বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৯, ২০২০
প্রকাশ : 2017-12-09

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশে নারী জাগরণে বিপ্লব ঘটেছে :প্রধানমন্ত্রী

নিজ মেধা ও ক্ষমতার ওপর আস্থা রাখার জন্য দেশের নারী সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । তিনি বলেছেন, নারী ও পুরুষ উভয়ে মিলেই দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে হবে। শনিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রোকেয়া দিবস ও রোকেয়া পদক-২০১৭ বিতরণ উপলক্ষে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা চাই দেশের সব নারী-পুরুষ দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করবে। মেয়েদেরকেও সবসময় এটা ভাবতে হবে, যার যে মেধা, যার যে শক্তি, সে যেন সেটাকে বিকশিত করে। নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই চলতে হবে, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেটা নিজেদের উদ্যোগে হতে হবে, কারো মুখাপেক্ষী হয়ে নয়। চলার পথে নানা বাধা থাকে, বাধা আসবেই, সেই বাধাকে অতিক্রম করে আমাদের নারীদের এগিয়ে যেতে হবে। সব মা-বোনের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, সবার উচিত, আমাদের সমাজে যারা একেবারে অবহেলিত তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের মাঝে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এবং তাদের সহযোগিতা করা। বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বক্তৃতা করেন মাজেদা শওকত আলী। এবছর পাঁচজনকে বেগম রোকেয়া পদক ২০১৭-তে ভুষিত করা হয়। তারা হলেন- সংগঠক মাজেদা শওকত আলী, মাহফুজা খাতুন বেবী মওদুদ (মরণোত্তর) চিত্রশিল্পী সুরাইয়া রহমান, লেখক শোভা রানী ত্রিপুরা এবং সমাজকর্মী মাসুদা ফারুক রত্না। প্রধানমন্ত্রী গত বছর বেগম রোকেয়া পদক বিতরণের সময় ঘোষণা দিয়েছিলেন, এ বছর থেকে দুজনের পরিবর্তে আরো বেশি সংখ্যক নারীদের, বিশেষ করে যারা নিভৃতে নারী উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের মাঝে এই পদক বিতরণ করা হবে। ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৪৬ জন নারীকে এ পদক দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ট্রেডে নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি, যাতে দেশে-বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। কাজেই আমরা চাই যে, সবাই নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এই দেশকে উন্নত করার কাজ করবে । নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে তার সরকারের ব্যাপক কার্যক্রমের সাফল্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একের পর এক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে লিঙ্গসমতায় বাংলাদেশ শীর্ষ স্থান অর্জন করেছে। তিনি আরো বলেন, ১৯৯৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর আমার সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে সংরক্ষিত আসনে মহিলা কাউন্সিলর এবং পরবর্তী সময়ে উপজেলা পর্যায়ে ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সরকারে বর্তমানে ১২ হাজার ৮২৮ জন নির্বাচিত মহিলা সদস্য দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত আছেন। স্থানীয় সরকারের অন্তত পাঁচটি কমিটিতে তারা চেয়ারপারসনের দায়িত্বে আছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখন ছাত্রদের চেয়ে ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি। নারী শিক্ষিকার সংখ্যা ৬০ভাগে উন্নীত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দেশে নারী জাগরণে বিপ্লব ঘটেছে, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার একজন নারী। তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। সংসদ উপনেতা ও বিরোধী দলীয় নেত্রীও নারী। খেলাধুলাসহ সর্বক্ষেত্রে এই নারীরা এখন অগ্রগামী। শেখ হাসিনা বলেন, নারী নীতিমালা প্রণয়ন, নারী উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারণ, দরিদ্র-অবহেলিত নারীদের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আনা এবং সর্বোপরি সমাজের প্রান্তিক, অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত, দরিদ্র নারীদের উন্নয়নে সরকার বিশেষ নজর দিয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে তার সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১ প্রণয়ন করেছে। মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ বেতনসহ ৪ মাস থেকে ৬ মাস করা হয়েছে। সন্তানের পরিচয়ের ক্ষেত্রে মায়ের নাম লেখা বাধ্যতামূলক এবং জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে ৫০ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নারী উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রসঙ্গে বলেন, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ এবং পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা ২০১৩ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১০- এ আইন আমরা প্রণয়ন করেছি। তিনি বলেন, নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে যুগব্যাপী জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১৩-২০২৫) প্রণয়ন করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪ এর খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। যৌতুক নিরোধ আইন-১৯৮০ সংশোধন করে যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তারা পুরুষদের থেকে ৫ থেকে ৬ শতাংশ কম সুদে ঋণ পাচ্ছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দরিদ্র মাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করেছে। ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল থেকে গার্মেন্টসে কর্মরত দুগ্ধদায়ী ও গর্ভবতী মাকেও ভাতা দেওয়া হচ্ছে। মহিলা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ১৭ হাজার ৬৩৯টি সমিতিতে সরকার অনুদান দিচ্ছে, উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৬৪টি জেলায় ৪৮৯টি উপজেলার ৪ হাজার ৫৪৭টি ইউনিয়নে দুস্থ মহিলা উন্নয়ন (ভিজিডি) কর্মসূচি চালু রয়েছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ওয়ান স্টপ সেন্টারের ভূমিকা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) সেপ্টেম্বর, ২০১৫ পর্যন্ত ২৩ হাজার ৮৮৮ জন নারীকে সেবা দেওয়া হয়েছে। ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেল জানুয়ারি ২০১৩ সাল হতে সেপ্টেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত ১৬ হাজার ১৭৯ জন নির্যাতনের শিকার নারীকে সহায়তা দিয়েছে। দেশের আটটি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে প্রাক্তন ভিকটিমদের নিয়মিত মাসিক ফলোআপ সভা হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, সেপ্টেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরিতে ৩ হাজার ২০০টি মামলার ডিএনএ পরীক্ষা হয়েছে। ন্যাশনাল হেল্পলাইন সেন্টার ১০ হাজার ৯২১টি যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও বাল্যবিবাহ বন্ধে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। জাতীয় মহিলা সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল এর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ন্যাশনাল সেন্টার অন জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিধবা ও নিগৃহিত মহিলা ভাতাপ্রাপ্তদের সংখ্যা ১০ দশমিক ১২ লাখ থেকে ১১ দশমিক ১৩ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। সন্তানসম্ভবা ও ধাত্রী মায়ের ভাতা ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে তাদের পরিবারে একটা অবস্থান থাকছে। প্রধানমন্ত্রী বেগম রোকেয়ার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নেপথ্য কারিগর তার মা বেগম মুজিবের বিভিন্ন সাহসী ভূমিকার কথাও ভাষণে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার মায়ের একটা দৃঢ়চেতা মনোভাব ছিল। সময়োচিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। আমার মা রাজনীতিতে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বাবার পাশেই সব সময় থেকেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজের জীবনের তিনটি ঘটনা তুলে ধরে তার মা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের দৃঢ়চেতা এবং দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনা সম্পর্কে আলোকপাত করেন। প্রথমত, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় ৬ মাস বাবার কোনো খোঁজ পাইনি । তাকে জেলখানা থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি বেঁচে আছেন কি মরে গেছেন জানি না। সে সময় মামলার যেদিন শুনানি সেদিনই তার দেখা পাই। সে সময় আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আইয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠকে অংশগ্রহণের কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমার মা বললেন, না, প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধু আলোচনার জন্য যাবেন না। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় বেগম মুজিবের ম্যাসেজ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় যে, প্যারোলে মুক্তি নেওয়া যাবে না। কারণ তার মা বলেছিলেন, এই মামলার আরো ৩৪ জন সদস্য রয়েছেন। বঙ্গবন্ধু যদি প্যারোলে মুক্তি নেন তাহলে অন্যদের কী হবে? সে সময় অনেক কষ্টে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার পর বাসায় ফিরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ নেতাদের তোপের মুখে পড়ার কথা স্মরণ করে বলেন, সে সময় ক্ষুব্ধ নেতারা বলছিলেন- তুমি কেমন মেয়ে হে, বাবার মুক্তি চাও না, তোমার মা তো বিধবা হবেন। তিনি বলেন, মা-ই তখন সেসব নেতাদের বলেছেন এবং আমাকে অভয় দিয়েছেন, নিশ্চয়ই তোমার বাবা ফিরে আসবে, এত বড় অন্যায় কখনো হতে পারে না। তার সেই সময়োচিত সিদ্ধান্তে বাংলার মুক্তির সংগ্রাম তখন নতুন করে গতি পায় বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে ভাষণ আজ শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে পৃথিবীতে স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউনেস্কো তাদের ওয়ার্ল্ড মেমোরি রেজিস্টারে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সেই ভাষণ দেওয়ার দিনের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকাল থেকেই নানাজনে নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন- এটা বলতে হবে, ওটা না বললে হবে না। কিন্তু মা ভাষণ দেওয়ার কিছু আগে বঙ্গবন্ধুকে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দেন এবং একটি আলাদা ঘরে নিয়ে বলেন (যে ঘরে প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন), তুমি জান কী বলতে হবে। এই বাংলার মানুষের জন্য তুমি আজীবন সংগ্রাম করেছ। তোমার সামনে লাঠি হাতে জনগণ, পেছনে পাকিস্তানিদের উদ্যত বন্দুক। তাই তুমি জান তোমাকে কী বলতে হবে। কারো পরামর্শ শোনার দরকার নেই। এরপর সমগ্র বিশ্ব দেখেছে কোনো কাগজ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণ দিয়ে সমগ্র দেশবাসীকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। অপর ঘটনাটি বলতে গিয়ে অশ্রু সংবরণ করতে পারেননি প্রধানমন্ত্রী। সেটি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কাল রাতের ঘটনা। সিঁড়ির ওপর বঙ্গবন্ধুর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে যান এবং সৈনিকরা তখন তাকে অন্যত্র নিয়ে যাবার উদ্যোগ নিলে তিনি বলেন, তিনি জাতির পিতাকে এখানে ফেলে রেখে কোথাও যাবেন না। প্রধানমন্ত্রী বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, তার মা বলেছিলেন, তোমরা তাকে (বঙ্গবন্ধু) গুলি করে মেরেছ। আমাকেও গুলি করে মারো। আমি কোথাও যাব না। জাতির জনকের কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার মা অন্য সবার মতো সেদিন কিন্তু নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করেননি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাবার কারান্তরীণ থাকার সময়গুলোতে মায়ের বলিষ্ঠ ভূমিকা তখন বিপন্ন জাতিকে পথ দেখিয়েছে ।

জাতীয় পাতার আরো খবর