DHAKA, 23 September 2017

ইউনিজয় ফনেটিক
প্রসঙ্গ পাহাড় ধস, প্রয়োজন যথাযথ আইন প্রয়োগের
সাংবাদিক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী

2017-06-17

Share This News -

দু’দিনের টানা বর্ষণে পাহাড় ধসে জেলার বিভিন্ন স্থানে ১৫০ জনের মৃত্যুর সংখ্যা উদ্দেগজনক। পাহাড়ি এলাকায় বসতি স্থাপনের কোন বাজ বিচার নেই। পার্বত্য এলাকায় রাস্তার দু’পাশে যে সবুজ নৈস্বর্গিক দৃশ্য দেখা যেত তা এখন আর নেই। চারদিকে বসতি আর ঝুপড়ি। প্রশাসন এ ব্যাপারে নিরব। প্রভাবশালীদের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত দুই দশকে চট্টগ্রাম শহরের অত্যান্তরেই অন্তত একশ দশটি পাহাড় বিলীন হয়ে গেছে। আশির দশকের শুরুতে শহরে দুইশ ত্রিশটি পাহাড়ের চুড়া চিহ্নিত করা হলেও বর্তমানে সরকারি বেসরকারি মিলে অর্ধশতাধিক পাহাড়ের চুড়া চোখে পড়ে। আকবর শাহ থানাধীন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক লেকসিটি হাউজিংয়ের নামে একটি পাহাড় কাটলেও পরবর্তীতে তার পাশে আরো কয়েকটি পাহাড় রাতের আধারে কেটে ফেলে প্রভাবশালী গুটি কয়েক ব্যক্তি। ছলিমপুর আবাসিক প্রকল্পের নামে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও পাহাড় কর্তন করেছিল। চটেশ্বরী রোড ও নেভাল এভিনিউর শেষ প্রান্তে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পাহাড় কেটেছিলো বেসরকারী আবাসন নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তা বাহিনী। লালখান বাজার, বাঘঘোনা, দক্ষিণ খুলশী, উত্তর পাহাড়তলী, নাছিরাবাদ ভারি শিল্পাঞ্চল, জঙ্গল ছলিমপুর, ফাতেয়াবাদ সহ বিভিন্ন পাহাড়ী এলাকায় নির্বিচারে চলছে পাহাড় কাটা। পাহাড়ের মাটি কেটে তার পাদদেশে তৈরী করা হয়েছে কাঁচা আধপাকা বসতঘর। নি¤œ আয়ের লোকজন সেসব ঘর ভাড়া নিয়ে সেখানে বসবাস করছে। অনেকে আবার খুবই কম মূল্যে দখল স্বত্ব খরীদ করে তাহায় কাঁচা ঘর নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করছে। দখল স্বত্ব বিক্রয় বা ভাড়া দেওয়ার পিছনে এলাকার স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাশীন দলের বিভিন্ন গোত্রের নেতারা জড়িত বলে আমরনা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারি। অথচ পরিবেশ আইন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী শহরে অনুমতি ছাড়া পাহাড় কাটা বে আইনী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও প্রভাবশালীরা তার তোয়াক্ক করছে না। তোয়াক্কা করবেই বা কেন, আজ পর্যন্ত পাহাড় কাটার দায়ে কোন ব্যক্তির কি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কি হয়েছে আমাদের দেশে। নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সিডিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তর কোন কোন ক্ষেত্রে নোটিশ ইস্যু কিংবা জরিমানা করেই দায় সারছে। তবে তারা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রত্যাশিত পদক্ষেপে নেয়া সম্ভব হয় না বলে জানান। বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে গত এক দশকে মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ও ভূমিধসে প্রায় দুইশ জনের প্রাণহানি হয়েছে। কেবল ২০০৭ সালের ২১ জুন নগরীর সেনানিবাস সংলগ্ন কাইচ্ছাগোনাসহ সাতটি এলাকায় এবং প্রচল বর্ষণে পাহাড় ধস ও জলাবদ্ধতায় এবং প্রচল ¯্রােতে একশ সাতাইশ জনের প্রাণহানি হয়। ২০১১ সালের জুনে লালখান বাজার বাটালি হিলের পাশে পাহাড় ধস ঠেকাতে নির্মাণাধীন সুরক্ষা দেয়াল ধসে সতেরো জনকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ২০১২ সালের ২১ জুন নগরীর পৃথক চারটি স্থানে পাহাড় ধসে আঠারো জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালের জানুয়ারী মাসে খুলশী থানাধীন ইস্পাহানী মোড় এলাকায় পাহাড় ধসে এক গৃহবধু নিহত হন। একই বছর ২৯ জুলাই নগরীর লালখান বাজার এলাকার টাঙ্কীর পাহাড় এলাকায় পাহাড় ধসে মা মেয়ের করুন মৃত্যু হয়। ২০১৪ সালে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধসে তিনজন মারা যান। ২০১৫ সালে লালখান বাজার ও বায়োজিদ এলাকায় দেয়াল চাপা এবং পাহাড় ধসে মা মেয়েসহ ছয় জনের করুন মৃত্যু হয়। ২০১৬ সালে নগরীর বয়োজিদ ও পাঁচলাইশ এলাকায় পাড়াড়ধসে একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিলো। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যমে জানা যায় সাবেক মেয়রের এক আত্মীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি রাতের আঁধারে ভারী ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে উত্তর পাহাড়তলীর আকবর শাহ থানাধীন শাপলা আবাসিক এলাকায় পাহাড় কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে। এইভাবে প্রভাবশালীদের অপ্রতিরোধ্য অপতৎপরতায় একের পর এক পাহাড় কাটার মহোৎসব চললে অচিরেই চট্টগ্রামের সকল পাহাড় বিলীন হয়ে হুমকীর মুখে পরবে পরিবেশ। আর নষ্ট হবে নৈসর্গিক শোভামন্ডিত চট্টগ্রাম শহর। অদুর ভবিষ্যৎ আরো কয়েকগুণ বেশি ভয়ঙ্কর রুপে আমাদের সামনে হাজির হতে পারে এই পরিণতি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেউই আইন মানছে না। পাহাড় কেটে সাবাড় করা তো এক ধরনের আত্মহত্যার শামিল। ভৌগলিক অবস্থান অটুট রাখতে হলে পাহাড় সুরক্ষার বিকল্প নেই। বর্তমান প্রচলিত আইন যোগউপযোগী করে প্রয়োজন যথাযথ আইন প্রয়োগের। লেখক : সাংবাদিক মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও মানবাধিকার সংগঠক মোবাইল নং : ০১৮২৪-২৪৫৫০৪

মুক্তমত