প্রকাশ : 2018-05-28

নারীর মাতৃত্ব হোক নিরাপদ

২৮মে (সোমবার) বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। নারীর সুস্থ স্বাভাবিক মাতৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৮৭ সালের ২৮মে থেকে এই দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৭ সালের ২৮মে শ্রীলংকার এক সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এই দিবসটিকে বাংলাদেশেও পালনের ঘোষণা দেন। তখন থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও এই দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে। নারী পূর্ণতা পায় মাতৃত্বে। প্রতিটি মায়ের জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব লাভ হচ্ছে তাদের অধিকার। এটা গর্ভবতী নারীর সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার। একজন মায়ের গর্ভকালীন সুস্থ্যতাই পারে একটি সুস্থ শিশু জন্ম দিতে। কিন্তু নারী মাতৃত্ব গ্রহণের ক্ষমতা রাখলেও নিরাপদ মাতৃত্বের দায়ভার নারীর একার নয়। মূলত নিরাপদ মাতৃত্ব, প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়গুলোর আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দুতে নারী থাকলেও এর পরিধি জুড়ে থাকে পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ধর্ম তথা একটি রাষ্ট্র। সন্তান ধারণ বিষয়টিকে নারীর ধর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হলেও দেখা যায় দরিদ্র পরিবারে গর্ভবতীর প্রতি বিশেষ যতœ ও নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নেওয়া হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে দেখা যায় কবিরাজ, পানিপড়াসহ বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার রীতি-নীতির মধ্যেই গর্ভবতীর চিকিৎসা দেওয়া হয়ে থাকে। এভাবে পারিবারিক অসচেতনতা, ভুল চিকিৎসা, দারিদ্র, অশিক্ষা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পরিবারের পুরুষের অবহেলা ইত্যাদি কারণে নারীরা যথাযথ মাতৃসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ পরিমিত যতেœর সুযোগ পেলে এবং চিকিৎসা পেলে সুস্থ শিশু জন্ম দেওয়া সম্ভব এবং মাতৃস্বাস্থ্যে ঝুঁকির হার কমে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা রোগ ও দাওয়া দুটিই পাঠিয়েছেন এবং প্রতিটি রোগেরই ওষুধ পাঠিয়েছেন, সুতরাং তোমরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করো।’ (মিশকাত ও আবু দাউদ) গর্ভবতী মায়ের পর্যাপ্ত খাবার একটা সাধারণ ব্যাপার। বিশেষ করে গর্ভধারনের শেষের তিন-চার মাস থেকে বাড়তি খাবারের প্রয়োজন খুবই বেশি। তাই সুস্থ সবল শিশু পেতে হলে গর্ভবস্থায় মাকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে। খাদ্যের বেলায় আর্থিক সংগতি যতটা দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী কুসংস্কার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “সন্তানের বাবার দায়িত্ব হলো মায়ের খাওয়া-পরার উত্তম ব্যবস্থা করা।”(সূরা আল-বাকারা, আয়াত-২৩৩) নারী মাতৃত্ব গ্রহণের পর দেখা যায় বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকি। বিশেষত ১৮ বছরের নিচে বিবাহিত মেয়েদের। যার ফলে নারী ও শিশু মৃত্যু হার বেড়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে বলে বাংলাদেশ সরকার বাহবা কুড়িয়েছে। অন্যদিকে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর মধ্যে ১৮ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে বিধান রেখে নিরাপদ মাতৃত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলায় সমালোচিত হচ্ছে। মেয়ে শিশু অল্প বয়সে বিয়ে ও দ্রুত সন্তান হওয়ার কারণে তার শারীরিক সুস্থতা নানা হুমকির মধ্যে পড়ছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ এর ১৯ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘বিশেষ প্রেক্ষাপটে আদালতের নির্দেশ ও মা-বাবার সম্মতিতে অনুষ্ঠিত বিয়ে বিধির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারন এবং বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে আদালত ও পরিবারের অনুমতি সাপেক্ষে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।’ তাবে ১৮ বছরের নিচে কত বছরে বিয়ে হতে পারবে তা এই খসড়া আইনে নির্দিষ্ট করে বলা নেই। যার ফলে দেখা যাচ্ছে নারী নির্যাতন, মাতৃমৃত্যুর হারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস শুধু দিবস হিসেবে পালন নয় একে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে দেখে নারীর সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ মাতৃত্ব, নারীর অধিকার হিসেবে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি, সেই সাথে কুসংস্কার, বাল্যবিবাহ, অনিরাপদ মাতৃত্বের ত্রুটিসমূহ দূর করে নারীর নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা সকলের কর্তব্য।

বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর