প্রকাশ : 2018-06-05

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা ও বর্তমান বিশ্ব ফুটবল

বাজতে শুরু করেছে বিশ্বকাপের বাঁশি। রাশিয়া বিশ্বকাপ মাতাতে প্রস্তুত ফুটবলের বড় বড় সব তারকারা। নিজের দেশের হয়ে মনে রাখার মতো কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই রাশিয়া যাচ্ছেন তারা। বিশ্বকাপের উত্তাপের আঁচটা গায়ে লাগতে শুরু করেছে। সেই আঁচ পেতে রাশিয়া বা জার্মানি বা ল্যাতিন আমেরিকায় যেতে হবে না। বাংলাদেশে বসেই পাওয়া যাচ্ছে সেই উত্তেজনা; বাংলাদেশে বসে নয় শুধু, ঘরে বসেই টের পাচ্ছি বিশ্বকাপ নিয়ে মাতামাতি ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার চেয়ে বাংলাদেশ কম নয়। বিশ্বের অন্য সব দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষও ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে গেছে। মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-ভালবাসা, আবেগ অনুভূতি সব এখন ভার্চুয়াল। বিশ্বকাপ শুরুর আগে থেকেই বাংলাদেশের মানুষ ফেইসবুকে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। এখন চলছে ওয়ার্মআপ। কে কোন পক্ষ তা জানান দেওয়া, নিজেদের দল ভারী করা, ট্রল করা চলছে সমানতালে। ফেইসবুকের নিউজফিডে বিশ্বকাপের হরেক রকমের তথ্যের ছড়াছড়ি। নিজের পছন্দের দলের সাফল্য উদযাপনের চেয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেই মানুষের আগ্রহ বেশি। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে কথা বললে মনে হবে বিশ্বকাপে দুটি দল খেলে- ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের দিগন্ত ছেয়ে যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকায়। বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে ফুটবল। একাত্তর সালের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা আমরা সবাই জানি। এই দলটি শুধু একাত্তর সালে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্ব জনমত গঠন করেছে। ব্যয়বহুল যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছে। অনেকেই হয়ত জানি না স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জন্ম ইতিহাস। ক্ষেত্র বিশেষে প্রকৃত ইতিহাসকে আড়াল করে সুবিধাভোগীরা বনে যান এর ইতিহাসের নায়ক। তবে সত্য কখনও চাপা থাকে না। যেমনটি চাপা থাকেনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সত্যিকার ইতিহাসের ক্ষেত্রে। এখন বেরিয়ে আসছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন আর মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল এই দল। পৃথিবীর ইতিহাসে যুদ্ধকালীন প্রথম ফুটবল দল এটি। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল থেকেই ফুটবলে আমাদের যাত্রা শুরু। ১৯৭১ সালে ভারতে ১৩টি ম্যাচ খেলে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছিল এই দলটি। ভারত এবং ইংল্যান্ডের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন মুজিবনগর সরকারের সহযোগিতায় কলকাতায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি। সামছুল হককে সভাপতি ও লুৎফর রহমানকে সম্পাদক করে গঠিত কমিটির মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ১. স্বাধীনতার সপক্ষে জনমত গড়া, ২. তহবিল সংগ্রহ ও ৩. পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখাতে পাকিস্তান সরকার ঢাকায় কোনো টুর্নামেন্ট যেন আয়োজন না করতে পারে। প্রথম সভাপতি ছিলেন মন্ত্রী শামসুল হক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সভাপতি হলেন এমএনএ আশরাফ আলী চৌধুরী ও এন এ চৌধুরী। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন লুৎফর রহমান। কোষাধ্যক্ষ হলো মোহাম্মদ মহসীন। সদস্য ছিলেন এমএ হাকিম, এমএম মতিন, গাজি গোলাম মোস্তফা, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নজিবুর রহমান ভূঁইয়া। ফুটবল দলের প্রস্তাবক ও সংগঠক ছিলেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠনে পর্যায়ক্রমে ভারত সরকারেরও অনুমোদন ছিল। খেলোয়াড়দের অনুশীলনের জন্য সার্কাস মাঠ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে ক্রীড়া সমিতি ৩৫ সদস্যের স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গঠন করে। দলের খেলোয়াড়রা হলেন- জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), আইনুল হক (সহ-অধিনায়ক), প্রতাপ শঙ্কর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), শাহজাহান আলম, কায়কোবাদ, তসলিম উদ্দিন আহমেদ, আলী ইমাম, সাইদুর রহমান প্যাটেল, আশরাফ নুরুন্নবী, নওশের এনায়েত, সালাহউদ্দিন (তুর্জ হাজরা), লালু, অমলেশ সেন, বিমল, হাকিম, খোকন, সুভাষ, লুৎফর, মজিবুর, শিরু, সাঈদ, পেয়ারা, নিহার, গোবিন্দ, অনিরুদ্ধ, সাত্তার, বিরু, মোমেন, সুরুজ, মাহমুদ, সঞ্জীব, খালেক ও মোজাম্মেল। কোচ হলেন- ননী বশাক ও ম্যানেজার তানভীর মাজহার তান্না। এ দল গঠনে যারা সহযোগিতা করেছেন তারা হলেন- নাজির হোসেন, খসরু, ক্রিকেটার রকিবুল, হেমায়েত সিদ্দিকী, মঈন সিনহা, আবুল কাশেম, অরুণ নন্দী (সাতারু) ও আতাউল হক মল্লিক। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের প্রথম খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২৫ জুলাই নদীয়ায়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল যে ইতিহাস গড়েছে, তা নিয়ে অবশ্যই গর্ব করা যায়। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনকে ইউনেসকো যে কারণে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, একইভাবে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অবদানের কথা ফিফাকে যথাযথভাবে অবহিত করা হলে এ দলটিও স্বীকৃতি পেতে পারে। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি ও স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি অংশ। অথচ স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক এবং খেলোয়াড়রাও মুক্তিযুদ্ধের ‘ফুটবল সৈনিক’। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের দীপ্তিমান গৌরব। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ অর্জন করে মহান স্বাধীনতা। এই নয় মাসের যুদ্ধে প্রাণ দেন প্রায় ত্রিশ লক্ষ শহীদ। ঘরবাড়ি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা অগণিত। সেইসাথে আছে অবকাঠামোগত আর আর্থিক সংকট। পৃথিবীর বুকে নতুন জন্ম নেয়া শিশুদেশ বাংলাদেশের পথ চলা। রাজনৈতিক আর আর্থসামাজিক সঙ্কটের মধ্যে থাকা বাংলাদেশের প্রথম দিন থেকেই চেষ্টা করেছে ঘুরে দাঁড়াতে। অন্যান্য খাতের মতো খেলাধুলার ক্ষেত্রেও যার ব্যতিক্রম ছিল না। সেই সূত্রধরেই ফের চাঙ্গা করার চেষ্টা করা হয় দেশের ফুটবলকে। স্বাধীনতা লাভের পরের বছর ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই গঠন করা হয় বাংলাদেশ ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। দেখতে দেখতে বাংলাদেশের বয়স যেমন বাড়ছে ফুটবলের ঐতিহসিক অর্জনও ম্লান হচ্ছে। এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিকমানের একটি ফুটবল দল গঠন হয়নি। বিশ্বকাপের আসর তো কল্পনা বিলাসী। দেশের ফুটবলের আজকের যে দৈন্যদশা, তা কিন্তু একদিনের তৈরি হয়নি। মুলতঃ ভুটান বিপর্যয়ের পরেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে এই দুদর্শার চিত্রটা। ভুটান লজ্জার আগে মালদ্বীপের বিপক্ষে ৫ গোল হজমেও বুঝা গিয়েছে কোথায় অবস্থান করছে বাংলাদেশের ফুটবল। এছাড়া টানা তিনটি সাফ ফুটবলের গ্রুপ পর্ব থেকে বাংলাদেশের বিদায়ের করুণ গল্পতো আছেই। শেষ ২০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলাদেশ গোল হজম করেছে ৫৫টি। যেখানে গোল দিয়েছে মাত্র ১১টি। ৪ জয়ের বিপরীতে ৩ ড্র, ১৩ হার। বাংলাদেশের ফুটবল যে একেবারেই লক্ষ্যহীন একথা এখন চায়ের দোকানেও হরহামেশাই আলোচনা হয়। একটি সুন্দর সম্ভাবনাময় ফুটবল দল হতে হলে সবার আগে প্রয়োজন সংগঠকদের আন্তরিকতা। তাদের দায়িত্বশীল আচরণ। বিপন্ন ফুটবলের হারানো গৌরব ফেরাতে হবে। ফুটবল এমন একটি খেলা, যা দক্ষতা, শৃঙ্খলা ও টিম স্পিরিটের সঙ্গে খানিকটা ক্লাব্য, কিছুটা উচ্ছৃঙ্খলতা ও এক খামচা পাগলামোর এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিকেএসপি শিক্ষা কোর্স কারিকুলামে ৬ষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় টেক্সট বুক পাঠ্যসূচি এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডকে অনুসরণ করে। শিক্ষার্থীদেরকে খেলাধুলার উপর সংক্ষিপ্ত খ-কালীন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বিকেএসপিতে যেসব শিক্ষক কর্মরত তাদের কারোর ফুটবলের উপর প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা এমনকি ডিপ্লোমা কোর্সের প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেননি। বিকেএসপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকমানের ফুটবলার যেমন তৈরি করতে পারছেনা তেমনি যোগ্য কোন ক্রীড়া সংগঠক ও তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশ্ব স্বীকৃত ৪ বছর মেয়াদি ফুটবল খেলার শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ডিপ্লোমা কোর্স সংকট মোচনে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারে। লেখক:খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।[email protected]