প্রকাশ : 2018-05-04

প্রাধান্য পাচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট-কাল ওআইসি সম্মেলন শুরু

ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ৪৫তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন (সিএফএম) আগামীকাল শনিবার শুরু হচ্ছে ঢাকায়। আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ৬ মে পর্যন্ত চলবে এ সম্মেলন।স্থায়ী শান্তি, সংহতি ও উন্নয়নের জন্য ইসলামি মূল্যবোধ- এ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের সম্মেলন। এর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী জানিয়েছেন, ৫৭ সদস্য বিশিষ্ট এই সংস্থার প্রায় ৪০ জন মন্ত্রী ও সহকারী মন্ত্রীসহ প্রায় সাড়ে ৫০০-এর বেশি প্রতিনিধি এ সম্মেলনে অংশ নেবেন। এবারের সম্মেলনের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে রোহিঙ্গা সংকট, পাশাপাশি ফিলিস্তিন ইস্যু আলোচনায় থাকবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, রোহিঙ্গা ইস্যু স্বাভাবিক কারণেই বিশেষ গুরুত্ব পাবে। সম্মেলনে একটি বিশেষ অধিবেশনে রাখা হয়েছে এ ইস্যুটি আলোচনার জন্য। সেখানে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত ও নিশ্চিতভাবে সম্পন্ন করতে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আলোচনা করবেন। এছাড়াও আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলন শুরুর আগে আজ শুক্রবার আগত প্রতিনিধিদের মধ্যে আগ্রহীদের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে বলেও জানান মন্ত্রী। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের পক্ষে যে জনমত গড়ে উঠছে এ সম্মেলন সে জনমতকে আরও শক্ত ভিত্তি দেবে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ইতোমধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায় করতে পেরেছে এবং মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির পথে অনেকদূর এগিয়ে গেছে। মিয়ানমার যদিও নানা কৌশলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে দীর্ঘসূত্রতায় বেঁধে রাখতে চাইছে, এরপরও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি দেশের নীতিনির্ধারকরা নড়াচড়া শুরু করেছেন। এরইমধ্যে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি জাতিসংঘের মানবাধিকার ও উন্নয়নমূলক সংস্থাগুলোকে রাখাইনে প্রবেশ করতে দিতে সম্মত হয়েছেন। এতদিন আন্তর্জাতিক বিশ্বের নানা পর্যায়ের চাপেও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং বিদেশি গণমাধ্যমকে সে দেশে ঢুকতে অনুমোদন দেওয়া হয়নি। কিন্তু অব্যাহত আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সু চি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর সঙ্গে এই মুহূর্তে চুক্তিতে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বে মুসলিম দেশগুলোর সবচেয়ে বড় ও নীতিনির্ধারণী ফোরাম ওআইসি। এর যে কোনো সিদ্ধান্ত ও কনভেনশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব রাখতে সক্ষম। ফলে সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধানের পক্ষে বিশ্বপ্রতিনিধিরা খোলামেলা আলোচনা করার সুযোগ পাবেন এবং সরেজমিন রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখে যেতে পারবেন। এর মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গাদের মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগের শক্তসামর্থ্য উপায় বের করা যাবে বলে মনে করছেন অনেকে। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর দ্বিতীয় বারের মতো বাংলাদেশ ওআইসির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কোনো সম্মেলনের আয়োজন করতে চলেছে। এর আগে ১৯৮৩ সালে ঢাকায় প্রথমবারের মতো ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এদিকে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সম্মেলনে রোহিঙ্গা ইস্যু ছাড়াও মুসলিম বিশ্বের চ্যালেঞ্জ, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধ, ফিলিস্তিন সমস্যাসহ বিভিন্ন বিষয় প্রাধান্য পাবে। মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের বেশ কিছু দেশ শান্তি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় হুমকি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ, মুসলিম রাষ্ট্রে বাইরের হস্তক্ষেপ, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, ইসলামোফবিয়া ও মানবিক বিপর্যয়সহ নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে এবং একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় সংস্থাটির সম্মিলিত উদ্যোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বাৎসরিক সম্মেলন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানান, আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আগামী এক বছর সিএফএম-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবে। সম্মেলনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মুসলিম দেশগুলোকে সক্রিয়ভাবে পাশে থাকার আহবান জানানো ছাড়াও বাংলাদেশের প্রস্তাবনাগুলো তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, আশা করছি সম্মেলনে আলোচ্য বিষয়ের সব সিদ্ধান্ত, ঢাকা ঘোষণাপত্র আউটকাম ডকুমেন্ট হিসেবে সংরক্ষিত হবে। মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে কানেক্টিভিটি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে মিডিয়ার ব্যবহার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওআইসি চেয়ার প্রতিষ্ঠাসহ কয়েকটি প্রস্তাব করবে বাংলাদেশ। প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এবং পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, জনসংখ্যার ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির দ্বিতীয় শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ওআইসির সদস্য হয়। এই সংস্থাভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ৪৪তম সম্মেলনটি আইভরি কোস্টে অনুষ্ঠিত হয়। গত বছর মে মাসে আইভরি কোস্টের আবিদজানে ওই সম্মেলনে ওআইসিভুক্ত সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সর্বসম্মতিক্রমে বাংলাদেশে ৪৫তম সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।