প্রকাশ : 2018-07-19

মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াক

তসলিমা নাসরিন :নিউইয়র্কের অল্প যে কজন বাঙালিকে চিনি, তাঁরা কেউ পশ্চিমবঙ্গের, কেউ বাংলাদেশের। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সম্পর্কে একটু খোঁজ নিলেই তথ্য বেরিয়ে আসে, বাপ ঠাকুর্দার বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গে, দেশ ভাগের সময় বা ষাট-সত্তরের দশকে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। কিন্তু পূর্ববঙ্গে ফেলে আসা ভিটেমাটি, ঘরবাড়ি, আম কাঁঠালের বাগান, পুকুর ভরা মাছ আর গোলা ভরা ধানের কথা মনে করে তাঁরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেও ওখানকার মানুষের সঙ্গে ওঠা বসা করতে মোটেও রাজি নন। যথাসম্ভব নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেই চলাফেরা করেন। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা বাংলাদেশের মুসলমানদের শুধু এড়িয়ে চলেন না, বাংলাদেশের হিন্দুদেরও এড়িয়ে চলেন। দুই বাংলার হিন্দুদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয় না কেন, এ নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। আমার মনে হয় শ্রেণীর তফাতের কারণেই পুব আর পশ্চিমের বাঙালির মধ্যে, ওপারের হিন্দু আর এপারের মুসলমানের মধ্যে, এমনকী ওপারের হিন্দু আর এপারের হিন্দুর মধ্যে সখ্য গড়ে ওঠে না। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা তুলনায় অবস্থাপন্ন, পেশায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর বিজ্ঞানী। বাংলাদেশের হিন্দুরা অধিকাংশই শ্রমিক। বাংলাদেশের হিন্দুরা মিশতে চাইলেও পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা তাঁদের সঙ্গে মিশতে চান না। অগত্যা বাংলাদেশের হিন্দু বাংলাদেশের মুসলমানের সঙ্গেই মেশেন। দুই বাংলার হিন্দুর মধ্যে ভাষা আর সংস্কৃতির যত মিল, তার চেয়ে আমার মনে হয়, বেশি মিল বাংলাদেশের হিন্দু আর বাংলাদেশের মুসলমানের মধ্যে। ধর্মচর্চাটুকু বাদ দিলে বাকি সব—লুঙ্গি গেঞ্জি, শুঁটকি ভর্তা, শেষ পাতের ডাল, দুপুরের ঘুম, অতিথিপরায়ণতা সবই মেলে বাংলাদেশের হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের। ধর্মচর্চারও বিবর্তন হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের পুজোর উৎসব বাংলাদেশের পুজোর উৎসবের চেয়ে ভিন্ন হচ্ছে দিন দিন। আজ যা বলার জন্য আমি এসেছি, তা হলো, গত সপ্তাহে ‘হাবেলি’ নামে কুইন্সের একটি ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁয় আমাকে নিমন্ত্রণ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের এক বাঙালি। আরও একজনকেও নেমন্তন্ন করা হয়েছে। তিনি তথাগত রায়। সাবেক বিজেপি নেতা, এখন ত্রিপুরার গভর্নর। রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখি তিরিশ চল্লিশ জন লোক। ওঁরা বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ—মূলত দুই বাংলার হিন্দু। পরস্পরকে ভালোবেসে তাঁরা একজোট হয়েছিলেন, তা কিন্তু নয়। যদিও ভারতীয় জনতা পার্টির আদর্শকে দুই বাংলার হিন্দুই সমর্থন করেন। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিও দুই অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে সখ্য গড়ে তোলায় ভূমিকা রাখতে পারেনি। হাবেলিতে দুই অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যেও ছিল স্পষ্ট এক বিভাজন। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের হিন্দুদের পাশে দাঁড়ালেও, সামাজিকভাবে দূরে সরিয়েই রেখেছে। বাংলাদেশের হিন্দুরা তাঁদের দুঃখ দুর্দশার কথা সবাইকে জানাবেন, সম্ভবত এই উদ্দেশেই রেস্তোরাঁটিতে গিয়েছেন। তথাগত রায়ের পূর্বপুরুষ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোক। তথাগত রায়, আমার মনে হয়, ভারতীয়দের মধ্যে, বাংলাদেশী হিন্দুদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি সরব। তাঁকেই যদি বাংলাদেশী হিন্দুরা নিজেদের দুর্ভোগের কথা জানাতে পারেন, হয়তো তিনিই বর্তমান সরকারকে বলে কয়ে দুর্ভোগ দূর করার চেষ্টা করবেন! তথাগত বাবু রেস্তোরাঁয় ঢোকার আগেই বাংলাদেশের কয়েকজন হিন্দু উপস্থিত সকলের উদ্দেশে বর্ণনা করলেন মুসলমানরা তাঁদের কী করে অত্যাচার করছে বাংলাদেশে, কী করে তাঁদের বাড়ি ঘর পোড়াচ্ছে, জমি জমা কেড়ে নিচ্ছে, দোকানপাট লুট করছে, মঠ মন্দির ভেঙে ফেলছে। বর্ণনা করলেন, কী করে হিন্দুরা বাধ্য হচ্ছে দেশ ত্যাগ করতে। ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, এ নিয়ে হিন্দু-প্রধান দেশ ভারতের কোনও প্রতিক্রিয়া নেই কেন, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদেরও কেন কোনও হেলদোল নেই, কেন কেউ রা শব্দ করে না। কেন পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা পূর্ব বাংলায় ফেলে আসা তাঁদের চমৎকার জমিদারির স্মৃতি চারণ করেন, কেন উল্লেখ করেন না, মুসলমানের মার খেয়ে পালিয়েছেন দেশ ছেড়ে! দু’একজন হিন্দুর কণ্ঠ থেকে স্পষ্টতই মুসলিম-বিদ্বেষ ঝরে পড়ে। তথাগত রায় ভালো বক্তা। যা বলতে চান, তা বেশ গুছিয়ে বলতে পারেন। সেদিন তিনি যা বললেন, তা হলো, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের লড়াই করতে হবে বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুদের জন্য। এ ছাড়া বাংলাদেশের হিন্দুদের দুর্দশা ঘোচানোর আর কোনও পথ নেই। মারাঠী হিন্দু, তেলুগু হিন্দু, রাজস্থানী হিন্দু, বিহারি হিন্দু, পাঞ্জাবী হিন্দু, কন্নড় হিন্দু, —কেউ বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের দুঃখ ততটা অনুভব করবেন না, যতটা অনুভব করবেন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু। কারণ তাঁরাই তাঁদের আত্মীয়, তাঁরাই স্বজন। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা বাংলাদেশের বাঙালি হিন্দুদের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন করলে ভারত সরকার চাপ সৃষ্টি করবেন বাংলাদেশের সরকারের ওপর। এতেই যদি বাংলাদেশ সরকার সমস্যার সমাধান করেন। তথাগত রায় বারবারই বললেন, হিন্দুদের দাঁড়াতে হবে হিন্দুদের পাশে, এ ছাড়া হিন্দুদের বাঁচার কোনও পথ নেই। হিন্দু জনসংখ্যা যে হারে কমছে, এ ভাবে কমতে থাকলে শূন্য হতে আর বেশি দেরি নেই। আমি একমত হইনি তথাগত রায়ের সঙ্গে। বলেছি, বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হয়, এ মোটেও অজানা নয়, এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানই সংখ্যালঘু হিন্দুদের আত্মীয়, স্বজন। সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশের নাগরিক। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের। অথচ হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিলেও ধর্মান্ধ জিহাদিদের বিরুদ্ধে কোনও সরকারই কোনও ব্যবস্থা নেননি। মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল লেখক প্রকাশক ব্লগারদের এক এক করে খুন করে ফেললেও ধর্মান্ধ জিহাদিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সরকার সমর্থকরা বরং ধর্মান্ধদের নিয়ে ওলামা লীগ নামে একটি দল তৈরি করেছেন। হিন্দুদের ঘৃণা করার জন্য, মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলার জন্য, দিন রাত মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করছেন কোনো কোনো পীর হুজুর। নিরীহ কিশোর-তরুণদের বেহেস্তের লোভ দেখিয়ে মগজধোলাই করছেন। সবকিছু জানার পরও এঁদের ওয়াজ বন্ধ করার কোনও ব্যবস্থা সরকার আজও নেননি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে খুব পছন্দ ভারতের। দু’চারজন যুদ্ধাপরাধী রাজাকারকে ফাঁসিতে চড়িয়েছেন বলে হাসিনাকে মৌলবাদবিরোধী শক্তি বলে ভাবার কোনও কারণ নেই। হিন্দুদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা বাংলাদেশের কোনও সরকার করেননি। কিন্তু করতে হবে। দেশের মানুষ— যাঁরা গণতন্ত্রে, মানবাধিকারে, ধর্মনিরপেক্ষতায়, অসাম্প্রদায়িকতায়, বাক স্বাধীনতায়, মানবতায় বিশ্বাস করেন, তাঁদেরই উদ্যোগ নিতে হবে সমাজ বদলাবার, রাষ্ট্রধর্মকে বিদেয় করার, সংবিধানকে সেক্যুলার করার। প্রগতিশীল মানুষের সংখ্যা বাড়লেই হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তথাগত রায়ের মূল বক্তব্য, হিন্দুদের দাঁড়াতে হবে হিন্দুদের পাশে। শুনে মনে হলো, বাংলাদেশের মুসলমান ছ’ মিটার দূরে পাশের বাড়ির হিন্দুর ওপর অত্যাচার হলে মোটেও ফিরে তাকায় না, কিন্তু ছ’ হাজার কিলোমিটার দূরে গাজার মুসলমানের ওপর অত্যাচার হলে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় বেরোয়। জিহাদিরা যেমন মুসলমানদের বলে মুসলমানের পাশে দাঁড়াতে, তেমনি তিনি হিন্দুদের বলছেন হিন্দুদের পাশে দাঁড়াতে। হিন্দু মৌলবাদিদের দেখেছি মুসলিম মৌলবাদিদের অনুসরণ করতে। মুসলিম মৌলবাদিদের তাঁরা ঘৃণা করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের আদর্শ মেনে চলতে মোটেও দ্বিধা করেন না। মুসলিম ভ্রাতৃত্ব যেমন সংকীর্ণ মনের পরিচয় দেয়, হিন্দু ভ্রাতৃত্বও তেমন সংকীর্ণ মনের পরিচয় দেয়। তথাগত রায়ের বক্তব্য খণ্ডন করে আমি বলেছি, হিন্দুকে হিন্দুর পাশে, মুসলমানকে মুসলমানের পাশে, ইহুদিকে ইহুদির পাশে, খ্রিস্টানকে খ্রিস্টানের পাশে দাঁড়াতে হবে—এ বড় ক্ষুদ্র, উগ্র, ধর্মসর্বস্ব ভাবনা। আমি হিন্দু নই, হিন্দু ধর্মে আমি বিশ্বাস করি না, কিন্তু নির্যাতিত হিন্দুদের পাশে আমি দাঁড়াই। নির্যাতিত মুসলমান, নির্যাতিত ইহুদি খ্রিস্টান, নির্যাতিত বৌদ্ধর পাশে দাঁড়াই। মানবতা এরই নাম। এরই নাম মনুষ্যত্ব। আসলে, মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে; সে মানুষ যে ধর্মের, যে বর্ণেরই হোক না কেন, যে জাতি, যে ভাষা, যে সংস্কৃতিই তার হোক না কেন। মানুষ যেন মানুষের পাশে দাঁড়ায়—এমন সমাজই আমাদের তৈরি করতে হবে। হিংস্রতা, ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা ভুলে আমরা যেন গণতন্ত্রে, মানবাধিকারে, পরোপকারে বিশ্বাস করি। শুধু নিজের গোষ্ঠীর লোক নির্যাতিত হলেই প্রতিবাদ করবো, অন্য কারও দুঃখ দুর্দশা ঘোচাতে চাইবো না—এই ক্ষুদ্রতা কোনও সম্প্রদায়কে মহান করে না। বাংলাদেশের নির্যাতিত হিন্দুর পাশে শুধু ভারতের হিন্দু কেন, সারা পৃথিবীর মানুষকে দাঁড়াতে হবে, হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম খ্রিস্টান ইহুদি নাস্তিক সবাইকে দাঁড়াতে হবে, মানবতার জন্য দাঁড়াতে হবে। শুধু ধর্ম বিশ্বাস ভিন্ন বলে কারও ওপর অন্যায় করার অধিকার কারও নেই বলে দাঁড়াতে হবে। ভারত সরকারকে দিয়ে বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে কেন? বাংলাদেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তাবোধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব বাংলাদেশের সরকারের। বাংলাদেশের মানুষই নিরাপত্তা হবে বাংলাদেশের মানুষের। মানুষ যদি অমানুষ হয়ে ওঠে, তাহলে দেশের সরকারের পক্ষে দুরূহ হয়ে ওঠে অমানুষকে মানুষ করা। যারা নিজেরা শুদ্ধ হতে, নিজেরা সৎ হতে, সহিষ্ণু হতে, সমমর্মী হতে, সমব্যথী হতে, মোদ্দা কথা মানুষ হতে অসমর্থ, বাইরের কোনও শক্তির চাপে তারা মানুষ হবে, এ অসম্ভব। বাংলাদেশের হিন্দুরা বাইরের হস্তক্ষেপ চাইছেন। বাইরের হস্তক্ষেপের চাইতে ঘরের ভেতর সামাজিক আন্দোলন অনেক বেশি জরুরি।বাংলাদেশ প্রতিদিন লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।