প্রকাশ : 2018-05-07

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নির্দ্রিষ্টকরণ তবেই শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়ন

শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদ- তেমনি শিক্ষক হলেন শিক্ষার মেরুদ-। শিক্ষকদের মাধ্যমেই শিক্ষার বাস্তব রূপ ফুটে উঠে। শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের মূল কারণ শিক্ষক। প্রত্যেক শিক্ষার্থী শিক্ষকের দ্বারা প্রভাবিত হয়। শিক্ষার্থীদের অনুসরণ ও অনুপ্রেরণার জীবন্ত উৎস হলেন শিক্ষক। শিক্ষকের জ্ঞান-প্রতিভা, আচার-ব্যবহার, অঙ্গ-ভঙ্গী শিক্ষার্থীর অবচেতন মনে দাগ কেটে যায়। শিক্ষার্থীরা সবকিছু সরলভাবে গ্রহণ করতে চায়, সেই অর্ধগঠিত ও অস্থির চিত্তকে সঠিক পথে চালিত করার গুরুদায়িত্ব শিক্ষকের উপরই ন্যস্ত। একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিতে তিনিই হতাশায় বাতি জ্বালিয়ে ইচ্ছাশক্তি ও আত্মবিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলতে পারেন। তাই একজন আদর্শবান ও জ্ঞানী শিক্ষক যেমন জাতি গড়ার কারিগর, তেমনি আদর্শহীন শিক্ষক দেশকে রসাতলে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। বস্তুত শিক্ষকের জ্ঞান, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিকতার উপরই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা দেশের উন্নতি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি নির্ভরশলি। বিশিষ্ট বিশ্লেষকগণ ইংরেজি TEACHER শব্দকে এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন- T- Talent, Truthful, Trained E- Education, Energetic, Effective A- Ameable, Active, Adoptibility, Artist C- Creative, Character, Concious, Courtisy H- Honest, Helpful, Humble, Healthy E- Efficient, Equity, Emotional R- responsible, Religious, Reader, Regularity, Resercher. একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রথম ও অপরিহার্য বৈশিষ্ট হল তিনি যে বিষয়ে শিখাবেন সে সর্ম্পকে গভীর জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী হবেন। সংশ্লিষ্ট বিষয় সর্ম্পকে তিনি শুধু জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না বরং তিনি সে বিষয়ের উপর বিশেষজ্ঞ হবেন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সর্বশেষ (Up to date) সব আবিস্কার সর্ম্পকে তিনি ওয়াকিবহাল থাকবেন। জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাদান অবিচ্ছেদ্য। প্রকৌশলী যেমন মজবুত ও মানসম্পন্ন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য দেশের কাছে দায়বদ্ধ, তেমিন শিক্ষকও জাতির ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা দিয়ে উন্নত জাতি গঠনে দায়বদ্ধ। একজন আদর্শ শিক্ষক হবেন বইমুখী, অধ্যয়নপ্রিয় ও অনুসন্ধিৎসু। তাঁকে হতে হবে আনন্দের মাধ্যমে শিখানোর বিষয়ে প্রাজ্ঞ ও যত শীল। তিনি পড়ানোর মাধ্যমটিকে আনন্দময় করে তুলবেন। কেবল চাকরির খাতিরে দায়িত্ব পালন না করে তিনি তাঁর কাজে আন্তরিকতা ও নিপুণতা প্রদর্শন করবেন। ইদানিং মানসম্মত শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে বেশ জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে, যা এখন সময়ের দাবি। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭নং ধারায় রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষালাভকে জনগণের একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, সরকারিভাবে মুখে যতটা শিক্ষার মনোন্নয়নের কথা বলেছে, কাজের কাজ কিন্তু কিছুই হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের বিকল্প নেই। শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতা পুননির্ধারণ প্রয়োজেন। প্রশিক্ষণ সাফল্য অর্জনের মূল হাতিয়ার। পেশাজীবনে প্রবেশের পূর্বে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, শিক্ষাজীবন শেষ করার পর পেশাজীবনে প্রবেশের আগেই শুধু প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক এ সময়ে চাকরিরত অবস্থায়ও পেশাজীবনে উন্নতির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক নিয়োগনীতিমালায় ৪ (চার) বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন প্রাইমারি অ্যাডুকেশন ডিগ্রি বাধ্যতামূলক করা আছে। তারা প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা অনুপাতে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশে ৮৭ হাজার ৬৪২ টি সরকারি/বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন এবং ১৮ হাজার ৪১২ টি মাদ্রাসার জন্য ২৯ টি প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রতিষ্ঠা করে। সেখানে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কোর্সের মেয়াদ মাত্র ১৮ মাস। শিক্ষাক্রম পরিচালনা করে ময়মনসিংহস্থ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী (ন্যাপ)। ১৮ মাসের প্রশিক্ষণ আমাদের দেশের অন্যান্য পেশাগত শিক্ষাক্রমের সাথেও বেমানান না হাতুড়ে না ডিপ্লোমা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সার্টিফিকেটের কোন মূল্য নেই। পৃথিবীর কোন দেশেই ন্যাপ পরিচালিত সনদ প্রদর্শন করে চাকরি কিংবা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা যায় না। ২৯ টি পিটিআই দ্বারা জাতির আশা আকাক্সক্ষা পূরণ হচ্ছে না। অবৈজ্ঞানিক ও অগ্রহণযোগ্যভাবে Diploma in Primary Education কোর্সের মেয়াদ দেড় বছর। ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষে প্রথম সাতটি বিভাগীয় প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে Pilot Project হিসেবে এই Course চালু হয়। বর্তমান আরও ২২টি পিটিআই-তে এই কোর্স চালু হয়েছে। প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষক নিয়োগে শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা নয়, নৈতিক, মানবিক এবং সাংস্কৃতিক গুণাবলিসম্পন্ন এবং ডিপ্লোমাপ্রাপ্ত মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। এখানে লক্ষণীয় যে, শিক্ষকের কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণের আগে ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্যও প্রশিক্ষণ খুব জরুরি। কেননা একজন শিক্ষক যতই শিক্ষিত হোক না কেন তার নীতি-নৈতিকতা-আদর্শ এবং আচরণ সঠিক না হলে তিনি শিক্ষার্থীকে সঠিক জ্ঞান দিতে বা মহৎ করে তুলতে পারবেন না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীকে যতটা প্রভাবিত করতে পারেন, অন্য কেউ এমনকি শিক্ষার্থীর পরিবারের আপনজনও তা পারেন না। তাই ১৮ মাসের শিক্ষক প্রশিক্ষণে প্রাইমারি শিক্ষকদের প্রকৃত শিক্ষক হতে বাধাগ্রস্থ করছে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বাতিল করে নিয়মিত শিক্ষা হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। দেড় বছর মেয়াদি অগ্রহণযোগ্য কোর্স বাতিল করে আন্তর্জাতিকমানের ৪ (চার) বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন কোর্স চালু করতে হবে। পিটিআই নাম পরিবর্তন করে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স (IPT) করতে হবে। প্রাইমারি স্কুলগ্রামী ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা, স্কুলের সংখ্যা এবং শিক্ষকদের পদ বিবেচনা করে আনুপাতিক হারে ইনস্টিটিউট অব প্রাইমারি টিচার্স সংখ্যানুপাতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। উপজেলাভিত্তিক সরকারি বেসরকারিভাবে একাধিক ইপিটি প্রতিষ্ঠার প্রদক্ষেপ নিতে হবে। আপদকালীন প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের পদ পূরণে মর্ণিং, ডে, ইভিনিং, নাইট চার শিফট শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে ব্যর্থ ময়মনসিংহস্থ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমী কর্র্তৃক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা ইন অ্যাডুকেশন কোর্স পরিচালনার জন্য পৃথকভাবে ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রতিষ্ঠাই হতে পারে এর বুদ্ধিদীপ্ত ন্যায়সংগত সহজ সমাধান। লেখক: খন রঞ্জন রায় [email protected]