প্রকাশ : 2018-05-23

প্রিয়াঙ্কা বললেন চরম ভয়ংকর রোহিঙ্গাদের বর্ণনা শুনে

সকাল সাড়ে ৯টার দিকে গাড়িবহর থেকে যখন ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া নেমে আসেন, রোদের তীব্রতা তখন বাড়ছে। রোদে দাঁড়িয়েই তিনি শুনতে থাকেন, অনিশ্চিত যাত্রাকে সঙ্গে করে রোহিঙ্গারা কীভাবে সীমান্ত পেরিয়েছে। কয়েক দিনের ওই বিপৎসংকুল যাত্রার কথা শুনে একপর্যায়ে রোদচশমা খুলে চোখের পানি মোছেন বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তিনি বিড়বিড় করে ‘চরম ভয়ংকর’ শব্দ দুটি উচ্চারণ করে হাঁটতে শুরু করেন। মঙ্গলবার সকালে এই বলিউড তারকা গিয়েছিলেন টেকনাফের হাড়িয়াখালীর ভাঙ্গার এলাকায়। প্রায় নয় মাস আগে রোহিঙ্গা-ঢলের অন্যতম প্রবেশপথ ছিল এই এলাকা। নাফ নদী আর বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়কের এই অংশ দিয়ে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গার বেশির ভাগই এসেছিল। এদের বড় অংশ ছিল নারী ও শিশু। সীমান্তের ওপাড়ে চোখ রাখলেই দেখা যায় মিয়ানমার। প্রিয়াঙ্কা রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে শুনতে থাকেন, তারা প্রথমে এক বা কখনো একাধিক পাহাড় ডিঙিয়ে, নদী আর সাগর পেরিয়ে সবশেষে দীর্ঘ পথ হেঁটে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসে। কক্সবাজার সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল দিনের শুরুতে তিনি এখানে আসার পর রোদ থেকে বাঁচতে একটি গাছের নিচে দাঁড়ান। তাঁর সামনে দাঁড়ানো ইমাম হোসেনকে নাফ নদীর দিকে দেখিয়ে প্রিয়াঙ্কা প্রশ্ন করেন, তোমরা কি ওই পথ দিয়ে এসেছ? জামা কোথায়? ইমাম জানায়, প্রচণ্ড গরম, তাই সে জামা গায়ে দেয়নি। এরপর আরও কয়েকজন শিশুকে কাছে ডাকেন প্রিয়াঙ্কা। এদের অনেকের গায়ে জামা ছিল না। পরে তাদের নিয়ে তিনি ছবি তোলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে ঘিরে ভিড় বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে নিরাপত্তাও জোরদার হয়। নিরাপত্তার বাড়াবাড়িতে বিরক্তও হন প্রিয়াঙ্কা। নিরাপত্তা কমানোর জন্য তিনি পুলিশকে অনুরোধ করেন। প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘প্লিজ, আমার জন্য এত নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই। সামনে-পেছনে এত গাড়ি থাকতে হবে না। একটা গাড়ি থাকলেই চলবে।’ তারপরও কড়া নিরাপত্তা ছিল তাঁকে ঘিরে। টেকনাফ-শাহপরীর দ্বীপ সড়ক থেকে প্রিয়াঙ্কা টেকনাফের নেটং (উঠনি) পাহাড়ের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে গেলে তাঁকে জানানো হয়, নাফ নদী দিয়ে মিয়ানমার থেকে কীভাবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে। এখান থেকে পূর্ব দিকে মিয়ানমার ও পশ্চিমে টেকনাফ এবং জলিলের দিয়া। নাফ ট্যুরিজম পার্ক করা হচ্ছে জলিলের দিয়ায়। এখানে ১৫ মিনিট অবস্থান করে ছবি তোলেন প্রিয়াঙ্কা। এরপর প্রিয়াঙ্কা লেদা বিজিবি চৌকির কাছে ইউনিসেফ পরিচালিত রোহিঙ্গা শিশুদের খেলাধুলার জন্য তৈরি স্থান পরিদর্শন করেন। পরে প্রিয়াঙ্কা আসেন উখিয়ার বালুখালীতে অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরে। এখানে ইউনিসেফ পরিচালিত শিশুবান্ধব কেন্দ্রে এসে ঘণ্টাখানেক কাটান। তিনি শিশুদের সঙ্গে লুডু খেলেন। তাদের আঁকা ছবি নিয়ে গল্প করেন। তিনি খেলনা চায়ের কাপ নিয়েও শিশুদের সঙ্গে আনন্দে মেতে ওঠেন। পরে প্রায় মিনিট ১৫ হেঁটে লোকজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে শিবির ছেড়ে যান। শিবির ছাড়ার আগে তিনি শিশুদের হিন্দিতে স্কুলে যাবে কি না জানতে চান। এরপর তিনি তাদের স্কুলে যেতে বলেন, নিজের দিকে খেয়াল রাখার কথাও বলেন। সবার শেষে ‘খোদা হাফেজ’, ‘আবার দেখা হবে’ বলে বিদায় নেন। ইউনিসেফের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গা শিশুদের দুর্দশা নিজের চোখে দেখতে এবং তাদের সহায়তায় বিশ্ব জনমত জোরদার করতে বাংলাদেশে এসেছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। প্রায় এক দশক ধরে ইউনিসেফের সঙ্গে যুক্ত প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ২০১৬ সালে শিশু অধিকারবিষয়ক বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত মনোনীত হন। সিরিয়ার শরণার্থী শিশুদের দেখতে গত বছর জর্ডানে যান প্রিয়াঙ্কা। গতকাল সারা দিন ঘোরাঘুরির পর রোহিঙ্গাদের নিয়ে ইনস্টাগ্রামে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। তিনি লিখেছেন, নদীর ওপারে মিয়ানমার। এখন সেটা শূন্য। কয়েক মাস আগেও সাবরাং নামে পরিচিত এলাকাটিতে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা ছিল। মিয়ানমার ছেড়ে রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসেছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশ যাত্রা প্রসঙ্গে প্রিয়াঙ্কা লিখেছেন, তাদের সেই যাত্রা অনেক প্রতিকূলতা আর চরম বিপজ্জনক। অনেকে কয়েক দিন হেঁটে পাহাড় পেরিয়েছে। এরপর নাফ নদী কিংবা বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়েছে ভেলায় চড়ে। তাদের অনেকেই আহত, অন্তঃসত্ত্বা আর বয়োজ্যেষ্ঠও ছিল। এখানেই তাদের যন্ত্রণার শেষ নয়। শিশুদের ওপর ভয়াবহতার প্রভাব সম্পর্কে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া বলছেন, ওই যন্ত্রণা জীবনের বাকিটা অংশ রোহিঙ্গা শিশুদের শারীরিক আর মানসিকভাবে আতঙ্কের মাঝে রাখবে। আপনার সহায়তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। কেননা এ মুহূর্তে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

জাতীয় পাতার আরো খবর