প্রকাশ : 2020-07-13

শোকজ, বদলি কি অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করে?

১৩,জুলাই,সোমবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: মহামারি করোনা যখন সমগ্র বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়ে কোটির বেশি মানুষকে আক্রান্ত ও পাঁচ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। তখন বাংলাদেশে কোভিড আক্রান্ত রোগীর শনাক্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮৩ হাজার এর উপরে এবং মৃত্যু হয়েছে ২ হাজারের উপর মানুষের। আমরা দেখতে পাচ্ছি ৫৬ হাজার বর্গমাইল জুড়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে ভাইরাসটি। ব্যবসা বাণিজ্য আজ অচল হয়ে পড়েছে, কর্মহীন মানুষের হাহাকার দিনদিন বেড়েই চলেছে। বন্দীজীবন আর আতঙ্ক স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ধারাকে পরিবর্তন করে অচেনা সময়ের মুখোমুখি করেছে। সেখানে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কোমলমতি শিশু ও আমাদের পরিবারের সিনিয়র সিটিজেন। স্বজনদের হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার আজ শোকের সাগরে ভাসছে। পথে বসতে বসেছে ছোট ও মাঝারি মানের লাখ লাখ প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি দুটি ঘটনা আলোচনার- সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যে আলোচনা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের গণমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত হওয়া বিষয় নিয়ে বলছি, নিশ্চয় পাঠকও বুঝতে পারছেন। হ্যাঁ আমি জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতালের করোনা টেস্টের ফলাফল জালিয়াতির কথা বলছি। জেকেজি ও রিজেন্ট হাসপাতাল সরকারের সাথে চুক্তি করলো বিনামূল্যে সাধারণ মানুষের করোনাভাইরাস সনাক্ত করার জন্য। কিন্তু আমরা দেখলাম তারা প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছে এবং প্রকাশ্যে সরকারের শর্ত ভঙ্গ করেছে। শুধু টাকা নেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না তাদের অপরাধ, তারা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহজনক রোগির কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে না পাঠিয়ে ফেলে দিতো ডাস্টবিনে। পরবর্তীতে দেখা গেলো একটি মনগড়া রিপোর্ট তৈরি করে দেয়া হত রোগিদের কাছে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পূর্বে তারা প্রায় ৫০ হাজার মানুষের টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা। রিজেন্ট হাসপাতেলের ৬ বছর লাইসেন্স নবায়ন না থাকার পরেও তার সাথে চুক্তি করলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়। রিজেন্টে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সদের বারবার অভিযোগ করার পরেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হল না। বরং রিজেন্টের মালিক মোহাম্মাদ সাহেদকে সতর্ক করে দিলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। জেকেজির আরিফুরকে গ্রেফতার করার পরেও সেই সংস্থার চেয়ারম্যান ডা সাবরিনাকে গ্রেফতারে দীর্ঘ সময় নিলো আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। সাধারণ মানুষের মনে আজ হাজার হাজার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে মহামারী মোকাবেলায় ব্যর্থ আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সাহেদকে গ্রেফতারে এত গড়িমসি কেন, কোথায় লুকিয়ে আছে সে? শত শত প্রতারণার সাথে জড়িত ৩২ মামলার আসামি কিভাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটিতে আসে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আয়জনে কারা তাকে দাওয়াত পত্র দিতো? এখানে পরিষ্কার আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা পৃষ্ঠপোষকতা না দিলে এই পর্যন্ত সাহেদদের আসার কথা না। সাহেদ একজন ভয়ঙ্কর প্রতারক জেনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠিতে পুলিশকে জানায় ২০১৬ সালে। কিন্তু তারপরও তাকে কিভাবে অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়, দেয়া হয় ভিআইপি পুলিশ প্রোটোকল? মনে পড়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের সহযোদ্ধাদের যখন একে একে হত্যা করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের যোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করে হুমকি দেয়া হচ্ছে হত্যার, তখন আমাদের অনেক সহযোদ্ধা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রের জন্য আবেদন করেছিল। কিন্তু কোন সাড়া মেলেনি তখন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গোয়েন্দা রিপোর্ট ও গণমাধ্যমের তালিকায় নাম থাকাতে আমার আত্মীয় একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে সাথে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়েছেন কয়েকবার। একদিন আমার আবেদনটি দেখে মহামান্য মন্ত্রী সাহেব যেভাবে হাইকোর্ট দেখালেন তা আজও স্পষ্ট মনে আছে। বাসায় এসে ঠিক করলাম নিজের নিরাপত্তা নিজেকেই ম্যানেজ করে নিতে হবে। আজ বারবার মনে হয়, জাতির পিতার আদর্শ- মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে জামায়াত শিবির- জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছি জীবনবাজি রেখে যে রাষ্ট্রের জন্য, সেই রাষ্ট্র সাহেদদের দখলে। সেই রাষ্ট্রের আইন কানুন, অস্ত্র, পুলিশ প্রোটোকল সব সব কিছু তাদের পকেটে। হাওয়া ভবন থেকে উঠে আসা মিঠু- শাহেদ-খালেদদের শত শত কোটি টাকার কাজ দেয়া হয় কমিশনের বিনিময়ে ত্যাগি নেতা কর্মীদের উপেক্ষা করে। তাদের অন্দর মহলে ভোগ উপভোগ- সম্ভোগে উন্মাদ থাকেন ক্ষমতার চেয়ারে বসা আদর্শহীন দানবেরা। আজ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কাজের সমালোচনা করলে আমাদের বলা হয় বিপ্লবী। আমরা কথা বললে নাকি উন্নয়নের ধারা বাধাগ্রস্থ হয়। অথচ মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু’র কথা বলে স্বাধীনতা বিরোধীদের পুনর্বাসন প্রকল্প চলমান নানান ধারায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে শোকজ করা হয়েছে। রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন চিঠির বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতর কর্মকর্তা বলতে কী বোঝানো হয়েছে এবং রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে কী কী বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে তা জানাতে বলা হয়েছে। কাল হয়তো দেখতে পাবো বদলি করা হয়েছে। কিন্তু জেকেজি বা রিজেন্টের প্রতারণায় সহযোগিতা করার ফলে যে কত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হল, আক্রান্ত হল কিংবা মৃত্যুর মুখোমুখি হল তার কি হবে। এই ভুয়া রিপোর্টের ফলে দেশে কত লাখ মানুষ আক্তান্ত হবে তার হিসেব কে করবে। আজ আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হল তার নিরূপণ করার কোন যন্ত্র কি আছে সরকারের কাছে। লাখ লাখ প্রবাসিদের ভবিষ্যৎ যারা শঙ্কার মধ্যে ফেললো, পুরো বাংলাদেশকে যারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তারা শুধু দুর্নীতির জন্য এমন করেছে এমনটি ভাবতে চাই না। তারা সরকারকে দেশ ও বিদেশে বেকাদায় ফেলতে চায় তা আজ স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্ঘুম প্রচেষ্টাকে যারা পরিকল্পিত প্রশ্নবিদ্ধ করলো তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। মহামারীকালে যারা এই দুর্নীতি ও অপরাধের সহযোগিতা করেছে তাদের চিহ্নিত করে মুখোশ উন্মোচন করা হোক। আজ সকল অপকর্ম, দুর্নীতি, অনিয়মের দায় শুধু রাজনীতিবিদদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে ক্ষমতাবান আমলারা পার পেয়ে যাচ্ছে। আর তাদের অপরাধ শোকজ আর বদলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বহাল তনিয়তে থেকে পুনরায় নতুন কৌশলে দেশটাকে লুটের জন্য তৈরি হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আজ স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের প্রতি দেশের মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার চিত্র দেশ বিদেশে আলোচিত হচ্ছে। মহামারী করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় এই নেতৃত্ব আজ সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। এখোনো সময় ফুরিয়ে যায়নি আপনার পরিক্ষিত সন্তানদের অর্থাৎ ছত্রলীগ করে আসা দেশ প্রেমিক ব্যক্তিদের দায়িত্বে নিয়ে আসুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনার ও দেশের কথা চিন্তা করে তারা আর যাই করুক, এদের মত পুকুর চুরি করবে না। লেখক: সম্পাদক, ডেইলি জাগরণ ডট কম, সাধারণ সম্পাদক, গৌরব ৭১।- বিডি-প্রতিদিন

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর