প্রকাশ : 2017-12-14

ত্যাগের মাধ্যমেই দলের সর্বস্তরে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে :প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, আমরা পুনরায় নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসব ইনশা আল্লাহ এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের গতি অব্যাহত থাকবে। মঙ্গলবার রাতে ফ্রান্সের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্যারিস লা গ্রান্ডে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে আগামী সংসদ নির্বাচনে জিততে সব স্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্য জোরদার করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করব। কারণ, জনগণ আমাদের পক্ষে রয়েছে। জনগণ আমাদের ভোট দেয়ার জন্য প্রস্তুত। তাই আমাদের সাবধান থাকতে হবে, যাতে কেউ নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে না পারে। আওয়ামী লীগের ফ্রান্স শাখা ওই সংবর্ধনার আয়োজন করে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেনসহ ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা প্রায় ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত এ সংবর্ধনায় যোগ দেন। একই হোটেলে বুধবার সকালে শেখ হাসিনা ফ্রান্সের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফরাসি বিনিয়োগের বিপুল সুযোগ রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের জন্য ফরাসি কোম্পানিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ত্যাগের মাধ্যমেই দলের সর্বস্তরে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। দলের মধ্যে বিভাজন ষড়যন্ত্রকারীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু সবাই একতাবদ্ধ থাকলে সে সুযোগ তারা পাবে না। শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করা শক্তি যেন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, তাদের লুটপাট, খুন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষকে সজাগ করতে হবে। তাদের ক্ষমতায় আসা মানে আবার মানুষ খুন করা, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা, লুটপাট করা। প্রবাসীদের এ সময় দেশে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন করারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ৩০ বছর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি দেশ শাসন করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অথচ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই দেশের মানুষ উন্নয়নের প্রকৃত স্বাদ পায়। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের চ্যাম্পিয়ন দাবি করে অথচ তারা আসলে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসিত করেছিল এবং দেশে কারফিউয়ের গণতন্ত্র চালু করেছিল। বিএনপি দেশের ইতিহাসকে বিকৃত করে পুরো একটি প্রজন্মকেই দেশের প্রকৃত ইতিহাস জানা থেকে বিরত রাখে। তারা বঙ্গবন্ধু এবং তার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকলে স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বে একটি উন্নতসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেত। জাতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রবাসীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবিতে সুইডেনে প্রথম সভা হয়েছিল, যেখানে বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানাও ছিলেন। তিনি বলেন, প্রবাসীরা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এবং দেশকে মুক্ত করায় সর্বদা ভূমিকা পালন করে এবং দেশের অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল রাখে। শেখ হাসিনা বিশেষ করে সাবেক সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, তাদের সহযোগিতা সবসময়ই তাকে (শেখ হাসিনা) শক্তি ও সাহস জোগায়। তার সরকারের শাসনামলে বাংলাদেশ এবং ফ্রান্সের সম্পর্ক প্রতিটি ক্ষেত্রেই আরো জোরদার হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটও ফ্রান্সের একটি কোম্পানি তৈরি করছে এবং ২০১৮ সালের মার্চে এটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে। শেখ হাসিনা তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে বলেন, সরকার এই মেয়াদে অবশিষ্ট উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, দেশের অগ্রগতির স্বার্থে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জয়লাভ করতে হবে। ফরাসি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব : ফ্রান্সের বৃহত্তম নিয়োগকারী ফেডারেশন মুভমেন্ট অব দি এন্টারপ্রাইজেস অব ফ্রান্স (এমইডিইএফ) ফ্রান্সের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতঃরাশ বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশকে সার্বিকভাবে শিল্পায়িত করতে আমরা দেশজুড়ে একশটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। আমি মনে করি প্রচলিত বাণিজ্যিক ক্ষেত্র ছাড়াও বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামুদ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও আরও ফরাসি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ফ্রান্সের বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। আর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, আপনাদের যেমন প্রতিযোগিতামূলক বিকল্প উৎস খোঁজা দরকার, তেমনি আমাদেরও রফতানি গন্তব্য বহুমুখী করা প্রয়োজন। আর এ দুইয়ের সমন্বয় আমাদের দুদেশের জন্যই লাভজনক অংশীদারিত্বের একটি যথার্থ পরিবেশ তৈরি করবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছর বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৪৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে সহযোগিতার সম্ভাবনাময় নতুন নতুন ক্ষেত্র নিয়ে ভাবার এটি একটি উপযুক্ত সময়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সুযোগ ও সম্ভাবনার দেশ, যার বৈদেশিক বিনিয়োগ ও বাণিজ্যনীতি এ অঞ্চলের অন্যতম সেরা বন্ধুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, অনেক সমস্যা সত্ত্বেও বাংলাদেশ গত বছর ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, যা বিপুল সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বেড়েছে দেখে উৎসাহিত বোধ করছেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যকার দ্বিমুখী বাণিজ্যের পরিমাণ ২০০ কোটি মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গাদের কারণে পরিবেশে মারাত্মক ক্ষতি : মঙ্গলবার প্যারিসে ওয়ান প্লানেট সামিটে উচ্চপর্যায়ের সভায় দেয়া বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আসার ফলে বাংলাদেশ বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বন ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজনের ওপর মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, মানবিক কারণে আমরা কক্সবাজারে এক হাজার ৭৮৩ হেক্টর বনভূমির ওপর তাদের আশ্রয় দিয়েছি। শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যদিও এই ঝুঁকির জন্য আমরা দায়ী নই। তিনি বলেন, আমরা সীমিত সম্পদ নিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের পরিণতি প্রশমন ও অভিযোজন করে যাচ্ছি। শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রণীত টেকসই উন্নয়ন কৌশলের মূলসে াতে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবেলায় জিডিপির ১ শতাংশ ব্যয় করে আসছে। সব অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশ কর্মকাণ্ডে ওয়াটার সাসটেইনেবিলিটি ইস্যুকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শেখ হাসিনা জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারপূরণ এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, একমাত্র দায়িত্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে আমরা বিশ্বকে নিরাপদ করতে পারি। আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার ও কর্মকাণ্ড শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে।

জাতীয় পাতার আরো খবর