার ভার সহ্য করার ক্ষমতা এ শহরটি হারিয়ে ফেলেছে। বাকশক্তি থাকলে নিশ্চিত অনেক আগেই চিৎকার করে জানিয়ে দিত এ অক্ষমতার কথা। ঘর থেকে বের হলেই চোখে পড়বে হাজারো মানুষের নানামুখী । রাস্তাঘাট, টার্মিনাল, শপিংমল, পার্কÑ কোথায় নেই মানুষের ভিড়। সরকারি হিসাবে ঢাকায় বর্তমান বসবাসরত জনসংখ্যা ১ কোটি ৬৫ লক্ষ। আর প্রতি বর্গকিলোমিটার বাস করে ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষ। এসব মানুষের বাসস্থান পয়ঃনিস্কাশন সুবিধা পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ চলাচলের পর্যাপ্ত যানবাহন বাস, রিকশা, চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষার জন্য স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় তো কোন না কোনভাবে ব্যবস্থা হচ্ছে। এত মানুসের চাওয়া পূরণ করা এই শহরটির পক্ষে সম্ভব কিনা তাও তো ভাবনায় ফেলার কথা। সকল নাগরিকের পরিপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মতো সম্পদ, সামর্থ্য এ রাষ্ট্রের যেমন নেই, সামর্থ্য থাকলেও এই ছোট্ট জায়গায় সে ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করাও সম্ভব নয়। একারণেই জনসংখ্যার ভার কমানো, শহরমুখী প্রবণতা রোধ করার জোরালে পদক্ষেপই অযোগ্য এই শহরটিকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার প্রথম পদক্ষেপ। গ্রামে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, জীবনযাত্রার মান সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির জন্যই স্লোগান হচ্ছে আমার গ্রাম, আমার শহর আর তা সম্ভব হলে গ্রামাঞ্চলে বিকল্প কাজের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে মৌল মানবিক চাহিদা মিটিয়ে আমার গ্রাম স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হবে। অন্যদিকে শহরমুখী প্রবণতাও রোধ করা যাবে। গ্রামে প্রচুর সম্পদ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক যে, প্রতিটি সরকার ঢাকা শহরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান যত পদক্ষেপ নিয়েছে, যত অর্থ ব্যয় করেছে বা যত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, তার এক-দশমাংশ পদক্ষেপও নেয়নি গ্রামাঞ্চলে। স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগিয়ে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে শহরমুখী প্রবণতা রোধ করা যেতো। গ্রামীণ পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে প্রয়োজন নিরীখে কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাতেও জোর দেওয়া হয়নি। একটি জাতির উন্নতির চাবিকাঠি হলো ডিপ্লোমা শিক্ষা। দারিদ্র বিমোচন, স্বনির্ভর জাতি গঠন ও সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষাই হচ্ছে প্রধান অবলম্বন। মেধা ও মননে আধুনিক এবং চিন্তা চেতনায় অগ্রসর একটি সুশিক্ষিত জাতিই একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে পারে। সেজন্যই ডিপ্লোমা শিক্ষাকে জাতির মেরুদ- বলা হয়। জাতির মেরুদ- শিক্ষা, জ্ঞান, প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা শিক্ষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ডিপ্লোমা শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো- জ্ঞান সঞ্চারণ, নতুন জ্ঞানের উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। দুভার্গ্য যে এসমস্ত প্রযুক্তিমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশীরভাগই রাজধানীমুখী ঢাকা শহরে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী বিচ্ছিন্ন মতাদর্শের ভিন্ন ভিন্ন ৭টি প্রতিষ্ঠানও ঢাকা শহরে। বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে স্বাস্থ্য, কৃষি, মেরিন প্রকৌশল শিক্ষায় ১১৭২ টি ইনস্টিটিউটের মধ্যে ঢাকাতেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে অর্ধেকের বেশি ৬১৮ টি। বাকি ৫৫৪ প্রতিটি করা হয়েছে ৩৩টি জেলায়। ৩০টি জেলায় কোন ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কেবল প্রকৌশল বিষয়টি নিয়ে মাতামাতি করলে উৎপাদনমুখী শিক্ষার মাত্র ৭/৮ ভাগ করা হয়, বাকীরা থাকে আঁধারে। ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত ৬১৮টি ইনস্টিটিউটে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়। শিক্ষার্থীরা উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকায় অবস্থিত সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। বাকি অল্প কিছু নিজেই শিল্প, কারখানা, খামার, হাসপাতাল, ক্লিনিক গড়ে তুলেন। ঢাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করে ঢাকা শহরের উপর জনসংখ্যার বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে বাকি ৩৩টি জেলায় ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটের স্বল্পতা এবং ৩০টি জেলায় ডিপ্লোমা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকা সত্বেও এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্র/ছাত্রীরা প্রতিবছর ডিপ্লোমা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা, উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত ইপিজেট, স্পেশাল ইকোনামিক জোন, বিসিক শিল্প নগরীতে প্রতিষ্ঠিত শিল্পগুলোতে প্রশিক্ষিত দক্ষ যোগ্যতাসম্পন্ন জনবল নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতাল, ক্লিনিকে প্রশিক্ষণবিহীন অদক্ষ লোক নিয়োগ দিয়ে প্রায় প্রতিদিনই ভুল চিকিৎসার শিরোনাম হচ্ছে। ঢাকা শহরের জনসংখ্যার চাপ হ্রাস করতে হলে প্রতিটি উপজেলায় জেলায় ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নির্মাণ করে শিল্প কারখানা, খামার, হাসপাতাল, ক্লিনিকে ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা শহরে নতুন করে কোন শিল্প কারখানা, হাসপাতাল, ক্লিনিক যাতে গড়ে না উঠে তার জন্য ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট অনুমোদন স্থগিত করতে হবে। এই চিন্তা থেকেই পরিকল্পিত ডিপ্লোমা শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিকল্পিত শিল্প কারখানা, হাসপাতাল, ক্লিনিক পরিকল্পিত ঢাকা মহানগরী, পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে। ডিপ্লোমা শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের সমন্বিত কর্মফলে দূর হবে আঞ্চলিক উন্নয়ন বৈষম্য। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি হবে আলোকিত রাজধানীর নাগরিকরাও আলাদা মর্যাদা ভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব,ডিপ্লেমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল,khanaranjanroy@gmail.com
শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভাতে সবসময়ই একেকটি চমক থাকে
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রথম সরকার মাত্র সাড়ে তিনবছর দায়িত্বপালনের পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির মাধ্যমে তার অবসান ঘটে। তারপর ১৯৮২ সাল পযর্ন্ত ষড়যন্ত্রকারী, সামরিক এবং খুনিদের দ্বারা গঠিত কোনো সরকারই তাদের মেয়াদ পূণর্ করতে পারেনি। তারপর ১৯৮২ সাল থেকে ৯০ সালের শেষাবধি প্রায় ৯ বছরাধিক এরশাদের স্বৈরশাসন চলতে থাকে। ১৯৯১ সাল থেকে গণতান্ত্রিক ধারা সূচিত হলে বিএনপি ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ পযর্ন্ত পূণর্ দুই মেয়াদে সরকার পরিচালনা করেন। তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রয়ারিতে বিএনপি এককভাবে একটি নিবার্চন করে সরকার গঠন করেছিল যার মেয়াদ ছিল মাত্র দুই সপ্তাহ।কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার গঠনের বিষয়টি অতীতের সব রেকডের্ক ছাপিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন রেকডর্ সৃষ্টি করেছেন। তিনি ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের সংসদে বিরোধী দলীয় নেত্রী হয়েও যেমন রেকডর্ সৃষ্টি করেছেন, ঠিক তেমনি ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পযর্ন্ত প্রথম মেয়াদে, ২০০৯ থেকে ২০১৪ পযর্ন্ত দ্বিতীয় মেয়াদে এবং ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পযর্ন্ত তৃতীয় মেয়াদে এবং ২০১৯ সাল থেকে পরবতীর্ পঁাচ বছরের জন্য টানা তৃতীয় মেয়াদে এবং মোট সবোর্চ্চ চারবার সরকার গঠন করে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন রেকডর্ সৃষ্টি করলেন শেখ হাসিনা। এবারে একাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৯টি আসনে জয়লাভ করে রেকডর্ করেছে। পূবের্ ৪৮ সদস্যের মন্ত্রিসভার ছিল। এবারে ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। যেখানে তারুণ্যকে দেয়া হয়েছে অন্যরকম গুরুত্ব। কারণ নিবার্চনের মনোনয়নেও এবার তারুণ্যকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। মোট ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ২৪ পূণর্মন্ত্রী, ১৯ প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ উপমন্ত্রী দিয়ে সাজানো হয়েছে যারা ৭ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে শপথ নিলেন। সেখানে অধিকতর যোগ্য ও আগামীর পরিকল্পনামাফিক উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উপযোগীদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে মমের্ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভাতে সবসময়ই একেকটি চমক থাকে। এবারো তার ব্যতিক্রম হয়নি। কারণ প্রতিবার মন্ত্রিসভা গঠনের সময় এমন এমন বিষয় তিনি সামনে নিয়ে আসেন তা আগে কারো মাথাতেই কখনো আসেনি। কারণ, দেখা গেছে, ১৯৯৬ সালের অভিজ্ঞতার পর ২০০৯ সালের সরকারে সম্পূণর্ নতুন একঝঁাক মন্ত্রী নিয়ে সরকার গঠন করে শেষদিকে এসে জোটের শরিক এবং আগে বাদপড়া কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাদের পুনরায় মন্ত্রিসভায় অন্তভুর্ক্ত করেন। ২০১৪ সালেও তাদের মন্ত্রিসভায় নিয়েই সরকার পরিচালনা করেন। মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম
ট্রাফিক আইন মানা আমাদের সকলের প্রয়োজন
রাজধানী ঢাকা সহ বাংলাদেশের অন্যান্য শহরগুলোতে যানবাহনের বৃদ্ধির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। গাড়ি চালানোর সঠিক আইন-কানুন না জানা কিংবা আইন-কানুনকে তোয়াক্কা না করার প্রবণতাই এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও রয়েছে গাড়ির জন্য প্রযোজ্য বিশেষ আইন। গাড়ি চালাতে গিয়ে এগুলো অমান্য করলে আপনার বিরুদ্ধে জরিমানা কিংবা মামলা হতে পারে। ট্রাফিক আইন মানা আমাদের সকলের প্রয়োজন।সড়কের চলার জন্য আমরা প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে পারি। রাস্তা পারাপারে ফুট ওভারব্রীজ বা আন্ডারপাস অথবা জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করুন। তাছাড়া যত্রতত্র রাস্তা পারাপার দন্ডনীয় অপরাধ। রাস্তা পারাপারের সময় হেডফোন ব্যবহার করা ও মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। পায়ে হেঁটে চলার সময় ফুটপথ ব্যবহার করুন। চলন্ত গাড়িতে ওঠা-নামা করবেন না। রাস্তায় বা ফুটপথে নির্মাণ সামগ্রী, দোকানের মালামাল, দোকানের সাইনবোর্ড রাখবেন না।ঝুঁকি নিয়ে গাড়িতে ভ্রমণ করবেন না। বাসের ছাদের বাম্পারে, পা-দানিতে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকুন। বাস স্টপেজ ব্যতীত অন্য কোথাও থেকে বাসে উঠবেন না বা বাস থেকে নামবেন না। কখনই চালককে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে উদ্বুদ্ধ করবেন না। রেলওয়ে ক্রসিং বা লেভেল ক্রসিংয়ে লাল বাতি জলন্ত অবস্থায় রাস্তা পার হবেন না। ট্রেন চলে যাবার পর রাস্তা পার হবেন। ভ্রমণকালীন সময়ে অপরিচিত লোকের দেয়া কোনো কিছু খাবেন না। শারীরিক প্রতিবন্ধী, বৃদ্ধ, শিশু ও নারীদেরকে বসার সু্যোগ দিন। বাসের নির্ধারিত স্থান ছাড়া রাস্তায় দাঁড়িয়ে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করা হতে বিরত থাকুন। যাত্রার পরে যাত্রীর নিরাপত্তার ভার অনেকটা থাকে চালকদের ওপর। তাই চালকদেরও মেনে চলতে হবে এই ট্রাফিক আইন-কানুন সমূহ যেমন- অযথা হর্ণ বাজাবেন না। গাড়ি চালানোর সময় অবশ্যই সিটবেল্ট ব্যবহার করুন। গাড়ি চালানোর সময় গতিসীমা মেনে চলুন। ঘনঘন লেন পরিবর্তন করা থেকে বিরত থাকুন। অযথা ওভারটেকিং করবেন না । দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গাড়ির যন্ত্রাংশ চেক করে নিন। উল্টো পথে যে কোন যান চালানো থেকে বিরত থাকুন। গাড়ি চলাচলের নির্ধারিত পথে গাড়ি পার্ক করবেন না। ধারন ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন করবেন না। ক্লান্ত বা অসুস্থ বা মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালাবেন না।ট্রাফিক আইন মেনে না চললে আইন অমান্যকারীর প্রতি মোটরযান আইন- ১৯৮৩ প্রয়োগ করা হয়। তাই আসুন, দুর্ঘটনা এড়াতে এবং সমাজের মানুষের সড়ক নিরাপত্তার জন্য ট্রাফিক আইন মেনে চলি। মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম
যেকোনো বিরোধ আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে
শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসছে। ফলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং হাজার হাজার মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষ দফায় দফায় আলোচনা করে রবিবার একটি সমাধানে পৌঁছে। শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা নতুন সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে শ্রমিকদের অবিলম্বে কাজে যোগদান করতে বলেছেন। কিন্তু অনলাইনে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গতকালও আশুলিয়ায় কিছু কারখানা থেকে শ্রমিকরা বেরিয়ে এসে রাস্তা অবরোধের চেষ্টা করে। পরে পুলিশ এসে তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। সেখানে আটটি কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে।জানা যায়, গত নভেম্বরে ঘোষিত নতুন বেতনকাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। শ্রমিকদের দাবি, কোনো কোনো গ্রেডে বেতন বাড়েনি কিংবা অন্যান্য গ্রেডের সঙ্গে তুলনায় বেতন কমেছে। এই দাবিতে নির্বাচনের আগেই গত ডিসেম্বর মাসে বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু হয়। তখন বলা হয়েছিল, নির্বাচনের পর আলাপ-আলোচনা করে বেতনকাঠামোর অসংগতিগুলো দূর করা হবে। নির্বাচনের পর শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে গত ৯ জানুয়ারি বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য শ্রমসচিবকে প্রধান করে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে মালিকপক্ষ ও শ্রমিকপক্ষের পাঁচজন করে প্রতিনিধি রাখা হয়। কমিটির পর্যালোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন গ্রেডে বেতন আরো বাড়িয়ে অসংগতিগুলো দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালিকপক্ষ যেমন তা মেনে নিয়েছে, তেমনি শ্রমিক প্রতিনিধিরাও তা মেনে নিয়েছেন। বিগত দিনের শ্রমিক বিক্ষোভগুলোতে বেশ কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটানো হয়েছে। অভিযোগ আছে, বিক্ষোভের আড়ালে থাকা কিছু স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিকদের ব্যবহার করে দেশে উত্তেজনা ছড়াতে চায়। যদি এমনটিই হয়ে থাকে, তাহলে উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন?শিল্প-কারখানায় শ্রমবিরোধ সব সময়ই ছিল। শ্রমবিরোধ নিরসনের কিছু পদ্ধতিও আছে। ধ্বংসাত্মক আচরণ করা কিংবা রাস্তা অবরোধ করে লাখ লাখ মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সহনশীলতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দেবে। যেকোনো বিরোধ আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। কেউ যাতে শ্রমিকদের ব্যবহার করে ভিন্ন স্বার্থে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে না পারে সেদিকেও কড়া নজর দিতে হবে। সম্পাদকীয়, মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম
তারুণ্যের শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি, তরুণদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা :নাছির উদ্দিন চৌ
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী :তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে এবং স্বাবলম্বী তরুণ সমাজ গঠন করতে ২০২১ সালের মধ্যে তরুণ উদ্যোক্তা নীতি একটি দক্ষ ও কর্মঠ যুবসমাজ তৈরি করতে ২০২৩ সালের মধ্যে কর্মঠ প্রকল্প এবং প্রতি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে স্বল্প ও অদক্ষ তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিবে আওয়ামী লীগ।প্রশাসন, নীতি ও বাজেট প্রণয়ন,একটি সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে জাতীয় যুবনীতি পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। তরুণদের কল্যাণ ও উন্নয়ন কাজে প্রশাসনিক গতি আনতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আওতায় গঠন করা হবে পৃথক যুব বিভাগ।জাতীয় বাজেটে বাড়ানো হবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বরাদ্দ। জেন্ডার বাজেটের আলোকে প্রণয়ন করা হবে বার্ষিক যুব বাজেট।তরুণদের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করার জন্য গঠন করা হবে যুব মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যুব গবেষণা কেন্দ্র। শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি,স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুগোপযোগী করতে কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে অধিকতর বিনিয়োগ করা হবে ।বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য আর্থিক ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অগ্রাধিকার পাবে।তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রসারিত করা হবে।প্রতিটি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি এই কেন্দ্রগুলোকে পর্যায়ক্রমে তরুণ কর্মসংস্থান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে।দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য দুটি নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হবে। কর্মঠ প্রকল্প-এর অধীনে স্বল্প শিক্ষিত/স্বল্প দক্ষ/অদক্ষ শ্রেণীর তরুণদের শ্রমঘন, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের উপোযোগী জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সুদক্ষ প্রকল্প-এর অধীনে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে তা দূর করতে নানামুখি কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।জাতীয় পর্যায়ে স্বল্প, মধ্যম ও উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের তথ্য সম্বলিত একটি ইন্টিগ্রেটেড ডাটাবেইজ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন ও তরুণদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির জন্য আবেদন করার আহ্বান জানাতে পারবে।বেকারত্বের হার ২০২৩ সালে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থানে কৃষি, শিল্প ও সেবার অংশ যথাক্রমে ৩০, ২৫ ও ৪৫ শতাংশে পরিবর্তন করা হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। এছাড়া উক্ত সময়ে নতুনভাবে ১ কোটি ১০ লক্ষ ৯০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে। আত্মকর্মসংস্থান ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরিতরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে কর্মসংস্থান ব্যাংক এর মাধ্যমে বিনা জামানতে ও সহজ শর্তে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা ইতোমধ্যে প্রদান করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই সুবিধা আরও বিস্তৃত করা হবে।তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা সম্ভাবনার ছাপ রাখতে সক্ষম হবে তাদের জন্য আর্থিক, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনসহ অন্যান্য সরকারি সুযোগ সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা হবে।তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্য প্রণয়ন করা হবে একটি যুগোপযোগী তরুণ উদ্যোক্তা নীতি।বিনোদন, মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক বিকাশে সুযোগ বৃদ্ধি,তরুণদের সুস্থ বিনোদনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় গড়ে তোলা হবে একটি করে যুব বিনোদন কেন্দ্র যেখানে থাকবে বিভিন্ন ইনডোর গেমস এর সুবিধা, মিনি সিনেমা হল, লাইব্রেরি, মাল্টিমিডিয়া সেন্টার, সাহিত্য ও সংস্কৃতি; কর্নার, মিনি থিয়েটার ইত্যাদি।স্বল্প খরচে তরুণদের কাছে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দিতে ইয়ুথ প্ল্যান চালু করা হবে।উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ও জঙ্গিবাদের প্রথম লক্ষ্য যুবসমাজকে আকৃষ্ট করা। এই যুবসমাজ যাতে আদর্শিক ভ্রান্তিতে মোহাবিষ্ট হয়ে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত না হয় সেজন্য কাউন্সিলিং এবং তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশকে ত্বরান্বিত করা হবে। তরুণদের মাদকের ভয়াল আসক্তি থেকে মুক্ত করতে প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র করা হবে ও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর জন্য সরকারি অনুদান বাড়ানো হবে।প্রতিটি জেলায় একটি করে যুব স্পোর্টস কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে।নাগরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন,টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যাত্রায় যুক্ত করা হবে তরুণদের। মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে আমলে নেয়া হবে তরুণদের বক্তব্য। জাতীয় যুবনীতির বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিবীক্ষণেও যুক্ত করা হবে সমাজের সকল স্তরের তরুণদের। (তারুণ্যের শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি) গত ২৩ নভেম্বর দেশের তরুন প্রজন্মের সাথে সরাসরি মতবিনিময় করেন প্রধান্মন্ত্রি শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পুরো অনুষ্ঠানের কথোপকথন এখানে তুলে ধরা হলো- উপস্থাপক: সবাইকে স্বাগতম, শুরু করছি সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) আয়োজিত লেটস টক। আজকের পর্বে আমাদের সাথে উপস্থিত আছেন বিশেষ একজন মানুষ, একজন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আমাদের সবার প্রিয় আপা। আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি আমাদের এই অনুষ্ঠানে। প্রধানমন্ত্রী: আমারও ভালো লাগছে এই ছোট ছোট বাচ্চাদের দেখে। আমার কাছে বাচ্চাই, কেননা আমার নাতী-নাতনীর বয়সী সব। উপস্থাপক: আজকে আমরা যারা এখানে আছি, তরুণ-তরুণী যারা আছেন, তারা সৌভাগ্যবান আপনার সাথে কথা বলতে পেরে। আমি যদি একটু ঘুরিয়ে আবার জিজ্ঞেস করি, যেই সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ গড়তে আপনার নিরলস প্রচেষ্টা, এত পরিশ্রম, সেই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কিন্তু তারা (উপস্থিত তরুণ-তরুণীরা)। এই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সাথে আমাদের এই আয়োজনে এসেছেন আপনি কথা বলতে আপনার কেমন লাগছে? প্রধানমন্ত্রীঃ আমার সৌভাগ্য যে এই তরুণ প্রজন্ম আমার সামনে। আর আমি মনে করি বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে আমাদের তরুণ প্রজন্মই পারবে। আজকে যারা তরুণ শুধু তারা নয়, বরং ভবিষ্যতেও, যেমন আজকেও যে শিশুটি জন্মাবে সেও তো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। তবে তাদের জন্য একটি সুন্দর সমাজ গড়ে রেখে যেতে চাই। উপস্থাপক: তরুণ শেখ হাসিনা সেটা সমন্ধে একটু জানতে চাই প্রধানমন্ত্রীঃ প্রথমে ঢাকায় আসলাম ৫২ সালে। তখন বাবা কারাগারে কিন্তু উনার সাথে দেখা হলো না। হাঙ্গার স্ট্রাইক করার কারনে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ফরিদপুরে। আবার আমরা ফিরে গেলাম। এরপরে নির্বাচন হলো ১৯৫৪ সালে। আব্বা তখন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য। তিনি আমাদেরকে নিয়ে এলেন ঢাকায় ৫৪ সালে। আমরা, আমি, কামাল আর জামাল তখন ছোট মাত্র হামাগুড়ি দেয়, একেবারেই ছোট, কোলে। তখন যখন এসেছি তখনো আমার বাবা খুব ব্যস্ত। পাইনা। উনি সেই সকাল থেকে বেরিয়ে যান আর গভীর রাতে যখন ফেরেন আমরা ঘুমিয়ে থাকি। উপস্থাপকঃ অভাবটা বোধ করতেন, তাই না? প্রধানমন্ত্রীঃ হ্যাঁ, ওই অভাবটা ছিলো। তা ছাড়াও গ্রামের বাড়িতে দাদা-দাদি, আত্মীয়-স্বজন তাদের সবার সাথে থেকে যেটা পেতাম শহরে পাশে মনে হত একটু অন্যরকম, ঐ পরিবেশটা নেই। এরপরেই আব্বা মিনিস্টার হলেন। মিনিস্টার হওয়ার পরে আমরা মিন্টো রোডে ছিলাম। তখন জীবনটা একটু অন্যরকম হলো, বেশ একটু গাড়িতে বেড়াতে যেতাম। স্কুলে ভর্তি করতে নিয়ে গেলেনম ভর্তি করে দিলেন। এরপর ধীরে ধীরে আবার একসময় আব্বা জেলে। তারপর আবার আমরা বাড়ি ছাড়া। ১৪ দিনের নোটিশে আবার আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হলো। কোথায় মিন্টো রোড, সেখান থেকে গেলাম নাজির বাজার, আলাউদ্দিন রোড। পুরনো ঢাকায় যেখানে গাড়িটারি ভেতরে যায় না। রিকশাই চলে। আমাদের গাড়িটারি কিছুই নাই। আমরা রিকশায় চড়ি। এই যে আমাদের জীবনটা, সব সময় উত্থান পতনের মধ্য দিয়েই চলত। তাতে একটা জিনিস, আমরা কখনো অভাব বোধ করতাম না। আমার বাবা বোধয় ছোট বেলা থেকে আমাদের এমনভাবে শিক্ষা দিয়েছিলেন, জীবনটা যখন যেভাবে আসবে সেভাবে মেনে নিতে হবে। আমরা কিন্তু সেভাবেই মেনে নিতাম এবং সেভাবেই করতাম। আব্বা জেলে স্কুল বন্ধ। যেহেতু সরকারি স্কুলে ছিলাম, তারা নাম কেঁটে দিত। একবার নয়, বারবার এ অবস্থা আমাদের জীবনে এসেছিলো। দর্শক প্রশ্ন- মুক্তিযুদ্ধ কালে আপনার পরিবার অবরুদ্ধ ছিলো, সেই সময়টার বিষয়ে জানতে চাই। কিভাবে কেটেছিলো? প্রধানমন্ত্রীঃ আমি যেহেতু সব সময় রাজনীতিতে ছিলাম, আমরা ভাই-বোন সবাই রাজনীতিতে ছিলাম। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্য আমার বাবার যে পরিকল্পনা ছিলো, এটাও আমরা নিজেরা অনেকটাই জানতাম। বাহিরে হয়ত ততটা প্রচার ছিলো না। কিন্তু তিনি আমাদের বলতেন জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত কি হবে না হবে সব কিন্তু তিনি ঠিক করে দিয়ে গিয়েছিলেন। যখন স্বাধীনতা ঘোষণাটা আসল, ৭ই মার্চের পর থেকে দেখলাম সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। ৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু হওয়ার সাথে সাথে উনার যেই মেসেজটা ছিলো, সেটা বিজিবি তৎকালীন ইপিআর ওয়ারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে দিলো। সেই সাথে সাথে পাকিস্তান হানাদার বাহিনি আমাদের বাড়িতে আক্রমণ করে। তারা বাড়িতে ঢোকার ঠিক কিছুক্ষণ আগে জাকির খান নামে এক ভদ্রলোক আমাদের পরিচিত তিনি এসেছিলেন। তিনি আমাকে, আমার ছোট বোন রেহানাকে এবং আমাদের এক খালাতো বোনকে বললেন, আপনারা এখনই এই বাসা থেকে চলে যাবেন। এদের বিশ্বাস করবেন না। এরা কি করতে পারে আপনারা জানেন না। এক রকম জোর করেই আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। এরপর আব্বাকে এরেস্ট করার পর কারফিউ জারি হলো। আর আমার মা ছিলেন বাসায়, আমার ছোট ভাইটা রাসেল আর মেঝো ভাই জামাল। আমরা এসে মাকে খুঁজে পেলাম। ঐ সময় আমরা বিভিন্ন যায়গা থেকে শেল্টার নিয়েছিলাম। কিন্তু এক সময় আমরা গ্রেফতার হয়ে গেলাম। আর যেহেতু তখন আমি অন্তসত্তা ছিলাম। আমার প্রথম সন্তান হবে। কোথাও থাকা, শেল্টার পাওয়াও খুব কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিলো। যখন এরেস্ট করা হলো, পুরাতন ধানমন্ডি-১৮ নম্বর রোডের এক তলা একটি বাড়িতে আমাদের নিয়ে রাখা হলো। সেই বাড়িটায় কিছুই ছিলো না। কোন ফার্নিচার নাই, কিছুই নাই। সব ধূলো মাটিতে ভরা। আর পাকিস্তান আর্মিরা আমাদের একটি কম্বল দেয়া হলো। পুরো পরিবারের জন্য ঐ একখানা কম্বল ছিলো একমাত্র সম্বল। কোন খাওয়া-দাওয়া কিছু নাই। কারণ দুপুর বেলা এরেস্ট করে নিয়ে গেছে সারাদিন-সারারাত আমরা ঐ অবস্থায় থাকতে হলো আমাদেরকে। আর তারপর থেকে ঐ বন্দিখানায় তাদের অত্যাচারের শেষ ছিলো না। খুব অত্যাচার করত। অনেক সময় বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিতো। আর আমাদের কোন প্রাইভেসি ছিলো না। কোন পর্দা নাই, আমাদের কাছে কিছুই ছিলো না। এই অবস্থায় থাকতে হয়েছে। এই অবস্থায় আমার প্রথম সন্তান জন্ম হলো। সবচাইতে দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, জন্ম হওয়ার পর ওকে যে প্রথম কাপড়টা দেয়া হবে সেটাও দেবার কোন ক্ষমতা আমাদের ছিলো না। কারণ আমাদের বাজারটাজার করার এত তখন সুযোগও ছিলো না। হাসপাতালের কাপড় দিয়েই কোন মতে তাকে রাখা হলো। আমার এক বান্ধবী ছিলো, সেই সন্তান সম্ভাবা ছিলো। ওর বোনের অপারেশন হয়েছিলো, পাশের কেবিনে ছিলো। ও কতগুলো কাপড় দিয়ে গেলো আমাকে। সেখানে ঐ অবস্থায় আমরা যখন থাকতাম, মাটিতে, স্যাতস্যাতে ফ্লোর, সেখানেই থাকতে হতো। তবে একটা জিনিস আমরা কখনো মনের জোর হারাইনি। আমাদের একটা ধারনাই ছিলো, দেশ একটি মুক্ত হবেই, স্বাধীন হবেই। আর জামাল ঐ জেলখানায় থাকতে একদম প্রস্তুত ছিলো না। সে বলত, আমাকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে হবেই। ও খুব গেরিলা কায়দায় একদিন পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে গেলো। অতকষ্টের মধ্যে থেকেও দেশ স্বাধীন হয়েছে এটাই বড় কথা। কিন্তু যেদিন পাকিস্তান আর্মি সেরেন্ডার করল ১৬ ডিসেম্বর। আমরা কিন্তু মুক্তি পাইনি। তখন মনে হতো সত্যেন সেনের কথা, রুদ্ধদ্বার মুক্তপ্রাণ। চারিদিকে শুনি জয় বাংলা স্লোগান। আমরা ভেতর থেকে স্লোগান দিতাম। আমি, মা, রেহানা সবাই কিন্তু ভেতর থেকে স্লোগান দিচ্ছি। আমরা কিন্তু তখনো বন্দী এবং সারাদিন ওরা ওখানে মানুষ হত্যা করল। আমরা শুনছি মানুষের চিৎকার, আহাজারি, কান্না। ১৭ ডিসেম্বর আমরা মুক্তি পেলাম। ত ঐ সময়টার কথা আসলে, খাওয়া নাই, দাওয়া নাই। যেমন একটা কেরোসিনের চুলা, একটা হাড়ি। অল্প কিছু চাল-ডাল দিয়ে কোন মতে একটু খিচুরি করে ..। কেউ আসলে পেট ভরে খেতে পারবে না। যখন কারো ক্ষুধা লাগবে, এক মুঠ খেতে পারবে। কারণ ঐ খাবারটা ফুরিয়ে গেলে এরপর যে কি হবে আমরা জানি না। দেশ যখন স্বাধীন হয়ে গেলো, মনে হলো যেনো সব কষ্ট ভুলে গেলাম। সব কষ্টই ভুলে গেলাম। এটা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা। দর্শক প্রশ্ন- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীম আমরা জানতে চাচ্ছি আপনার সেই তরুণ রাজনীতি জীবনের কিছু কথা। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, আমরা তরুণরা যারা আছি, যারা ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে চাই আজকের কথা তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীঃ রাজনৈতিক একটি পরিবারে জন্ম। আর রাজনীতি আমাদের সাথে এমনভাবে জড়ানো ছিলো যে রাজনীতি ঠিক কখন প্রবেশ করালাম তা সঠিকভাবে বলতে পারব না। স্কুল জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত। সেই সময় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের আন্দোলন, তারপর আরো বিভিন্ন আন্দোলন। যখন আন্দোলন হতো, তখন এটা ঠিক স্কুল পালিয়ে চলে যেতাম সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বট তলায় মিটিং শোনার জন্য। আবার স্কুল থেকে আমাদের সংগঠন করতে হবে, ছাত্রলীগ করতে হবে বলা হলো। তাই স্কুল থেকে বিভিন্ন স্কুলে যেতাম। মেয়েদেরকে বোঝাতাম কেনো আমাদের সংগঠন করতে হবে। ‘৫২র আন্দোলন। মানে আমরা আমাদের বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করলাম ঠিকই। কিন্তু প্রথমে আসল আরবী হরফে বাংলা লিখতে হবে। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হলো। এরপর রোমান হরফে বাংলা লিখতে হবে। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন হলো। তা আন্দোলন শুনলেই আমরা ওখান (স্কুল) থেকে চলে যেতাম। ছোটবেলার একটা মজার ঘটনা বলি, ধর্মঘট চলছে তখন। আমাদের হেড মাস্টার আবার ভিষণ কড়া ছিলেন। কাজী ওমর আলী সাহেব, আমি উনাকে দেখলে ভয়ে দৌড়ে পালাতাম। কিন্তু খুব আদরও করতেন, খুব ভালো শিক্ষক ছিলেন। মানে গাধা পিটিয়ে মানুষ করা বলে না, উনিও তেমন আমাদেন গাধা পিটিয়ে মানুষ করতেন। আমরা ঠিক করলাম, স্কুল ছুটি দিতে হবে। তা এমনিতে ত আর দিবে না। ত হেড স্যারের রুমের পাশেই স্কুলের ঘণ্টিটা। এখন ঘণ্টিটা আমরা কিভাবে বাজাব। ত আমরা একটা মেয়েকে দায়িত্ব দিলাম ঘণ্টিটা বাজাবে, আরো কয়েকজনকে দায়িত্ব দিলাম দাড়োয়ান কিছু বোঝার আগেই গেটটা খুলে দিবে। যখন ঘণ্টি বাজাতে শুরু করলাম ছোট বাচ্চারা তারা সব ছুটে পালাতে শুরু করল। তখন মজাদার বিষয় হলো বাচ্চারা ছুটছে তাদের ধরার জন্য শিক্ষকেরাও ছুটছে। আর তখন আমরা বের হয়ে চলে এলাম। স্কুল থেকে সবাই দৌড় দিয়ে এক দৌড়ে চলে গেলাম সব। মিটিংয়ে গেলাম। তখন ক্লাস সেভেনে পরি। (হেসে) বেশিদিনের কথা না! একদিন স্কুলে স্ট্রাইক করাতে গিয়ে দেখি খুব লম্বা চওড়া এক পুলিশ অফিসার সে আমাকে ধমক দিচ্ছে। আমরা গেটের বাহিরে দাড়িয়ে, যে কেউ যেতে পারবে না। ত খুব ধমক দিচ্ছে যে, তুমি জানো আমি কে? তোমাকে আমি জেলে নিতে পারি। জেল খানায় ত আমরা প্রতি ১৫ দিন পরপর যাই। ত আমাকে এই ভয় দেখিয়ে ত লাভ নাই। আমি বললাম, আমি ত জেল খানায় সব সময় যাই। বলল সে, হ্যাঁ! তোমার নাম কী? আমি বললাম, আমার নাম, বাবার নাম হেড স্যার জানেন। তাকে জিজ্ঞাসা করে নিয়েন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মেয়েরা ছিলো, তারা ইশারা দিয়ে আমাকে চলে আসতে বলল সেখান থেকে। ব্যস ওখান থেকে চলে আসতে গেলাম। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের বেড়া ফাঁক করে ওখান থেকে ঢুকে যেতাম। তখন বাস ছিলো মুড়িট টিনের মত। তা সেরকম একটা গাড়িতে পুলিশ আমাদের ধাওয়া করছে। ওখান থেকে বের হয়ে পলাশী মোড় হয়ে এখন যেটা জহরুল হক হলের ভিতর দিয়ে ওয়াল টপকে ওখান থেকে আমরা রোকেয়া হলে ঢুকে গেলাম। যখন কলেজে ভর্তি হলাম। আমি ভর্তি হওয়ার সাথে সাথে সেখানকার ছাত্রীরা খুবই উৎসাহীত। আবার আমাদের ছাত্রলীগের নেতারাও খুব উৎসাহীত। আমাকে প্রথমে ছাত্রলীগের সেক্রেটারি করা হলো কলেজ ইউনিটের। আমরা বিভিন্ন কলেজে গিয়ে গিয়ে সংগঠন করতাম। তখন প্রত্যেক কলেজে বার্ষিক নির্বাচন হতো। তখন আমাকে সংগঠনের সেন্ট্রাল কমিটি থেকে জানানো হলো, তোমাকে নির্বাচন করতে হবে। তখন আমার মা আবার বাঁধা দিলেন। কেননা আমার বাবা তখন ছয় দফা দিয়েছেন। ছয় দফা দেয়ার পর তিনি জেলে। আমাদের পার্টির তখন অধিকাংশ নেতাই বলতে গেলে জেল খানায় বন্দী। ঐ অবস্থায় নির্বাচন করাটা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো। আমি যে কলেজে পড়তাম, সেটা ছিলো সরকারি কলেজ। স্বাভাবিকভাবেই সরকারি কলেজে শেখ মুজিবের মেয়ে নির্বাচন করে জিতবে এটা কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছুতেই মানতে পারেনি। কলেজ কর্তৃপক্ষ শুধু না, তখনকার সরকারও। কারণ তখন গভর্নর ছিলো মোনায়েম খান আর প্রেসিডেন্ট ছিলো আইয়ুব খান। মিলিটারি ডিকটেটর আইয়ুব খান। তার বিরুদ্ধেই আমাদের সংগ্রাম ছিলো। তাদের কথা ছিলো, আমি যেনো কিছুতেই নির্বাচনে জিততে না পারি। আবার আমার মা খুব উদ্বিগ্ন ছিলেন। মা বলেন, যদি তুমি ইলেকশনে জিততে না পারো, তাহলে মানুষ মনে করবে ৬ দফার প্রতি সমর্থন নাই। আর সরকারের কথা ছিলো, যদি আমি জিতে যাই। তাহলে প্রমাণ হবে সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থীদের ৬ দফার প্রতি সমর্থন রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে একটা বাধা। বাসায় আসলে মা বলত, এখনই যাও, উইথড্রো করো। কলেজে গেলে আমার বান্ধবী যারা ছিলো বা সংগঠন থেকে বলত, না, উইথড্রো করা যাবে না। তুমি ত জিতবে তুমি কেনো প্রার্থী থাকবে না? এই এক টানাপোড়েনের মধ্যে। আমার মা খুব শক্ত ছিলেন। মা বললেন, সবকিছু বন্ধ। টাকা পয়সা সব বন্ধ। কিছু দেবন না। তুমি ইলেকশন করতে পারবে না। যাই হোক এরপর একটা পর্যায়ে ইলেকশন হলো। ইলেকশনে আমি জিতলামই না শুধু, আমার বিপক্ষে দুই প্রার্থী ছিলো। তাদের দুইজনের ভোট যোগ করেও তার দ্বিগুণ ভোট আমি পেলাম। তখনকার ছবিও আছে। কাগজের মালাটালা দিয়ে আমাকে নিয়ে গেলো শহীদ মিনারে। বক্তৃতা দিতে হবে। তখন মুখে রংটং মাখা ঐ অবস্থায়। শহীদ মিনারে যখন আমাকে দাড় করিয়ে দিলো বক্তৃতা দিতে, তখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী সেখানে। কলেজে আমগাছের একটা বেদি ছিলো। কোন কিছু হলে সেটার ওপর দাড়িয়ে খুব বক্তৃতা দিতাম। কিন্তু ওখানে গিয়ে সত্যিই আমি আর বক্তৃতা দিতে পারলাম না। খুব ইমশনাল হয়ে গেলাম। চোখে শুধু পানি আসছিলো। জীবনে প্রথম শহীদ মিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে আমি সত্যিই নার্ভাস হয়ে গেলাম। আমি কি বলব আমি আর কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। আমি সবাইকে কেবল ধন্যবাদ দিলাম। দিয়েই আমি চুপ। আমার ছাত্রলীগের অন্যরা বলছিলো, তুমি এটা বলো, ওটা বলো। আমি বললাম, আর কিছু বলতে পারব না। আপনারা বলেন। যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম তখন শুনলাম, গভর্নর ডেকে ভিসিকে বলছেন, গণি সাহেব ভিসি ছিলেন। তাকে বলছেন, শেখ মুজিবের মেয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলো কিভাবে? তিনি জানান, হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে প্রতি বছর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়। আলাদাভাবে খোঁজ নেয়ার সুযোগ কোথায়? তিনি বেশ একটু ডাটের লোকই ছিলেন। পরে একজন শিক্ষক আমাকে জানিয়েছিলেন, তুমি কি জানো, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর গভর্নর ভিসিকে ডেকে নিয়ে ধমক দিয়েছেন, শেখ মুজিবের মেয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো কিভাবে। ত আমাদের জীবনটা এমনই ছিলো। আব্বা যখন মন্ত্রী ছিলো তখন শিক্ষকরা খুব আদর করতেন। আবার আব্বা যখন জেলে গেলো তখন বলত, ও, ওর বাবা ত জেলে। তখন যত দোষ আমাদের ওপর। মানে, যা কিছু হারায় গিন্নি বলেন কেষ্টা বেটাই চোর। এমন চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য থেকে আমাদের যেতে হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির জন্য আমার বাবা কাজ করছে এটা জানতাম বলে এই চরাই উৎরাইটাকে আমরা বেশ সহজভাবে নিতে পেরেছিলাম। এটা আমার মায়ের শিক্ষা, আমার দাদা-দাদির শিক্ষা। হয়ত মিটিংয়ে যাব। মা হঠাৎ করে বললেন মিটিংয়ে যেতে পারবে না। আর মা যদি একটা কথা বলতেন তা অমান্য করে কিছু করা আমাদের সাধ্যে ছিলো না। মা দরজাও লাগাতেন না, গেটও লাগাতেন না। কিছু করতেন না। শুধু বলতেন যেতে পারেব না। আর আমাদের সেই শিক্ষা ছিলো, মা বললে শুনতে হবে। কিন্তু প্রতিবাদও ত করতে হবে। সুতরাং হাঙ্গার স্ট্রাইক। নাস্তা খাব না ভাত খাব না, কিচ্ছু খাবো না। বসে বসে ভ্যা ভ্যা করে কান্না। কিন্তু আমার দাদা থাকলে খুব ভালো হতো। তিনি থাকা অবস্থায় এমন হলো, খুব জরুরি মিটিং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে যেতেই হবে। মা বললেন, না আজকে বের হতে পারবে না। দাদা শুধু ডেকে মাকে বললেন, দেখ, আমিত কোনদিন আমার ছেলেকে মানা করিনি। আমিত কোনতদিন নিষেধ করিনি। ত তুমি নিষেধ করছ কেনো। ও যেতে চায়, যেতে দাও। আমার মা আবার মুরুব্বিদের কথা খুব মেনে চলতেন। দাদা বলেছেন। মা আর কিছু বললেন না। যাও, দাদাকে পেয়েছো এখন যাও। উপস্থাপক- ৭৫ এ হঠাৎ করে ছোট বোন বাদে বাকি সবাইকে হারালেন। এমন মর্মান্তিক একটি আঘাতের পর আপনি নিজেকে শক্ত করলেন কিভাবে? প্রধানমন্ত্রী-এটা এতটা অপ্রত্যাশিত ছিলো! আর সেই সাথে একটা ভয়ও হত। আব্বা এভাবে একটা দেশকে স্বাধীন করলেন, তারপর স্বাধীনতা বিরোদী এই গোষ্ঠীটি সব সময় সক্রিয় ছিলো। আমার স্বামী যেহেতু নিউক্লিয়ার সাইনটিস্ট ছিলেন। উনি ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন রিসার্চের জন্য। আমাকেও বললেন চলে আসতে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। আমি ভিসি স্যারের সাথে দেখা করলাম ছুটির জন্য। বঙ্গবন্ধুর তখন যাবার কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন, আর আমি থাকব না! ত আমি ভিসি স্যারের কাছে গেলাম, আমার স্বামী আবার মতিন চৌধুরী সাহেব ভিসি স্যার তার ছাত্র। তিনি বললেন, তুমি চলে যাবে এটা একটা কথা হলো নাকি?; আমি বললাম, স্যার আপনার ছাত্রকে ত আপনি চেনেন, ভীষণ চাপ দিচ্ছে। আপনার ছাত্রকে বলেন, আমি এখন যাব না, ১৫ তারিখের পরে যাব। তখন তিনি বললেন, তুমি ওকে আমার কথা বলে ফোন করো। তখন ত আর এখনকার মত এত ফোন ছিলো না। একটাই ইন্টারন্যাশনাল কল করা যেত যেই ফোনে সেটা আমার আব্বার বেড রুমে ছিলো। ওখানে বসা উনি, বললাম, আমি একটা ফোন করব। ফোন করে যখন আমি বললাম তখন খেলাম বকা। আব্বার সামনে ঝগড়াও করতে পারছি না। আবার কিছু বলতেও পারছি না। হয়ত অন্য সময় হলে কিছু বলতাম। কিন্তু তখন কিছু বলতে পারছি না। কিন্তু আব্বা সব বুঝছিলেন। বলছিলেন, কি, ওয়েজেদ এটা বলছে, ও কথা বলছে। ঠিক আছে, তাহলে তুমি যাও। তখন আমার খুব মন খারাপ। একটা ছবি আছে না, আব্বা আমাকে জড়িয়ে ধরে আছেন। সেন্ডু গেঞ্জি গায়ে, ওটা আব্বার সাথে আমার শেষ ছবি। আমি কাঁদছিলাম, আর আমাকে ধরে সান্তনা দিচ্ছিলো। ঠিক আছে তুমি যাও। চলে গেলাম। তবে এটা ঠিক, খুব মনটা খারাপ ছিলো। কারণ তার কিছুদিন আগে আমার দুই ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে। আমরা খুব একটা আনন্দের মধ্যে থাকব, আর আমার সব ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। আর বিদেশে যাবার সময় মানুষ যেমন খুশি হয়, তেমন কোন খুশি ছিলো না। আর আমার মাও খুব কাঁদলেন। খুব ভারাক্রান্ত মন নিয়ে গেলাম। আমরা আবার তখন ইউরোপ ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। তখন আমরা বেলজিয়ামে। হঠাৎ একদিন সকালে ফোন। বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর বললেন, ওখানে খুন হয়েছে। ওই কথা শোনার পর মনে হলো, তাহলে তো আমাদের আর কিছু নাই। ওদের ভাষায় টিভিতে আব্বার শুধু ছবি দেখছি। কিছু বুঝতে পারছিলাম না। জার্মানিতে ফিরে এলাম। তখন সেখানে অ্যাম্বাসেডর যিনি ছিলেন, তিনি আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। উনি, উনার ওয়াইফ, সবাই খুব সান্তনা দিলেন। তিনি এক সময় আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে বললেন, তিনি বিভিন্ন ভাবে খবর নিয়েছেন, সম্ভবত কেউ আর বেঁচে নাই। আমি আসলে বলতে পারব না। পৃথিবীর ঐ সময়টা আমার কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। আমি এসে দেখলাম, রেহানা শুয়ে আছে। আমি আস্তে করে রেহানাকে জড়ায়ে ধরে শুয়ে থাকলাম। বলতে পারলাম না কিছু। ওকেও আমি বলিনি। আর ও যখন জানতে পারল, ও কিছু আমাকে বলেনি। এরকম একটা অবস্থার মধ্যে দিয়ে। তখন আমাদের অ্যাম্বাসিডর, ভারতের অ্যাম্বাসিডর কথা বলছিলেন। কেননা তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাদের খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন। মার্শাল টিটোও ফোন করেছিলেন। তারপর আমরা ভাবলাম, না আমরা ফিরে যাই দেশে। দেখি দেশে যেতে পারি কিনা। তারপর চলে এলাম দিল্লিতে। তখন জানতে পারলাম, কেউই বেঁচে নেই। এর আগেও মনে আশা ছিলো, মা, রাসেল হয়ত বেঁচে আছে। কিন্তু মিমেস গান্ধীর সাথে দেখা হলে তিনি জানালেন, না কেউ ই বেঁচে নেই। তিনি আমাদের ওখানে শেল্টার নিয়ে থাকতে বললেন। ছয়টা বছর ওখানে থাকতে হলো। প্রথম কয়েকটা বছর আসলে বিশ্বাস করতে পারিনি। বিশ্বাস করতে চাইনি। নামাজ পড়তাম, মোনাজাত ধরতাম। কিন্তু বাবা-মার কথাটা কখনই বলতে পারতাম না। ভেতর থেকে আসত না। যাই হোক, দিন চলে যায়। দর্শক প্রশ্ন- ১৯৮১ সালে যখন আপনি ফেরত আসলেন, তখন কারা বা কোন বিষয়টা আপনাকে মোটিভেট করেছিলো। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে, মানে আপনি সাহস কোথা থেকে পেলেন? আপনার ভয় করেনি? প্রধানমন্ত্রীঃ ৭৫ পরবর্তী ৩-৪ বছর একটা অন্ধকার সময় ছিলো। বলা যায় একটা বাসায় বন্দী। সব যায়গায় যাবার সুযোগ ছিলো না। এমনকি নিজের পরিচয় দেবারও সুযোগ ছিলো না। একটা নামও দেয়া ছিলো। ঐ নামে আমাদের পরিচয়। নিজের পরিচয়টাও ছিলো না। তখন মনে হতো, জীবনের সবথেকে কম যেটুকু প্রয়োজন সেটুকু নিয়েই চলব। সেখানে থেকে সংসারের প্রতিটি কাজ একে একে আমাদের শিখতে হলো, করতে হলো। করে করে শিখলাম। আসলে বাড়ির বড় মেয়ে ছিলাম। আলসেও ছিলাম খুব। এমনও অনেক দিন গেছে, না খেয়ে ঘুমিয়ে যেতাম। আব্বা এসে ঘুম ভাঙ্গিয়ে ভাত মাখিয়ে মুখে তুলে দিতেন। আমার খুব বদ অভ্যাস ছিলো বসে গল্পের বই পড়া আর গান শোনার। তখন মা এক কাপ চা বানিয়ে এনে দিতেন। নিজে খুব একটা বেশি কাজ করতাম না, আলসে ছিলাম এটা ঠিক। আর সেখান থেকে এমন একটা অবস্থায় পড়ে গেলাম, যে ঘর ঝাড়ু দেয়া থেকে শুরু করে সবকিছু নিজেদের করতে হতো, করতাম। একটা পর্যায়ে এসে আমার চাচা এসে রেহানাকে নিয়ে গেলো লন্ডনে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা এবং দেশের মানুষের জন্য কিছু করা। কেননা ছোট বেলা থেকে আব্বার সাথে সাথে থেকে জানা, উনি বাংলাদেশের জন্য কি করবেন, বাংলাদেশটাকে কিভাবে গড়ে তুলবেন; সব সময় এ গল্পটা করতেন। করতেন বলেই মনে হলো, এভাবে বসে থাকলে তো চলবে না। আমাদের তো কিছু করতে হবে, দেশের জন্য। আর কিছু না হোক, মানুষের জন্য কিছু করতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমি আসব। এটা ঠিক, ঐ সময় আসাটা বেশ ভয়াবহ ছিলো। তার কারণ খুনিদের কিন্তু বিচার হয়নি। এতগুলো খুন যারা করল, একটা ছোট্ট শিশুকেও তারা ছাড়েনি। তাদের বিচার করা যাবে না, এমন ইনডেমনিটি বিল তারা পাশ করল। আইন করে দেয়া হলো খুনিদের বিচার করা যাবে না। আমি আমার বাবা-মাকে হারিয়েছি আমি বিচার চাইতে পারব না। আমি মামলা করতে পারব না। এই অবস্থায় দেশে ফেরা অবশ্য সাহসের বিষয়। কেননা অনেকেই আমাকে বলেছে, দেশে ফিরলে এয়ারপোর্টেই আমাকে গুলি করে মারবে। সেখানে আমার চিন্তা ছিলো, বাবা-মা, ভাই-বোন সবাইকে তো হারিয়েছি। হারানোর আর তো কিছু নাই। সবই যখন হারিয়েছি। জীবনটাও না হয় চলে যাবে। তাই বলে মৃত্যু ভয়ে বসে থাকলে ত আর হবে না। আর মরার আগে মরতে আমি রাজি না। আমি দেখতে চাই বাংলাদেশের জন্য কিছু করতে পারি কিনা। আর সে জন্যেই ফিরে আসি। যখন এয়ারপোর্টে নামলাম। ঐ সময়টা ছিলো খুব কষ্টের। কারণ আমি যখন যাই, তখন এয়ারপোর্টে ত আমাদের সবাই ছিলো। কামাল-কামালেই বউ, জামাল-জামালের বউ, ছোট রাসেল সবাই আমাকে বিদায় দেয়। আর আমি যখন ফিরে এলাম, তখন হাজার হাজার মানুষ। আর মুষুলধারে বৃষ্টি। আকাশে ঘণ মেঘ। আমার মন তখন হাহাকার করছে। কারণ যে মুখগুলো আমি দেখতে চাচ্ছি। সে মুখগুলোত দেখতে পাচ্ছি না। তাদেরকে ত খুঁজে পাচ্ছি না। এয়ারপোর্ট থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত আসতে ৪ ঘণ্টা লেগেছিলো এত মানুষের ভীড় ছিলো। সেখানে বৃষ্টিতে ভিজে মাইক্রোফোনের সামনে আমাকে বক্তৃতা দিতে বলা হল। ওখানে দাড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম। ১৫ আগস্ট এটা মেনে নেয়া যায় না। এই বাংলাদেশ আমার বাবা স্বাধীন করে গেছেন। এই বাংলাদেশের মানুষগুলো দরিদ্র, দুঃখি। তাদের জন্য আমার কিছু করতেই হবে। তবে এত বড় দলের দায়িত্ব নিতে হবে। সেটা ভেবে আমি আসিনি। কিন্তু কাজ করব, একজন কর্মী হিসেবে। এটা ভেবেই দেশে এসেছিলাম। এখনো আমি আওয়ামী লীগের একজন সার্বক্ষনিক কর্মী। আর প্রধানমন্ত্রী হবার পর মনে করি আমি বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মী। আর যখন ভালো কিছু করতে পারে দেশের জন্য, তখন মনে হয় আব্বা দেখছেন। ভয় পাইনি কখনো, আর ভয় পাবও না মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত। উপস্থাপকঃ এই স্রোতের বিপরীতে আপনার যাত্রা সম্পর্কে বলেন প্রধানমন্ত্রীঃ বনানী কবরস্থানে আমি যখন গেলাম। সেখানে সারি সারি কবর। কিন্তু ৩২ নম্বরের বাড়িতে আমাকে কিন্তু ঢুকতে দেয়া হয়নি কখনো। এমনকি আমি যে একটু মিলাদ পড়াব বা বাবা-মার জন্য দোয়া করাব সেই সুযোগও তৎকালীন সরকার আমাকে দেয়নি। তখন ক্ষমতায় জিয়াউর রহমান। বললেন, আমার থাকার জন্য অনেক বড় বাড়ি দেবেন। আমি বললাম, অনেক বড় বাড়ির দরকার নেই। এই বাড়িতে আমার বাবা-মা শাহাদাৎ বরন করেছেন। আমি এখানে যেতে চাই তাদের জন্য জন্য মিলাদ পড়ব, দোয়া করব। আমাকে কিন্তু ঢুকতে দেয়নি। আর একটি মাত্র টিভি, একটি মাত্র রেডিও। মিথ্যা ও অপপ্রচার ছিলো। সরকারের তরফ থেকে বাঁধা ছিলো। দলের ভিতর থেকেও ছিলো বাঁধা। কিন্তু তা অতিক্রম করতে পেরেছি। দর্শকের প্রশ্ন- ২০০৭ সালে আপনি আপনার ছেলেকে দেখতে বিদেশে গেলে দেশে আসার ক্ষেত্রে বাধা দেয়া হয়। বলা হয় দেশে আসলে আপনাকে গ্রেফতার করা হবে। আপনি কি তারপরও ভয় পাননি? প্রধানমন্ত্রীঃ ২০০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলাম। সে সময় বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছু কাজ করেছিলাম। দুর্ভাগ্য হলো সে কাজগুলো আর থাকল না। বরং জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস আর দুর্নীতিতে ৫ বার চ্যাম্পিয়ান হলো বাংলাদেশ। তারপর যখন আরেকটি নির্বাচন এলো। অনেক ঝড়-ঝাপ্টা আসল। দেখা গেলো ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে ভোটার তালিকা তৈরি করা হলো এবং এমনভাবে নির্বাচন সাজানো হলো যে জনগণের ভোট দেয়ার আর ক্ষমতা ছিলো না। এর মধ্যে আমার ছেলের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। জয়েরও গলব্লাডার অপারেশন হয়েছে। তাদের সাথে দেখা করতে বিদেশে গেলাম। তখন আমার বিরুদ্ধে মার্ডারের মামলা দিয়ে এরেস্ট ওয়ারেস্ট ইস্যু করা হলো। এরপরও যখন আমি দেশে ফিরেত চাইলাম, তখন তারা বলল, আপনি দেশে ফিরতে পারবেন না এবং প্রতিটি এয়ারলাইনসকে বলে দেয়া হলো আমাকে নিয়ে তারা এলো তাদের বাংলাদেশের এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করতে দেয়া হবে না। আমেরিকা থেকে লন্ডনে যাওয়ার সময় আমি যেই এয়ার লাইনস ব্যবহার করতাম, তারা আমাকে বোর্ডিং পাস দেবে না। ঝগড়া করে বললাম, তোমার এয়ারক্রাফট লন্ডনে যাচ্ছে। ঢাকায়ত যাচ্ছে না। তিন ঘণ্টা বাকবিতণ্ডা শেষে আমি লন্ডনের ফ্লাইটে উঠি। সেখান থেকে লন্ডনে পৌছানোর পর আমাকে বাংলাদেশের ফ্লাইটে নেয়া হচ্ছে না। কিন্তু আমি দেশে ফিরবই। তখন আন্তর্জাতিক সমর্থন পেলাম আমি। সকলের কথা এটাই ছিলো। আমারও যুক্তি ছিলো, আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তা মুকাবিলায় আমি দেশে আসব। কিন্তু ওদের ধারণা ছিলো আমাকে মামলার ভয় দেখালে হয়ত আর দেশে ফিরব না। আমি বললাম, না আমি দেশে আসব এবং মামলার মুখোমুখি হবো। শেষে আন্তর্জাতিক চাপে বাধ্য হয়ে আমাকে দেশে আসতে দেয়া হলো এবং এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেফতার করে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। কোর্ট থেকে আমাকে পরিত্যক্ত একটা ঘরে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হলো। আর রাজনীতি করতে দেখেছি, করে এসেছি। জানি আমাকে জেলে যেতে হবে। তাই এটা নিয়ে আমার কখনো দুশ্চিন্তা ছিলো না। বরং আগে থেকেই গুছিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। কি বই নেব। রেহানা আরো ফোন করে বলে দিয়েছিলো- টর্চ, মোম, লেখার কাগজ ইত্যাদি নিয়ে নিলাম। কিছু টাকাও নিয়েছিলাম সাথে। কারণে দেখতাম, বাবা কিছু টাকা সাথে রাখতেন। দর্শক প্রশ্ন- জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আপনি কাজ করে গেছেন। এটি নিয়ে আপনার মধ্যে কোন শঙ্কা কাজ করে বা করছে কিনা? প্রধানমন্ত্রীঃ আমি চেয়েছি দেশের মানুষ শান্তিতে থাকুক। কিন্তু সারা দেশে যখন একযোগে ৫০০ স্থানে বোমা হামলা হয়, বোমা পুতে রাখা। এ ধরণের কাজ আমি পছন্দ করিনি। আর আমি এর আগে ক্ষমতায় এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি করে সেখানকার অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আমাদের দেশে আশ্রয় নিয়ে প্রতিবেশী দেশে হামলা করা হতো। আমি বুঝেছিলাম, জঙ্গিবাদ থাকলে কোন দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। বিরোধী দলে থাকি, আর সরকার দলে; যেটা নীতির ব্যাপার সেটার বিষয়ে সোচ্চার হওয়া শুধু সরকারি দলে আসলেই করব, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় করব না এমন নয়। আমার দেশকে আমি ভালবাসি। আর সে কারণেই এ বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে সব সময় প্রতিবাদ করেছি। আর আমাকেতো অনেক বার হত্যার চেষ্টা হয়েছে। কয়েকবার না অনেকবার। এমনকি সামনে থেকে গুলি করেও হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে আমাকে। যখন বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়েছি তখনও বাধা পেয়েছি। কিন্তু একটা বিষয়, এ দেশের মানুষ, যেখানে গিয়েছি সেখানে এত ভালবাসা পেয়েছি। এই ভালবাসা আমার শক্তি। সেটাই আমার প্রেরণা। আজকে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছি। এটাও তো বড় বিষয়। উপস্থাপকঃ এতক্ষন আমরা রাজনীতিবিদ শেখ হাসিনার কথা শুনলাম। এখন আমরা ব্যক্তি শেখ হাসিনা সম্পর্কে জানতে চাই। আমার নিজেরই একটা প্রশ্ন আছে আপনার কাছে। আপনি এত খাটেন, আপা নিজের জন্য সময় পান? প্রধানমন্ত্রীঃ আমি আমার জীবনটাকে তো উৎসর্গ করেছি দেশের মানুষের জন্য। আসলে আমার নিজের বলে তো কিছু নেই। আর রাতে ৫ ঘণ্টা ঘুমাই। আর বাকি সময় চেষ্টা করি, কত দ্রুত আমার কাজগুলো শেষ করতে পারি। কারণ আমি জানি যে কোন মুহুর্তে চলে যেতে হতে পারে। কখনও গুলি, কখনও গ্রেনেড হামালায়। তাই প্রতিটি মুহুর্তে দেশের মানুষের জন্য কিছু করে যাওয়ার চেষ্টা করি। দর্শক প্রশ্ন- রাজনীতিতে না আসলে কি করতেন? ছোটবেলায় কি হতে চেয়েছিলেন? প্রধানমন্ত্রীঃ আমার ছোট বেলায় ইচ্ছা ছিলো ডাক্তার হবো। এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, তখন দেখলাম অঙ্কে কাঁচা। আর বন্ধুরা সবাই আর্টসে ছিলো, আমিও আর্টসে ভর্তি হই। এরপর ইচ্ছা ছিলো শিক্ষক হবার। আবার শিক্ষক মানে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। বাচ্চাদের পড়াব। দর্শক প্রশ্ন- নিজের শরীরকে কিভাবে ঠিক রাখছেন? প্রধানমন্ত্রীঃ আমাদের জীবনে রুটিন ঠিক থাকে না। তবে ফিট থাকতে- আমি নামাজ পড়ি নিয়মিত। আর তেমন ব্যয়াম হয় না। আর গণভবনে থাকা বন্দী জীবনের মতন। তারপরও চেষ্টা করি সকালে উঠে একটু হাটতে। ছাদে হাঁটি। আর পরিমিতভাবে খেলে সুস্থ্ থাকা যায়। আর চিন্তা ভাবনাকে সচ্ছ রাখা এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ আমি সুস্থ থাকব এটা ভাবা। দর্শক প্রশ্ন- নানী বা দাদী হিসেবে আপনি কেমন? আপনার নাতী-নাতনীদের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন? প্রধানমন্ত্রীঃ সেটা আমার নাতীদের জিজ্ঞাসা করলে বলবে। আমরা লুডু খেলি, ক্যারাম খেলি, দাবা খেলি। তারা আমার হাতের রান্না পছন্দ করে। আর ছোট একটা আছে সে আবার খুব ডিমান্ড করে। বলে দেয়, তুমিই রান্না করবে। ববির ছোটটা। সে বলে, তুমিই রান্না করবে। সে কোলে চড়ে বসে আবার নির্দেশও দেয়। এটা দাও, ওটা দাও। বৃদ্ধ বয়সে নাতী-নাতনী নিয়ে থাকার থেকে আর কোন সুখের সময় হয়না। প্রধানমন্ত্রীঃ আমি তরুণদের কাছেজানতে চাই, তারা কি চায়। জানলে পরে আমার সুবিধা হবে পরিকল্পনা গ্রহণে। দর্শক প্রশ্নঃ সংসদে র\তরুন নেতৃত্ব বাড়াতে আপনার পরিকল্পনা কি? প্রধানমন্ত্রীঃ আমরা কত বেশি মেয়ে এবং কত বেশি তরুণকে সুযোগ দিতে পারি এই চেষ্টা করি। বিগত বছরগুলোতে আমরা অনেককে সুযোগ দিয়েছি। তাদের মধ্যে অনেকে ভালো করেছে। অনেকের ক্ষেত্রে পরিবর্তন করতে হবে। তবে আমরা বয়োবৃদ্ধ দেখে একেবারে অবহেলা করা উচিত হবে না। দর্শক প্রশ্ন- মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী, নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর কোটা তুলে দেয়া হয়েছে। এটি পুনঃবিবেচনা করবেন কিনা? কোটা বাতিলের জন্য আন্দোলন করা হয়েছে। সে কারণে কোটা তুলে দেয়া হয়েছে। অনেকে বলেছে, এই দাবি মেনে নেয়া মানে হেরে যাওয়া। আমি বলেছি, না হেরে যাওয়া নয়। কেননা বাচ্চারা দাবি করেছে। সেই দাবির প্রেক্ষিতে কোটা বাতিল করা হয়েছে। যারা প্রতিবন্ধী, নৃ-তাত্বিক গোষ্ঠী বা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান আছেন তাদের বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করে নতুন দিক নির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে। দর্শক প্রশ্ন- প্রান্তিক পর্যায়ের উন্নয়নে কি ব্যবস্থা নিচ্ছেন? প্রধানমন্ত্রীঃ আমরা দেশের প্রন্তিক পর্যায়ে উন্নয়ন পৌছে দিতে চাই। আমরা কাজ করছি। গ্রাম আর গ্রাম থাকবে না, শহরে পরিণত হবে। উন্নয়ন পরিকল্পনা নেয়ার সময় শহর কেন্দ্রিক বা রাজধানী কেন্দ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়না। বরং দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের কথাও ভাবা হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্যও কাজ করা হচ্ছে। হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের জন্যও কাজ করে যাচ্ছি। আমরা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলব। বাংলাদেশ নিয়ে যে দীর্ঘ পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে, আমি হয়ত ততদিন বাঁচব না। কিন্তু তোমরা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দর্শক প্রশ্ন- স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাবার পথ কিভাবে বন্ধ হবে, কবে বন্ধ হবে? প্রধানমন্ত্রীঃ কারো ভেতরে যদি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বা দেশের প্রতি ভালবাসা না থাকে, তারা কখনও দেশের উন্নয়ন করবে না, করতে চাইবেও না। পরাজিত শক্তির দোসর যারা তারা ত দেশকে পিছিয়েই রাখতে চায়। এর ফলাফল আমরা দেখেছে ৭৫ সাল থেকে পরবর্তীত বছরগুলোতে। ৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমি দাবি করতে পারি আমরা প্রমাণ করেছি, সরকার জনগণের সেবক। গত ১০ বছর বাংলাদেশের উন্নয়ন ও পরিবর্তনের চিত্র একবার খুঁজে দেখার চেষ্টা করলে তোমরাই দেখতে পাবে কতটা এগিয়েছি আমরা। এর একমাত্র কারণ আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করি। আগে যারা ছিলো, সেখানে ভেজাল ছিলো। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে শক্তি, মুক্তিযোদ্ধা সব মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি অবস্থা। দর্শক প্রশ্ন- কবে দুর্নীতি মুক্ত হবে বাংলাদেশ? প্রধানমন্ত্রীঃ এটা আমার লক্ষ্য আছে। আমি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আভিযান চালিয়েছি। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। এরপর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোসণা করা হবে। আমরা সরকারি কর্মকর্তাদের আয় উপার্জনের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। সেখানে দুর্নীতি করার দরকার কী? অসুস্থ প্রতিযোগীতা থেকে সরে আসতে পারলে দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব। তরুণ উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা দেশকে ভালোবাসতে হবে। মানুষকে ভালোবাসতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে কি পেলাম না পেলাম আমি দেশের জন্য কতটুকু দিতে পারলাম, মানুষের জন্য কতটা দিতে পারলাম তা ভাবতে হবে। পরশ্রী কাতরতা থেকে বের হয়ে এসে নিজেকে নিজের বলতে হবে, আমি পারি। আমি আমার মত করেই ভালো করব। কেউ দ্রুত উপরে উঠে গেলো দেখে আমাকে একটা অসুভ প্রতিযোগীতা করতে হবে সেটা ঠিক নয়। সেই সাথে দেশ প্রেম এবং মানুষের প্রতি ভালবাসা থাকতে হবে। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসি হই তাহলে একটি মানুষও অবহেলিত থাকবে না। প্রত্যেক মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। সরকার হিসেবে আমাদের দায়িত্ব সেই সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। আর তোমাদের দায়িত্ব নিজের মাঝে সেই ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করে দেশের প্রতি দায়িত্ব, নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব এবং প্রতিবেশি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। আর সব সময় একটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে চললে দেশকে কিছু দিতে পারবে, নিজেও জীবনে কিছু করতে পারবে। হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। জীবনে অনেক ঝড় ঝাপ্টা আসবে। কিন্তু ইচ্ছা শক্তি প্রবল থাকলে যে কোন বাধা অতিক্রম করা যায়। একটা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে যদি কেউ এগিয়ে যায়। তাহলে কোন বাধাই বাধা বলে মনে হবে না। দেশকে এতদূর নিয়ে আসতে পেরেছি তার প্রধান কারণ এই ইচ্ছা শক্তি। জাতির জনক বলে গেছেন, মহৎ অর্জনের জন্য মহান ত্যাগের প্রয়োজন। ত্যাগের মধ্যে দিয়েই অর্জন করা যায়। আর সৎ থাকতে হবে। যদি সৎ না থাকতাম, তাহলে ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করতে পারতাম না। পদ্মা সেতুর কাজও শুরু করতে পারতাম না। আমার এই একটি সিদ্ধান্ত বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের আত্মমর্যাদাকে অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আমি তোমাদের কাছে এটাই চাই, যে সেই আত্মমর্যাদা তোমরা ধরে রাখবে। যেখানে আমরা বাংলাদেশকে রেখে যাচ্ছি, তোমরা সেখান থেকে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবে। তোমাদের হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিচ্ছি কারণ তোমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম
গত দশ বছরে নজিরবিহীন উন্নয়ন সাধন করেছে আওয়ামী লীগ সরকার :মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী
মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী :দেশের উন্নয়নের মুল শর্ত হলো সুপরিকল্পিত, টেকসই অবকাঠামো এবং নিরবিচ্ছিন্ন জ্বালানী সরবরাহ সুবিধা। গত দশ বছরে আওয়ামী লীগ বিদ্যুৎ, জ্বালানী, যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যে উন্নয়ন সাধন করেছে তা নজিরবিহীন। আগামী ৫ বছরেও এই অগ্রগতি চলমান রাখার পরিকল্পনা আছে উন্নয়নমুখী দলটির। প্রতিটি মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা, ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন, এলিভেটেড হাইওয়ে, আন্তজেলা এক্সপ্রেসওয়ে, নতুন বিমানবন্দর, নতুন নৌ পথ তৈরি ইত্যাদি পরিকল্পনা আবাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই পূরণ হবে উন্নত দেশের লক্ষ্য। অবকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ প্রকল্প (মেগা প্রজেক্ট) দেশের উন্নয়নে নতুন গতি সঞ্চারের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রয়োজন অপরিহার্য। মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ফলে অবকাঠামো খাতে বাঁধা দূর হবে এবং সার্বিক অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হবে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেগা প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে, পদ্মাসেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গভীর সমুদ্র বন্দর, ঢাকা দ্রুত গণপরিবহনের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ, এলএনজি ফ্লোটিং স্টোরেজ এ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট, মহেষখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম, পায়রা সমুদ্রবন্দর, পদ্মাসেতু রেল সংযোগ এবং চট্রগ্রাম হতে কক্সবাজার পর্যন্ত ১২৯.৫ কিমি রেললাইন স্থাপন। আওয়ামী লীগ এ সকল মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ ও ভূমিকা পালনে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে এবং সেই সাথে মানুষের কর্মসংস্থান, আয় ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে বহুগুণ। লক্ষ্য ও পরিকল্পনা অবকাঠামো রূপান্তরের লক্ষ্যে বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের পরিকল্পনা অব্যাহত রাখা হবে। পদ্মা রেল সেতু সংযোগ এবং কক্সবাজার-দোহাজারী-রামু-গুনদুম রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ ত্বরান্বিত করা হবে। মাতারবাড়ী কয়লা বন্দর, ভোলা গ্যাস পাইপ লাইন ও উপকূলীয় অঞ্চলে একটি পেট্রোকেমিক্যালস কারখানা স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিদ্যুৎ ও জ্বালানী যে কোনো দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রার একটি অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। বঙ্গবন্ধু সংবিধানের ১৪৩ অনুচ্ছেদে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ সমুন্নত রেখে রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশীয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা প্রতিষ্ঠা করেন। পঁচাত্তরের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি ক্ষমতাসীন হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ ও জ্বালানী নিরাপত্তা অবহেলার শিকার হয়। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে পরিস্থিতির উন্নতি হয়। পরবর্তীতে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময় লুটপাটের ফলে আবারও মুখ থুবড়ে পড়ে। দেশ এখন আবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছে। লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ২০২৩ সালের মধ্যে ২৮,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রায় ২৩,০০০ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে সকলের জন্য বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৫ লক্ষ কিলোমিটার বিতরণ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে। মহেশখালী ও মাতারবাড়ী অঞ্চলে ১টি এবং পায়রাতে ১টি করে এনার্জি হাব গড়ে তোলা হবে। ২০২৩ সালের মধ্যে মোট ৫,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমাণ এলএনজি সরবরাহ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের অধিকতর কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে ভারতের শিলিগুড়ি টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশীপ পাইপলাইন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ৩০৫ কিলোমিটার পাইপলাইন, গভীর সমুদ্র থেকে চট্টগ্রামে তেল আনার লক্ষ্যে পাইপ লাইনসহ ইতোপূর্বে গৃহীত অন্যান্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ইস্টার্ণ রিফাইনারীর (ERL) জ্বালানি তেল পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বৃদ্ধি করে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে রিফাইনারী প্রতিষ্ঠায় সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। দেশের কয়লা সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। যোগাযোগ উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে, উন্নত দক্ষ ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। যোগাযোগ খাতে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে যে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে, তা এখন সর্বমহলে স্বীকৃত ও প্রশংসিত। গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকার খাত হিসাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সুগম ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে সড়ক, রেল ও নৌপথের সম্প্রসারণ ও সংস্কার বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে ৪৫ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক দল সড়কপথ, রেলপথ, বিমানপথ ও জলপথ যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসূচি (রূপকল্প ২০২১ ও রূপকল্প ২০৪১) সামনে রেখে তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। ইতোমধ্যে দেশবাসী এর সুফল পেতে শুরু করেছে। সড়কপথ, রেলপথ ও বিমানপথ লক্ষ্য ও পরিকল্পনা মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে ১৬,৩৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯.২৪ কিমি বিস্তৃত ঢাকা পূর্ব-পশ্চিম এলিভেটেড হাইওয়ে নির্মাণ করা হবে। ঢাকাকে ঘিরে একটি এলিভেটেড রিংরোড এবং ইস্টার্ন বাইপাস নির্মাণেরও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে এবং এক্সপ্রেস রেলওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে যাতে চট্টগ্রামে পৌঁছানো যায় সেজন্য বুলেট ট্রেন (দ্রুতগামী ট্রেন) চালু করা হবে। ক্রমে বুলেট ট্রেন সিলেট, রাজশাহী,দিনাজপুর, পটুয়াখালি, খুলনা এবং কলকাতা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। রাজশাহী, সিলেট,চট্টগ্রাম, বরিশাল বিমানবন্দরকে উন্নত করা হবে। ঢাকা শাহজালাল বিমান বন্দরে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ, নতুন রাডার স্থাপন ও জেট ফুয়েল সরবরাহ করার জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করা হবে। কক্সবাজারে প্রতিষ্ঠা করা হবে সুপিরিয়র বিমান অবতরণে সক্ষম দেশের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন বিমানবন্দর। বাগেরহাটে খান জাহান আলী বিমান বন্দর নির্মাণ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত সম্পন্ন করা হবে। ইতোমধ্যে নিরাপদ সড়ক আইন-২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনটি প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্ঘটনা ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনার জন্য সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। আগামীতে সময়ের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে নতুন ধারা পরিবর্তন-পরিবর্ধনের মাধ্যমে এটাকে আরো যুগোপযোগী ও কার্যকর করা হবে। বেসরকারি বিমান পরিবহনকে আরো উৎসাহিত করা হবে। স্বল্প খরচে রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে। রাজধানী ঢাকার জনপরিবহন সমস্যার সমাধান ও যানজটমুক্ত করার লক্ষ্যে পাতাল রেল, মেট্রোরেল অথবা সার্কুলার রেলপথ এবং রাজধানীতে নাব্য ও প্রশস্থ নৌপথ নির্মাণ করা হবে। সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে উন্নত করে আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হবে, যাতে আমাদের সীমান্তবর্তী ভারতের ৭টি প্রদেশ এবং নেপাল ও ভুটান এই বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারে। ট্রান্স এসিয়ান হাইওয়ে এবং ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে, বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল এবং বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক জোটের যোগাযোগ ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত হওয়ার ফলে অঅন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। নৌপথ ও বন্দর লক্ষ্য ও পরিকল্পনা ব্যাপক খননের পরিকল্পনা হিসাবে আগামী মেয়াদে প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হবে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরের সাথে আভ্যন্তরীণ নৌপথগুলোর সংযোগ স্থাপন করার মাধ্যম আমদানি-রপ্তানি সুগম করা হবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাণিজ্যকে সহজতর করার লক্ষ্যে ভারতের সাথে নৌপথ বাণিজ্য আরো বাড়িয়ে একে নেপাল-ভুটান পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে । ২০২৩ সালের মধ্যে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করতে মাতারবাড়ী সমুদ্রবন্দর স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ১৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বে-টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে বন্দরের সক্ষমতা ৪ গুণ বৃদ্ধি পাবে। ঢাকার চারপাশের ৪টি নদী-খালগুলোকে দূষণ ও দখলমুক্ত করে খননের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নদী তীরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির মাধ্যমে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী,সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর