প্রকাশ : 2018-06-08

স্বপ্নের উচ্চবিলাসী বাজেট

বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তার স্বপ্ন পূরণে সম্ভাব্য সবকিছুই পরিকল্পনা করছেন তিনি। তার প্রতিফলনও বাজেট প্রস্তাবে রাখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট পাস হওয়ার ৬ মাসের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন থাকায় সবই নির্বাচনকেন্দ্রিক হয়ে তা জনতুষ্টি আর অতুষ্টিতে পরিণত হয়েছে। তাই আশা আর স্বপ্ন একই সূতায় বাধা সম্ভব হবে না জীবনের শেষ বাজেট দেওয়া এই অর্থমন্ত্রীর। কারণ তার এই বাজেটে চালের দাম বাড়ার স্পষ্ট আভাস রয়েছে। ব্যক্তির কর হারও অপরিবর্তিত রেখেছেন তিনি। অপরদিকে বাড়ছে পোশাকের কর হার, কমছে কর্পোরেট কর। এ বাজেট গরিবের জন্য যেমন বোঝা হবে, তেমনি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। দেশকে মধ্যম আয়ে পরিণত করার জন্য আগামীর পথে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন সামনে রেখে ভোটের বছরে ৪ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেছেন এই প্রবীণ মন্ত্রী। দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১২ বার বাজেট দেওয়ার রেকর্ড স্পর্শ করা মুহিত বিশাল এই ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ অর্থ রাজস্ব খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছেন। যা বাস্তবায়ন আকাশ কুসুম স্বপ্ন। তবে অর্থমন্ত্রী নিজেই বলতেন, স্বপ্ন দেখতে না জানলে বড় কিছু করা যায় না। স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কতটা যে অক্ষম তা বারবারই প্রমাণ হয়েছে। তাই অক্ষম এনবিআর অর্থমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কতটা সক্ষম হবে তা নিয়েই সন্দিহান অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, স্বপ্ন বাস্তবায়নে এনবিআরের যতটা দক্ষতার প্রয়োজন তা এই প্রতিষ্ঠানের নেই। কর্মকর্তাদের মধ্যে সততারও অভাব রয়েছে।অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন দ্রুততম সময়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রূপরেখা বাস্তবায়নে তাদের সরকারের ঈর্ষণীয় সক্ষমতা ইতোমধ্যে প্রমাণিত হয়েছে। এটি শুধু তাদের দাবি নয়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সত্য। ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে একদিন যে দেশকে অবজ্ঞা করা হয়েছে, সে দেশ বিশ্ববাসীর কাছে এখন এক ‘উন্নয়ন-বিস্ময়’; বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রা এখন বিশ্বের রোল মডেল। মন্ত্রীর এই কথা সত্য, তবে ব্যর্থতাগুলো তিনি কৌশলে এড়িয়ে গেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তাদের মতে, ব্যর্থতা না এড়িয়ে তা প্রকাশ করলে উন্নয়নের জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করতো। মুহিত বলেন, ২০১৭ সালে দ্রুততর প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী শীর্ষ দশটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। দারিদ্র্যমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের পুরোপুরি বাস্তবায়নে আমাদের পাড়ি দিতে হবে আরও খানিকটা পথ। বিপুল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমে আরও গতি সঞ্চার করার কথা বলেছেন তিনি। তাই উচ্চ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি যোগাযোগ-বিদ্যুৎ-জ্বালানি অবকাঠামো বিনির্মাণ ও বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ সৃজনের জন্য তাদের আয়োজন ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার কথাও বলেছেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বিদ্যুৎ-জ্বালানির জন্য অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অনেক প্রতিষ্ঠান চালুও করা হচ্ছে না এরই বিদ্যুৎ-জ্বালানির অভাবে। এমনকি বাসাবাড়িতে ইফতার সেহরির সময়ও বিদ্যুৎ থাকছে না। ফলে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব না, আর উন্নয়ন না হলে জিডিপিও বাড়বে না বলেই সংশ্লিষ্টরা বলছেন। তিনি বলেন, আমরা এখন এই মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়নের কাজ শুরু করেছি। এছাড়াও একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’-এর খসড়াও প্রণয়ন করছেন বলে জানিয়ে বলেন, সারা পৃথিবী আমাদের সফল উন্নয়ন কৌশল ও কার্যক্রমের স্বীকৃতি ইতোমধ্যেই দিয়েছে। প্রবীণ এই অর্থমন্ত্রী তার বাজেট প্রস্তাবে বলেন, শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ২০ লক্ষ শ্রমশক্তি যুক্ত হয়। কর্মক্ষম এই জনশক্তির জন্য দেশের অভ্যন্তরে এবং প্রবাসে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তারা আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি স্বীকার করেছেন, দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো বর্ধিত বিনিয়োগ। কিন্তু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি বলেছেন, তারা সরকারি খাতে বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বাড়াচ্ছেন। তবে, এ বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানির সংযোগ প্রাপ্তি, বিনিয়োগ প্রস্তাব প্রক্রিয়াকরণ, নিষ্কন্টক জমির প্রাপ্যতা ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ামক ভূমিকা পালন করে থাকে। এসব সেবা সহজলভ্য করে বৃহৎ ও রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে সম্ভাবনাময় এলাকাসমূহে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ২০১০ সালে ‘বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল আইন’ প্রণয়ন করেন। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৭৬টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আর অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছতে বৈষম্য কমিয়ে, বিদ্যমান সরকারি পেনশন কার্যক্রমের বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সব কর্মজীবী মানুষের জন্য সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা চালুর কথা বলেছেন। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা ও ভাতা বাড়ানো হচ্ছে। প্রস্তাবিত বাজেটে চাল আমদানিতে শুল্ক রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে সকল প্রকার চাল আমদানিতে আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ ও সম্পূরক শুল্ক ৩ শতাংশ প্রযোজ্য হবে। ফলে আমদানি করা চালের দাম বাড়বে। যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। তবে সরকারি কর্মচারীরা বাড়তি বেতন পাওয়ায় তাদের ওপর এর প্রভাব অনেকটাই কম পড়বে। নতুন অর্থবছরে সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা আগের মতই ২ লাখ ৫০ হাজার টাকাই থাকছে। অপরদিকে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট কর কমানোর প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। আবার নতুন বাজেটে তৈরি পোশাকের সাধারণ কারখানার করহার ১৫ শতাংশ ও তৈরি পোশাকের তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে গত বছর একক আয়কর হার ছিল ১২ শতাংশ। গতকাল ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি দেশের ৪৭তম ও আওয়ামী লীগ সরকারের ১৮তম এবং অর্থমন্ত্রীর ১২তম বাজেট প্রস্তাব। ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ নাম দিয়ে এবারের বাজেট উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে টানা দশবার বাজেট পেশ করেন মুহিত। দুপুর সাড়ে ১২টার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য এই বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে মন্ত্রী, সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া প্রস্তাবিত বাজেটে সম্মতিসূচক স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বাজেট অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। এবার মূল বাজেটের যে আকার মুহিত ধরেছেন, তা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। গতবছর প্রস্তাবিত বাজেট ছিল জিডিপিরি ১৮ শতাংশ। সে হিসেবে এবার দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। অবশ্য এক বছরের ব্যবধানে দেশের জিডিপিও বড় হয়েছে। যদিও ব্যাংক লুটের ঘটনায় অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার এই বাজেটের মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। আর অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মূল বাজেট ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগামী বাজেটের আকার সংশোধিত বাজেট থেকে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। বিশাল এই বাজেটে ব্যয় মেটাতে সরকারি অনুদানসহ আয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা। এনবিআর-বহির্ভূত কর ৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। কর ব্যতীত রাজস্ব প্রাপ্তি ৩৩ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। বৈদেশিক অনুদান ৪ হাজার ৫১ কোটি টাকা। মোট ঘাটতি ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। সরকারের অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা থেকে ঋণ ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে যা আছে ৬০ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা। এদিকে, নিট ঋণ ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ১৬ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। বাজেটে জিডিপি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে। নতুন বাজেটে ঘাটতি মেটাতে অর্থমন্ত্রী বৈদেশিক উৎস থেকে মোট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছেন ৬০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। সেখান থেকে ১০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচ হবে। সরকারের নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ হাজার ১৬ কোটি টাকা। ঘাটতির বাকি ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা নেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এরমধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া হবে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বাকি তিন হাজার কোটি টাকা অন্যান্য উৎস থেকে। *বাজেট ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি * উন্নয়ন ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি *অনুন্নয়ন ২ লাখ ৮২ হাজার ৪১৫ কোটি *আয় ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৩৩১ কোটি *রাজস্ব ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি *ঘাটতি ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি *অভ্যন্তরীণ ঋণ ৭১ হাজার ২২৬ কোটি *বৈদেশিক ঋণ ৬০ হাজার ৫৮৫ কোটি *জিডিপি ৭ দশমিক ৮ শতাংশ *মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ

জাতীয় পাতার আরো খবর