প্রকাশ : 2018-07-13

মাদক সভ্য ও সুন্দরের পথে বাধা

অনলাইন ডেস্ক :ইসলাম সুন্দরের ধর্ম। শাশত সৌন্দর্যের পবিত্র এক সামিয়ানার নাম ইসলাম। ইসলামের আরশের ছায়ায় অপবিত্রতা নেই। মাদকতা নেই। ধোঁকা নেই। মাদক সভ্য ও সুন্দরের পথে বাধা। আলোকিত জীবন চলাচলে বিঘ সৃষ্টি করে। মাদকের কারণে জীবন সংকটে পড়ে। ইসলামে মাদককে একদিনে নিষেধ করা হয়নি। ধীরে ধীরে নিষেধ করা হয়েছে। ইসলামী আইন খুব সূক্ষ্মভাবে প্রতিরোধ করেছে মাদককে। মদিনায় ইসলামের প্রথম যুগে মদ সম্পর্কে কোরআনুল কারিমে প্রথমে যে আয়াত নাজিল হয়েছিল, তাতে বৈধতার যৎসামান্য আভাস ছিল। প্রথমে হুট করে এক দফায় নিষেধ করে দিলে মানুষের জন্য পালন করা কষ্টকর ও অনেকে অবজ্ঞা করত। কারণ মাদক তাদের রক্ত, শিরায়, ধমনিতে মিশে গেছে। এ জন্য প্রথমে বৈধতার কিঞ্চিৎ আভাস দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে বোধ সম্পন্ন ব্যক্তির জন্য নিদর্শনের কথা। এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, জ্ঞানীরা মাদক পরিত্যাগ করবে। শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোরআনে পঠিত হয়েছে, খেজুর বৃক্ষের ফল ও আঙুর থেকে তোমরা মাদক ও উত্তম খাদ্য সংগ্রহ করে থাক, তবে অবশ্যই বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিদর্শন। (সূরা নাহল : ৬৭)। তখনও মদ অবৈধ করা হয়নি। যার ফলে অনেক মুসলমান সাহাবি আগের মতো মদ পানে অভ্যস্ত ছিল। সর্ব যুগেই মদ পান মানুষের জ্ঞান চিন্তা শক্তিকে গ্রাস করেছে। বুদ্ধি বিনষ্ট করেছে। আকল বিকল করেছে। তখনকার সময়ে হযরত ওমর, মুয়ায ইবনে জাবালসহ কিছু সাহাবি রাসুল (সা.) এর কাছে এই মর্মে আরজ করলেন যে, হে আল্লাহর রাসুল! মাদকের ব্যাপারে আমাদের ফতোয়া দিন। এতে আকল নষ্ট হয় এবং মাল ধ্বংস হয়। মুসলমানের চেতনার বারান্দায় যখন মদের মন্দ বিষয় উঁকি দিল, তারা যখন স্বেচ্ছায় স্বীকার করল মদের কারণে তাদের চিন্তাশক্তি লোপ পায়, তখনই মহান প্রভু নাজিল করেন মদ পানে উপকারের তুলনায় মদের মন্দ বিষয়। কোরআনে ঘোষণা হয়েছে, ‘লোকে আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, উভয়ের মধ্যে মহাপাপ এবং মানুষের উপকার আছে। কিন্তু তাদের পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক। (সূরা বাকারা : ২১৯)। এই আয়াত নাজিল হলে মানব মাঝে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। কেউ চিরতরে মদ পান ছেড়ে দেন। কেউ আগের অভ্যাসে চালিয়ে নেয় জীবনকে। এভাবে কিছুদিন চলতে থাকে। এ সময় আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) বাড়ির এক অনুষ্ঠানে সাহাবিদের দাওয়াত করেন। খাবার শেষে ব্যবস্থা করেন মদের। জমে যায় আরবীয় ঐতিহ্যের মদ আসর। ইচ্ছামতো পান করেন অনেকে। তৃপ্তির ঢেঁকুর গিলেন। সবার মধ্যে এক উন্মাদনা। মদের ঘোরে তারা নামাজে দাঁড়ায়। তখন তাদের কোনো একজন নামাজে পাঠ করে ফেলেন, কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরুন, আবুদু মা তাবুদুন। অর্থাৎ লাঅক্ষরটি বাদ দিয়ে পড়েন। নেশার ঘোরে নামাজে মারাত্মক ভুল করে ফেলে। অর্থে ভুল বিরাট বড়। তখনই আল্লাহ নাজিল করেন, হে মোমিনরা! মদপানোত্তর মাতাল অবস্থায় তোমরা নামাজের নিকটবর্তী হবে না। যতক্ষণ তোমরা যা বল তা বুঝতে পার।(সূরা নিসা : ৪৩)। ওই আয়াত নাজিল হলে তুলনামূলক মদপায়ীর সংখ্যা হ্রাস পায়। বেশিরভাগ সাহাবি মদপান ছেড়ে দেন। একদিন ওসমান (রা.) তার বাসায় খাবারের দাওয়াতে আয়োজন করেন। খানা শেষে তাদের রীতি অনুযায়ী মদ পানে উন্মাদ হয়ে ওঠেন অনেকে। উন্মাদনায় সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) আনসারদের দোষারোপ করে কবিতা আবৃত্তি করেন। এতে আনসারী এক যুবক রাগ করে তার মাথায় ছুড়ে মারেন উটের গাদেশের একটি হাড়। এতে তিনি গুরুতরভাবে জখম হন। পরে নবীজির কাছে অভিযোগ দায়ের করলে নবীজি আল্লাহর কাছে মোনাজাতে আঁখি ভেজান। তখন আল্লাহ নাজিল করেন, হে মোমিনরা! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ণয়ক সব ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো। তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে। (সূরা মায়েদা : ৯০)। এই আয়াত নাজিল হলে রাসুল (সা.) এর সব সাহাবি মদ পান ছেড়ে দেয়। এমনকি মদের পাত্র পর্যন্ত ভেঙে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে। তাদের হৃদয়ের উঠান থেকে চিরতের মুছে যায় মদের নাম। নেশার জগৎ। আল্লাহর প্রতি বিশ^াস, রাসুল (সা.) এর প্রতি ভালোবাসর সঙ্গে কখনও মদ থাকতে পারে না। আল্লাহ ও নবীর প্রেম আর মদ; সম্পূর্ণ দুই মেরুর। মানব হৃদয় থেকে মদের প্রভাব ছিন্ন করার জন্য ইসলাম যে দিকদর্শন দিয়েছে, হৃদয়ের উর্বর জমিনে ঈমান নামক যে মধুর সজীব ফসল ফলন করেছে এমন ফসল ফলাতে পারলে মানব মাঝে মদের কোনো গন্ধ থাকবে না। মানব জনম হবে আলোকিত। আলোড়িত। সুন্দরের মিছিলে দেশ হবে তারাভরা আকাশ। মাদকসেবীর জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে শাস্তির বিধান। ইসলামী আইনে মাদকসেবন ফৌজদারি অপরাধরূপে গণ্য। মাদকসেবীকে ইসলামী আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। কোরআন মজিদে এর কোনো শাস্তির উল্লেখ নেই। কিন্তু ফকিহবিদরা এ ব্যাপারে একমত যে, মদ্যপায়ীর শাস্তি হচ্ছে দোররা। দোররা কতটা মারতে হবে বা কী পরিমাণ, এতে ইমামদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালেক (রহ.) এর মতে, মদ্যপায়ীর শাস্তি হচ্ছে আশি দোররা। তারা তাদের মতের স্বপক্ষে ওমর ফারুক (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হাদিস দারা দলিল পেশ করেন। মদ্যপানের হালকাতম শাস্তি হচ্ছে আশি দোররা।(মুসলিম : ১৭০৬)। ইমাম শাফি (রহ.) এর মতে মদ্যপানের শাস্তি হচ্ছে চল্লিশ দোররা। তারা দলিল দেন আনাস বিন মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস দ্বারা। আনাস (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) মদ্যপানের শাস্তি হিসেবে জুতো বা বেত দিয়ে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করতেন। (বোখারি : ৬৩৯১)। আমাদের উচিত, অনাগত প্রজন্মকে সুন্দর পৃথিবী উপহার দিয়ে যাওয়া। নিরাপদ শহর তাদের হাতে তুলে দিয়ে বিদায় নেওয়া। কিন্তু আমরা যদি মরে যাওয়ার সময় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে না পারি, তাহলে পৃথিবী সভ্যতা হারিয়ে ইতিহাস স্বীকৃত এমন একটা অন্ধকার জগতে আবার চলে যাবে। আমাদের জীবন, আমাদের পৃথিবী সুস্থ নিরাপদ ও আলোকিত রাখতে হলে মাদককে না বলতে হবে। জীবন এবং পৃথিবীর ডায়েরি থেকে মুছে দিতে হবে ধ্বংসাত্মক মাদকের নাম। জীবনকে নিষিদ্ধ আঁধারে কলঙ্কিত করার আগেই জালাতে হবে আলোর মশাল। পবিত্রতার ঘ্রাণ ছড়াতে হবে পৃথিবীর পাড়া মহল্লায়। এ ঘ্রাণ গায়ে মেখে সবাইকে নিয়ে যেতে হবে আলোর মিছিলে। সুন্দরের এ মানুষেরা পৃথিবীর মাজারে ফেরি করে বেড়াবে মহাসত্যের গান। সভ্যতার প্রদীপ্ত আলো।