প্রকাশ : 2018-07-13

ধর্মের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে বাঁচাতে হবে

তসলিমা নাসরিন :কিছুদিন আগে কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস প্রাঙ্গণে একটি গাছতলায় দুটো পাথর বসিয়ে গেছে কারা যেন, কারা যেন তারপর ওই পাথর দুটোয় সিঁদুর লেপেছে, মালা পরিয়েছে, ফুল পাতা ছড়িয়েছে, পূজার্চনা শুরু করেছে। এসবের মানে, পাথর দুটো পাথর নয়, পাথর দুটো ভগবান। মুশকিল হলো, সিঁদুর লেপা পাথরকে যে কেউ সরিয়ে দিতে পারছিল না, ভয় ছিল, সরিয়ে দিলে ধার্মিকেরা ছুটে এসে মারধর করবে। কেউ নাকি ওই পাথর দুটোকে লাথি মেরে সরাতে চেয়েছিল, তাতেই একদল তেড়ে এসেছে, শিব ঠাকুরকে লাথি মেরেছে, এত বড় স্পর্ধা! অনেকে বলছেন, প্রগতিশীলদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, মুক্তচিন্তকদের মতবিনিময়ের জায়গায় মন্দির গড়ার ষড়যন্ত্র চলছে। মন্দির গড়ে উঠলে, মুশকিল হলো, এলাকাটিতে সংস্কৃতি চর্চার বদলে ধর্ম চর্চাই প্রাধান্য পাবে। ধর্মবাদীরা ধর্মকে সংস্কৃতি করতে চায়, সংস্কৃতিকে ধর্ম করতে চায় না। এই প্রশ্ন তো আসেই, মন্দির গড়ার জন্য একাডেমি চত্বরের দরকার হয় কেন? মন্দিরের কি অভাব কলকাতায়? শত শত মন্দির তো আছেই পুজোর জন্য! ধার্মিকদের নিয়ে মুশকিল, তারা পৃথিবীর সব জায়গা দখল করে নিতে চায়। সব সরকারকে তাদের প্রচারক বানাতে চায়, সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের সমর্থক করতে চায়, সব মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সেই রূপকথায়, যে রূপকথায় তারা নিজেরা বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আড়াই হাজার মসজিদ মাদ্রাসা বানানো হয়েছে। রাতে রাতে মোল্লারা ওয়াজ শোনায় রোহিঙ্গাদের, বুদ্ধি দেয়, বার্মা তাদের ফেরত নিতে চাইলেও যেন তারা ফেরত না যায়। রোহিঙ্গা শিশুদের মগজ ধোলাই চলছে। এদের জিহাদি বানানোর দুষ্ট চিন্তা কারও কারও মাথায়, আমরা অনেকেই সে কথা জানি। ধর্মের রাজনীতি থেকে শুধু নিজেদের বাঁচালেই চলবে না, রাষ্ট্রকে বাঁচাতে হবে, সমাজকেও বাঁচাতে হবে। কলকাতার একাডেমি চত্বরে মন্দির গড়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে প্রগতিশীল মানুষ। প্রতিবাদের ফলে কাজ হয়েছে। পাথর দুটোকে গাছতলা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে পুলিশ। সাংস্কৃতিক কর্মীরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। চত্বরটিতে একটি মন্দির হতে যাচ্ছিল, অথচ মন্দির হতে দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে কোনও দাঙ্গা হাঙ্গামা হয়নি। পূজার্চনা যখন হয়েছিল, তখন কেউ কেউ ওটিকে ছোটখাটো একটি মন্দির বললেও বলতে পারে। চত্বর থেকে মন্দির সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক। জনগণের স্বার্থ ধর্মের চেয়ে বড়। ফাইন আর্টস একাডেমির চত্বরে মন্দির গড়ে তোলা কোনও অর্থেই সঠিক নয়। চত্বরটি ফাইন আর্টসের জন্য বরাদ্দ, মন্দিরের জন্য নয়। কোনও মন্দির চত্বরে কেউ একাডেমি গড়ে তুলতে যায় না, একাডেমি চত্বরেও মন্দির গড়ে তোলা উচিত নয়। দুটো প্রতিষ্ঠান একই চত্বরে থাকার জন্য যে ন্যূনতম সম্পর্ক থাকতে হয়, সেটি নেই। মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে হাসপাতাল গড়ে উঠতে পারে, নাটকের মঞ্চের পাশে নাট্য একাডেমি গড়ে উঠতে পারে, মন্দিরের আঙিনায় টোল থাকতে পারে। ঠিক যেমন মসজিদের আঙিনায় থাকতে পারে মাদ্রাসা। যে স্থানে যেটিকে মানায়, সে স্থানেই সেটিকে স্থাপন করা উচিত। রানওয়ের ওপর কি দালান তোলা বা হাইওয়ের ওপর হাট বসানো উচিত? যে কেউ বলবে উচিত নয়। কলকাতা বিমানবন্দরের দ্বিতীয় রানওয়ের সামনে কিন্তু আস্ত একটি মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে। এই মসজিদটি সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চলছে অনেক কাল। সরিয়ে ফেলে দেওয়া নয়, সরিয়ে অন্য জায়গায় নেওয়া। কিন্তু সম্ভব হচ্ছে না। আদৌ সম্ভব হবে কিনা, এ ব্যাপারেও কোনও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এটি যদি একটি বাড়ি হতো, দোকান হতো, তাহলে সরিয়ে ফেলায় সমস্যা হতো না। মসজিদ বলেই সমস্যা। মসজিদটি সরানোর জন্য ক’জন রাজনৈতিক নেতা মুসলিম সংগঠন দার-উল-উলুমের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। মসজিদ কমিটি, রাজ্য সরকার, আর কেন্দ্র-সরকারের মধ্যেও বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। জানিনা হয়েছিল কিনা, হলেও লাভ হয়নি। যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে মসজিদটি যে রানওয়ের সামনে থেকে সরানো উচিত, তা সকলে জানে। সরানো সম্ভব না হওয়ার কারণ, মুসলমানরা মসজিদ সরানোর পক্ষে নন। অথবা রাজনৈতিক নেতাদের অনেকেই মসজিদটি সরানোর জন্য জোরেশোরে উদ্যোগ নেন না, কারণ তাঁরা মনে করেন, মসজিদ সরাতে চাইলে মুসলিমদের ভোট পাওয়া যাবে না। ভোটের কারণে মুসলিম তোষণ চলে ভারতবর্ষে। মুসলিমদের মঙ্গল চান বলে মসজিদটি কোথাও সরে যাক তা চান না, এ কথা যারা বলে, তারা মিথ্যে বলে। মুসলমানদের মঙ্গল তাঁরাই চান, যাঁরা মুসলমানদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেন, তাঁদের শিক্ষিত সচেতন স্বনির্ভর দেখতে চান, প্রগতিশীলতায়, ধর্মনিরপেক্ষতায়, মুক্তচিন্তায়, উদারনৈতিকতায়, বাক স্বাধীনতায় তাঁদের বিশ্বাসী দেখতে চান। বিমানবন্দরের জন্ম থেকেই মসজিদটি রানওয়ের সামনে রয়েছে। আট নম্বর গেট দিয়ে প্রতিদিন তিরিশ-চল্লিশজন লোক ঢোকেন মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য। শুক্রবারে একশো’রও বেশি যান জুমা পড়তে। মসজিদটি আছে বলে বিমানবন্দরের সুরক্ষিত এলাকায় বাইরের লোক কী অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারেন! এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় আট নম্বর গেট থেকে মসজিদ পর্যন্ত যাতায়াতের পথটি কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে দেওয়া হলেই তো রানওয়ের সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মসজিদের জন্য বিমান ওঠানামার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। কলকাতায় দু’টি সমান্তরাল রানওয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রধান রানওয়ের দৈর্ঘ্য ৩ হাজার ৬২৭ মিটার। কিন্তু, দ্বিতীয় রানওয়ের উত্তর প্রান্তে মসজিদ থাকায় সেটি ২ হাজার ৮৩৯ মিটারের বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। সেদিক থেকে বিমান যখন নামে, তখন দুর্ঘটনার ভয়ে রানওয়ের অনেকটা অংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। প্রধান রানওয়ে প্রায়ই বন্ধ থাকায় দ্বিতীয় রানওয়ে দিয়ে বিমান ওঠানামা করে। কিন্তু তার দৈর্ঘ্য কম থাকায় এয়ারবাস ৩৩০, বোয়িং ৭৪৭-এর মতো বড় বিমান সেই রানওয়ে দিয়ে ওঠানামা করতে পারে না। মসজিদ সরিয়ে দ্বিতীয় রানওয়ের দৈর্ঘ্য বাড়ালে সমস্যা আর থাকবে না। দু’টি রানওয়ের দৈর্ঘ্য সমান হলে একসঙ্গে দু’টি রানওয়ে থেকে বড় বিমান ওঠানামা করতে পারবে। বিমানবন্দরের অফিসারদের মতে, মসজিদ যদি সরিয়ে ফেলা যায় তা হলে দ্বিতীয় রানওয়ে উত্তর প্রান্তে বাড়ানো যাবে, তাছাড়াও ট্যাক্সিওয়ে, রানওয়েতে পৌঁছোনর যে রাস্তা, সেটির দৈর্ঘ্যও বাড়িয়ে দেওয়া যাবে। দুটো রানওয়েকেই তখন এখনকার তুলনায় বেশি বিমান ওঠানামা করার জন্য ব্যবহার করা যাবে। আগামী কয়েক বছরে কলকাতা বিমানবন্দরে যাত্রী সংখ্যা বাড়বে, উড়ান সংখ্যাও বাড়বে। তাই নতুন একটি টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে। টার্মিনাল বাড়বে, কিন্তু রানওয়ে আগের মতোই রয়ে গেলে বিশেষ কোনও লাভ হবে না। এসব জানেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কী করবেন। মসজিদটি তো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ওটিকে টোকা দেয়, এমন সাধ্য কারও নেই। দাঙ্গা বাধার ভয়ে বা মুসলিম মোল্লারা রাগ করবে এই ভয়ে যদি কর্তৃপক্ষ মসজিদটি সরাতে না চান, আমার মনে হয়, মুসলিম নেতাদেরই এগিয়ে আসা উচিত এটিকে স্থানান্তরিত করার কাজে। এই কাজটি করলে মুসলিমদের ওপর সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা বাড়বে। তারা ভাববে, কে বলেছে মুসলিমরা সাধারণ মানুষের সুবিধের কথা ভাবে না? কে বলেছে শুধু নিজের ধর্ম আর স্বার্থ নিয়ে তারা বুঁদ হয়ে থাকে? মুসলিমরাও উন্নয়নের কাজে, দশ ও দেশের সেবায় ত্যাগ করতে পারে। মুসলিমদের ওপর অমুসলিমদের শ্রদ্ধা বাড়লে মুসলিমদেরই ভালো। আর নিজের সম্প্রদায় নিয়ে গৌরব করতে হলে কিছু গৌরবগাথাও তো চাই। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন) লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।