প্রকাশ : 2020-05-22

৮৭ শতাংশ বিদেশ ফেরতদের আয়ের উৎস নেই: ব্র্যাক

২২মে,শুক্রবার,নিজস্ব প্রতিবেদক,নিউজ একাত্তর ডট কম: করোনা ভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারির সময়ে দেশে ফেরত আসা অভিবাসী কর্মীদের ৮৭ শতাংশেরই এখন কোনো আয়ের উৎস নেই। নিজের সঞ্চয় দিয়ে তিন মাস বা তার বেশি সময় চলতে পারবেন এমন সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। ৫২ শতাংশ বলছেন, তাদের জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির বিদেশফেরত অভিবাসী কর্মীদের জীবন ও জীবিকার ওপর কভিড-১৯ মহামারির প্রভাব শীর্ষক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাপী করোনা সংক্রমণ শুরুর পর দেশে ফেরত এসেছেন এমন ৫৫৮ জন প্রবাসী কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশই ফিরেছেন মার্চে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৪৫ শতাংশ এসেছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, ওমান এবং কুয়েত থেকে। বাকিরা মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরেছেন। ব্র্যাকের ২০ জন কর্মী ঢাকা, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, নরসিংদী, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, খুলনা এবং যশোরে রয়েছেন এমন প্রবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৪০ শতাংশ বলেছেন, করোনার কারণে তারা দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন। ৩৫ শতাংশ বলছেনে, তারা ছুটিতে এসেছিলেন। ১৮ শতাংশ বলেছেন, তারা পারিবারিক কারণে চলে এসেছেন। ৭ শতাংশ বলেছেন, তাদের ফেরার সাথে করোনার কোন সম্পর্ক নেই। কোয়ারেন্টিনের বিষয়ে জানতে চাইলে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৮৪ শতাংশ বলেছেন, তারা ১৪ দিনের কোয়ারিন্টেনে ছিলেন। ১৪ শতাংশ বলেছেন, তারা কোয়ারিন্টেন ঠিকমতো মানতে পারেননি। দুই শতাংশ বলেছেন, তারা এক সপ্তাহ কোয়ারিন্টেনে ছিলেন। ফেরত আসার পর বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এখন প্রচণ্ড দুশ্চিন্তা, মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও ভীতির মধ্যে রয়েছেন। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির ১২ জন কাউন্সিলর অবশ্য তাদের সবাইকে মনোসামাজিক সেবা দিয়েছেন। ২৯ শতাংশ অভিবাসী বলেছেন তাদের প্রতিবেশী এবং আত্মীয়-স্বজনেরা তাদের ফিরে আসাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি এবং তাদের প্রতি সহযোগিতামূলক মনোভাব প্রদর্শন করেনি। তবে ৯৭ শতাংশ বলেছেন, এক্ষেত্রে পরিবার সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে ৩৪ শতাংশ জানান, তাদের নিজেদের সঞ্চয় বলতে এখন আর কিছু নেই। ১৯ শতাংশ জানান, তাদের যে সঞ্চয় আছে তা দিয়ে আরও এক-দুই মাস চলতে পারবেন। নিজেদের সঞ্চয় দিয়ে তিন মাস বা তার বেশি সময় চলতে পারবেন এমন সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। ১০ শতাংশ জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে তারা ঋণ গ্রহন করেছেন। ১৪ শতাংশ প্রবাসী তাদের সঞ্চয়ের ব্যাপারে কোনো প্রকার তথ্য দিতে রাজি হননি। মোবাইল ফোনে সাক্ষাতকার গ্রহনের মাধ্যমে পরিচালিত এই জরিপে দেখা যায়, ফেরত আসা অভিবাসীদের শতকরা ৮৪ ভাগ এখনো জীবিকা নিয়ে কোনো পরিকল্পনা করতে পারেননি। ৬ শতাংশ জানিয়েছে, তারা পুনরায় বিদেশ যাওয়ার কথা ভাবছেন। বাকীরা কৃষিভিত্তিক ছোটো ব্যবসা, মুদি দোকান বা অন্য কিছু করার পরিকল্পনা করছেন। বিদেশফেরত এই অভিবাসীরা কোন ধরনের সহায়তা পেয়ছেন কী না জানতে চাইলে ৯১ শতাংশ বলেছেন তারা এখনো সরকারি বা বেসরকারি কোন জায়গা থেকে কোন সাহায্য সহযোগিতা পাননি। বাকি ৯ শতাংশ সরকারি বা বেসরকারি কোন না কোন জায়গা থেকে সামান্য হলেও সহযোগিতা পেয়েছেন। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে শুরু থেকে দেশজুড়ে নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে ব্র্যাক। এই কাজের সাথে যুক্ত আছে ব্র্যাকের এক লাখেরও বেশী কর্মী, স্বেচ্ছাসেবক ও স্বাস্থ্যকর্মী। সারা দেশে চার কোটি ৩০ লাখ (৪৩ মিলিয়ন) মানুষের কাছে করোনা ভাইরাস বিষয়ক সচেতনতা বার্তা পৌঁছে দিয়েছে ব্র্যাক। শুধু তাই নয় ব্র্যাক ১৫ লাখ মানুষের মাঝে সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ এবং তিন লাখ পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তাও প্রদান করেছে। এছাড়া বিদেশ প্রত্যাগতদের কোয়রেন্টাইন হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ইতোমধ্যে উত্তরায় বিমানবন্দরের উল্টো দিকে ব্র্যাকের ৪৩০ টি কক্ষ সরকারকে প্রদান করা হয়েছে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নমুনা পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সহায়তা করতে ১০০ টি বুথ স্থাপনের কাজ করছে ব্র্যাক। অভিবাসীদের নানা ধরনের সেবা দিতে ২০০৬ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি। বিদেশ ফেরতদের পুনরেকত্রীকরণের জন্যও ব্র্যাকের একাধিক উদ্যোগ রয়েছে। করোনার সময় ফেরত আসা এক হাজার ২৩৩ জন প্রবাসী এবং ৬৮টি পরিবারকে কাউন্সিলিং সেবা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৭ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসী ও তার পরিবারকে নগদ অর্থ সহায়তা, কমপক্ষে ৫ হাজার অভিবাসীকে অর্থনৈতিকভাবে পুণরেকত্রীকরণের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদানের কার্যক্রমসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছে ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি। ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশফেরত প্রবাসীদের বর্তমান অবস্থা, তাদের সংকট এবং করোনা তাদের জীবন ও জীবিকার ওপর কী কী প্রভাব ফেলেছে সেটা জানতেই এই জরিপ। ফেরত আসা ৮৭ শতাংশেরই এখন কোনো আয়ের উৎস নেই। ৫২ শতাংশ বলছেন, তারা জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা চান। আমরা দেখছি অনেকে ফেরত আসছে। সামনের দিনগুলোতে অনেক মানুষ চাকরি হারিয়ে ফিরে আসতে পারেন। সরকার তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর কাজটি শুধু সরকারের একার নয়। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সবাই মিলে কাজটি করতে হবে। কারণ এই প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতি সবসময় সচল রেখেছেন। এমনকি করোনার সময়ও তারা বিদেশ থেকে টাকা পাঠাচ্ছেন। শরিফুল হাসান জানান, ঈদকে সামনে রেখে শুধু মে মাসের ১৯ দিনে ১০৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় সাড়ে নয় হাজার কোটি টাকা। আর জানুয়ারি থেকে ধরলে মোট তারা পাঠিয়েছেন ৫৫ হাজার কোটি টাকা। কজেই এই সংকটময় সময়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।