প্রকাশ : 2018-06-03

মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ দেশে দেশে

কলম্বিয়াঃ কোকেন উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ কলম্বিয়া। ১৯৯০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দেশটিতে মাদক সংশ্লিষ্ট হত্যাকান্ডের সংখ্যা সাড়ে চার লাখ ছাড়িয়েছে। শুধু নিহতের সংখ্যা দিয়ে দেশটির মাদকযুদ্ধের ব্যাপ্তি অনুধাবন করা যায় না। ১৯৮০-র দশক থেকে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তচ্যুত হয়েছে আড়াই থেকে চার মিলিয়ন মানুষ। নিরাপত্তার জন্য এসব মানুষ নিজেদের বাড়িঘর রেখে ছুটেছেন অন্যত্র। একই সময়ে কয়েক হাজার হেক্টর বন কেটে ফেলা হয়েছে। এসব বনে কোকা উৎপাদন ও কোকেন তৈরির কারখানা ছিল। প্রতি হেক্টর কোকা ক্ষেতের জন্য তিন হেক্টর বন ধ্বংস করা হয়েছে। দেশটির মাদক সম্রাটদের হাতে ৫ মিলিয়ন হেক্টর ভূমি রয়েছে। যার কারণে কোকেন উৎপাদন কোনোভাবেই কমানো সম্ভব হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র : ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এক ভাষণের মধ্য দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। দুই বছরের মাথায় নিক্সন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নতুন লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেন। রিগ্যানের ঘোষণার পরই মাদকবিরোধী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র অর্থ ও লোকবল নিয়োগ বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবছর ৫১ বিলিয়ন ডলার। ১৯৮০ থেকে সালে গ্রেফতারকৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ লাখের বেশি। ১৯৮৪ সালে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে শুধু না বলুন প্রচারণায় রূপ দেন নিক্সনের স্ত্রী ন্যান্সি। মাদকের সরবরাহ বন্ধ করতে মেক্সিকো, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অভিযান চালায় ও সহযোগিতা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ২০০৯ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শব্দবন্ধ ব্যবহার না করার ইঙ্গিত দেয়। সর্বশেষ গত বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন পুনরায় মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন। মেক্সিকো : ১৯৬০ সালে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করা মাদক মেক্সিকোতে। ২০০৬ সালে দেশটিতে মাদকবিরোধী যুদ্ধে নামানো হয় সেনাবাহিনীকে। মাদকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত মেক্সিকো। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফেলিপ চালডেরন ২০০৬ সালের শেষ দিকে সাড়ে ছয় হাজার সেনা সদস্যকে মিচোয়াচান রাজ্যে মোতায়েন করেন। সরকারি তথ্য অনুসারে, ওই বছর ১১ হাজার ৮০৬টি হত্যাকান্ড ঘটে, ২০১৬ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৩৪০টি। অপরাধীচক্র, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে গুমের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার। মেক্সিকোর জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতে, গুম হওয়া ব্যক্তিদের জীবিত বা মৃত খুঁজে পাওয়ার ছিল তখন মাত্র ২৫ শতাংশ। ব্রাজিল : মাদকের করালগ্রাস থেকে রেহাই পায়নি ব্রাজিলও। ব্রাজিলে ১৯৭০-এর দশকে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। ২০১৪ সালে দেশটিতে প্রায় ৬০ হাজার হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে কতটি হত্যাকা- মাদকসংশ্লিষ্ট তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে রিও ডি জেনিরো শহরের ৪৮০টি হত্যাকান্ডের মধ্যে ৪০০টিই ছিল মাদক সংশ্লিষ্ট।মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, ব্রাজিলে মাদকবিরোধী যুদ্ধের পুলিশের অভিযান মানেই মৃত্যু। সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালেই ব্রাজিল পুলিশ ৩ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। যদিও পুলিশ বরাবরই দাবি করে এসব হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের জের ধরে। ফিলিপাইন : নিহতের গলায় কার্ডবোর্ডে লেখা থাকে, আমি একজন মাতাল। আমাকে পছন্দ করবেন না। সন্দেহভাজন মাদকসেবী ও বিক্রেতার লাশ অন্ধকারে, ব্রিজের নিচে ও ময়লার স্তুপে পড়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুয়াতে প্রায় দুই বছর আগে ফিলিপাইনের ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। তার এই যুদ্ধ ছিল অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে। এই যুদ্ধের নিহতের সঠিক সংখ্যা এমনকি পুলিশও জানে না। অনেক সময় লাশের সংখ্যা বাড়ছে কালুকান, মালাবন, নাভোটাস ও ভালেনজুয়েলা জেলায়। রাজধানী ম্যানিলা থেকে দূরে ঘনবসতিপূর্ণ এসব জেলা আবাসিক ও শিল্প এলাকা হলেও হত্যাক্ষেত্র হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। ফিলিপাইনে মাদকবিরোধী যুদ্ধে এ পর্যন্ত কতজন নিহত হয়েছেন তা নিয়ে গ্রহণযোগ্য কোনও তথ্য নেই। মানবাধিকার সংগঠন ও নিহতের পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। মানবাধিকার গোষ্ঠী, সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের নিহতের সংখ্যা নিয়ে পৃথক পরিসংখ্যান রয়েছে। সরকার নিজেই জানিয়েছে, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে মাদক সংশ্লিষ্ট হত্যাকান্ডের সংখ্যা ছিল ২০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৩৫৫টি হত্যাকান্ডের তদন্ত চলছে এবং ৩ হাজার ৯৬৭টি হত্যাকান্ড ঘটেছে পুলিশি অভিযানে। বাংলাদেশ : চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে স্লোগানকে সামনে রেখে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। এ বছরের ১৪ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখানোর জন্য র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি নির্দেশ দেন। বাংলাদেশে এ ঘোষণার পর র‌্যাব ও পুলিশের অভিযানের সময় বন্দুকযুদ্ধে অনেক ব্যক্তি নিহত হয়েছে। আইন শৃখলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি এরা সবাই মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত এবং পুলিশ বা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার কারণে পাল্টা হামলায় নিহত হয়েছে। থাইল্যান্ড : তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা মাদক বা ইয়াবা বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। তার ঘোষণা অনুযায়ী ২০০৩ সালে ইয়াবা পাচার ও ব্যবহার বন্ধের উদ্দেশে যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম তিন মাসেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নিহত হয় ২ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ। ইয়াবাকে থাইল্যান্ডে বলা হয় ক্রেজি ড্রাগস। ৩ লাখ ২০ হাজার মাদকসেবী চিকিৎসার জন্য আত্মসমর্পণ করেন। সরকারি কর্মকর্তাদের করা কালো তালিকা অনুযায়ী গ্রেফতার ও হত্যাকান্ড চালানো হতো। আফগানিস্তান : ড্রোন দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয় আফগানিস্তানে। দক্ষিণ আফগানিস্তানের বিমান ঘাঁটিগুলোতে স্কোয়াড্রন এ-১০সি ওয়ারথগ থান্ডাররোল্ট জঙ্গি বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন ও আফগান বাহিনীর যৌথ অভিযানের অংশ হিসেবে এগুলো দিয়ে তালেবানদের মাদক কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।সংগৃহিত।