প্রকাশ : 2018-07-27

অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জই বিএনপির জন্য ভোটযুদ্ধ

পীর হাবিবুর রহমান :আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল সংবর্ধনা দিয়েছে। গোছানো, সুশৃঙ্খল, আড়ম্বরপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য এ সংবর্ধনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তিনি সংবর্ধনা চান না, জনগণের সেবক হয়ে থাকতে চান। মৃত্যুর আগে মরে যেতে রাজি নন, আমৃত্যু মানুষের সেবা করে যেতে চান।’ তার বক্তব্যে পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের বিয়োগান্ত ঘটনা, আন্দোলন-সংগ্রাম, উত্থান-পতনের চিত্রপট তুলে ধরে তার টানা প্রায় ১০ বছরের শাসনামলে যে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ করেছেন, তার চিত্রপটও তুলে ধরেছেন। তিনি আগামী জাতীয় নির্বাচনে মানুষের মুক্তির জন্য আবারও নৌকা মার্কায় দেশবাসীকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে এ সংবর্ধনা সভায় বর্ণিল সাজে কর্মীরা এসেছিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগ এ সংবর্ধনা দিলেও পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে বলা যায়, এটি ছিল কার্যত এক ধরনের প্রাক-নির্বাচনী শোডাউন। ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বলা যায়, রাজনীতি সরগরম হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া আওয়ামী লীগের সংবর্ধনার আগের দিন বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে তাদের কারাবন্দী চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবিতে সমাবেশ করেছে। সেই সমাবেশে গ্রেফতার আতঙ্কসহ নানা ভয়ভীতি উপেক্ষা করে দলের নেতা-কর্মীর স্বতঃস্ফূর্ত ঢল নেমেছিল। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিষ্কার বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। আওয়ামী লীগ-বিএনপি ছাড়াও ড. কামাল হোসেন, অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও নাগরিক ঐক্যের যুক্তফ্রন্টও রাজনীতিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দুই দলের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্বে ভারসাম্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন। কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমও সংবাদ সম্মেলন করেছেন। রাজনীতি কার্যত এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসরমান। ভোটযুদ্ধের দিকে বল গড়িয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত ১০ বছর ধরে যে সুসময় বইছে তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে ওয়ান-ইলেভেনের মধ্য দিয়ে যে বিপর্যয় এসেছিল, জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের দমন-পীড়নের মুখে এবং নিজেদের হঠকারী, উগ্রপন্থা, অতীত আন্দোলন ও নির্বাচন বর্জনের কারণে কঠিন দুঃসময়ই নয়, করুণ পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছে। বলা যায় বিএনপির মহাদুর্দিন দুঃসময় রজনী যেন কাটছেই না। কবে কাটবে তা কেউ জানে না। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় কারাবন্দী। তার মুক্তি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সময় যত যাচ্ছে, সংশয় তত বাড়ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে এক যুগ ধরে নির্বাসিতই নন, আইনের চোখে তিনি একজন দণ্ডিত ফেরারি আসামি; যার নির্বাচনে অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। পাকিস্তানে যেখানে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত রাজনীতির প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে উচ্চ আদালত দ্বারা দণ্ডিত ও ক্ষমতা থেকে বরখাস্ত নওয়াজ শরিফ লন্ডনে তার স্ত্রীকে হাসপাতালের শয্যায় কোমায় রেখে কন্যাকে নিয়ে দেশে ফিরে কারাবরণের চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন, সেখানে একজন সেনাশাসক জিয়াউর রহমান ও রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে উঠে আসা গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হিসেবে দলীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকারিত্ব বহন করলেও নেতা-কর্মীদের দুঃসময়ে দেশে ফিরে তারেক রহমান সেই রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সাহস দেখাতে পারবেন, এমনটি কেউ মনে করছেন না। বিএনপি কার্যত এখন নেতৃত্বহীন অবস্থায় কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞ অসংখ্য নেতা বিএনপিতে থাকলেও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবতা বিবেচনায় তারা যে বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এগিয়ে যাবেন এমন সুযোগ আছে বলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন না। কারণ বিএনপি নেতা-কর্মীরা সরকারের অগ্নিরোষের মুখে প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কারাবন্দী খালেদা জিয়া নতুবা লন্ডন নির্বাসিত তারেক রহমানের কাছ থেকেই আসবে— এমনটাই সবাই মনে করেন। দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল ও বিএনপির শুভাকাঙ্ক্ষীরা যদিও মনে করেন, বিএনপি যেভাবেই হোক এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জরুরি। অনেকে যেমন মনে করেন বিএনপিকে এবার নির্বাচনের বাইরে রাখা যাবে না। তারা অংশগ্রহণ করবে। তবু বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের কারণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকেই যায়, কিছু প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। বিএনপি আসলে কী চায়? সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের রূপরেখা ঘোষণা না করলেও তারা বলে আসছেন, সহায়ক সরকারের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে যাবেন, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাবেন না। এ দাবির সঙ্গে এখন বড় আকারে তারা বলছেন, তাদের কারাবন্দী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। এমনকি বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়েও তাদের প্রশ্ন রয়েছে। দুটি দাবির সামনে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারের মনোভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচনের আগে মুক্তি বা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়ার মতো উদার মনোভাব সরকারি দল রাখছে না। বিএনপি সংলাপের জন্য সরকারকে নিরন্তর তাগিদ দিয়ে এলেও সর্বশেষ আরেক দফা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নাকচ করে দিয়েছেন। বলেছেন, নির্বাচনের আগে সংলাপের সুযোগ নেই। এমনকি নির্বাচনের সময় নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে বিএনপির কট্টর সমর্থক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দেওয়ার যে প্রস্তাব করেছেন ওবায়দুল কাদের তাও নাকচ করে সংবিধানের দোহাই দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা খোলাসা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংসদের প্রতিনিধিত্বশীল দলগুলোই নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে থাকবে। তার মানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে এরশাদের জাতীয় পার্টির নেতারাই ঠাঁই পাচ্ছেন না; এক নেতার দল জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও জেপি প্রধানরাও থাকছেন। কিন্তু দেশের জনপ্রিয় সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিকে এখন আর সরকার সেই সুযোগ দিচ্ছে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে গণভবনে আলোচনার দাওয়াত করেছিলেন। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় বিএনপিকে দিতে চেয়েছিলেন। কোন অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনে, পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে বিএনপি সে প্রস্তাব নাকচই করেনি, সহিংস হরতাল-অবরোধের পথ নিয়ে নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিল। এই লেখা যখন লিখছি, তখন দিল্লি সরকারের আমন্ত্রণে বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সুনীল শুভরায় ও মেজর (অব.) খালেদকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। দিল্লিতে এখন এরশাদের জাতীয় পার্টিরও কদর বেড়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও বড় প্রতিনিধি দল নিয়ে দিল্লি সরকারের আতিথেয়তা নিয়ে এসেছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম তো দিল্লি বসে বলেই দিলেন বিএনপির প্রতি তাদের মনোভাব কী! এদিকে বিএনপি নেতারা কিছুদিন আগে দিল্লি সফর করে নানা মহলের সঙ্গে বৈঠক করে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সহায়তা চেয়েছেন। এমনকি তাদের ক্ষমতার সময় ভারতের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে এ দেশের মাটিকে সন্ত্রাসবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেভাবে ব্যবহার করেছিল তার জন্য অনেকটা অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমতায় এলে ভারতের স্বার্থরক্ষায় বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর আকুতিও জানিয়েছেন। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গত্যাগের পরামর্শ সেখানে দেওয়া হলেও বিএনপির জন্য দিল্লি এখনো বহু দূরস্থ। অথচ ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি এতই অন্ধ অহমিকায় ছিল যে, ছাত্রশিবিরের হরতালের জন্য ঢাকা সফররত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত খালেদা জিয়ার বৈঠকটিও বাতিল করে দেয়। শত ভুলের চড়া মাশুল গুনছে এখন বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে রাজনীতিতে বিএনপি সরকারবিরোধী গণজোয়ার তৈরি করেছিল। দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থীদের বিএনপির আনকোরা প্রার্থীরা পরাজিত করেছিলেন। সেই নির্বাচন বর্জন ও ওয়াকওভার পেয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সংবিধানের দোহাই দিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সব প্রশ্নকে উড়িয়ে দিয়ে শাসন ক্ষমতায় একচ্ছত্র দাপটই তৈরি করেনি, সব ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারই করেনি, সমাজের দোদুল্যমান অংশকেও পক্ষে টেনেছে। হরতাল-অবরোধমুক্ত শাসনব্যবস্থা উপহার দিয়ে ব্যবসায়ীদের সমর্থনও আদায় করেছে। অন্যদিকে হাজার হাজার মামলায় বিএনপি নেতা-কর্মীরা এতই নাজেহাল হয়েছেন যে, সাংগঠনিকভাবে বিএনপি কার্যত আর মাঠেই নামতে পারেনি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গণরায়ে দুবার এবং সাংবিধানিকভাবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হলেও তার কারাবন্দী জীবনের সামনে বিএনপি অসহায়ের মতো চোখের জল ফেলেছে। রাজনীতিতে কৌশলের পথ যেমন নিতে পারেনি, তেমন ব্যাপক গণআন্দোলনে সরকারের মসনদ নাড়িয়েও দিতে পারেনি। প্রতি বছর লাখো কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়, ব্যাংকিং খাতে অবাধ লুণ্ঠন ঘটে যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায়, এমনকি সর্বশেষ দিনাজপুরে ২০০ কোটি টাকার কয়লা তামাদি হয়ে যায়। এসব নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ থাকলেও মামলার জালে আটকে থাকা বিএনপি নেতা-কর্মীরা যেমন জনগণকে নিয়ে প্রতিবাদ-আন্দোলন গড়তে পারেননি, তেমন একের পর এক সিটি করপোরেশনে লড়াই করে জিততে পারেননি। সামনে রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে। সেখানেও ভোটযুদ্ধে নেমে অভিযোগের পাহাড় গড়ছে। প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে তুলতে পারছে না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে মাঝখানে শাসক দল শেখ হাসিনার উন্নয়নের ইমেজ গণমানুষের কাছে জোরেশোরে প্রচার করার সুযোগ পাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গোটা ময়দানে আওয়ামী লীগ বিএনপির অস্তিত্বকে ধূসর করে দিয়ে একাই খেলছে। বিভিন্ন জায়গায় শাসক দলের কিছু সিন্ডিকেট বা উন্নাসিক নেতা-কর্মীর আচরণে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অসন্তোষ ব্যক্ত করলেও বিএনপি স্থানীয়ভাবে সেই অপকর্মগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা দূরে থাক, উল্টো স্থানীয় ক্ষমতাবানদের সঙ্গে মিলেমিশে পথ চলছে। পরিস্থিতি এমন যে, বিএনপি নির্বাচনে আসুক বা না আসুক তাতে সরকারের কিছু যায় আসে না— এ মনোভাব শাসক দলের নেতাদের বক্তব্যে প্রকট হচ্ছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ২০টির বেশি আসন পাবে না। এটা রাজনৈতিক বক্তৃতা। ২০১৪ সালের প্রেক্ষাপট আর আজকের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিএনপি ড. কামাল হোসেনের মুখে তোলা জাতীয় ঐক্যের স্লোগান যতই দিক, নির্বাচন সামনে রেখে এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগ ১৪ দল ও মহাজোট নিয়ে সেক্যুলার রাজনীতির তুরুপের তাস ও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবজনক ধারাকে নিয়ে নিজেদের শাসন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। একসময় সেই জানুয়ারির আগে মানুষ বলত নির্বাচনে ক্ষমতায় আসবে বিএনপি। আর এখন ২০১৮ সালের ভোটযুদ্ধ সামনে রেখে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মীও বিশ্বাস করছেন শেখ হাসিনাই আরেকবার ক্ষমতায় আসবেন। আওয়ামী লীগ ’৭৫-পরবর্তী সেনাশাসন জমানায় করুণ অবস্থার মুখে পড়েছিল। ১৯৭৯ সালের সেনাশাসক জিয়ার সংসদ নির্বাচনে প্রথমে বর্জন করে শেষ মুহূর্তে অংশ নিলেও ৩৯টি আসন নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের জায়গা থেকে সরব ছিল। সেই নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা ছিলেন কারাগারে। সামরিক আদালতের দণ্ডে দণ্ডিত হয়ে আবদুস সামাদ আজাদের মতো নেতারা নির্বাচন করতে পারেননি। আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল মালেক উকিলকে জয়ী হতে দেওয়া হয়নি। দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক নির্বাচনে প্রার্থী হননি। ভোলার জনপ্রিয় নেতা ও দলের সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদকে জোর করে হারানো হয়েছিল। মিডিয়া ক্যুর সেই নির্বাচনও আওয়ামী লীগ হজম করেছিল রাজনৈতিক কৌশলে ঘুড়ে দাঁড়াতে। রাজনীতিতে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী বাংলাদেশের জনপ্রিয় দলটি ক্ষমতায় আসতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে সভাপতি করে দীর্ঘ ২১ বছর সংগ্রামের পথ হেঁটেছে। সেনাশাসক এরশাদের ’৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়েও আওয়ামী লীগ ৭৫টির মতো আসন লাভ করেছিল। সেই ভোট ডাকাতির নির্বাচনের চিত্র এখনো মানুষের চোখের সামনে। এটা সত্য, দেশের মানুষ সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনব্যবস্থা ইয়াজ উদ্দিন ইস্যুতে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে মুুছে নিলেও এখন অবস্থা সেই জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে জনমত আর সেই সরকারের দাবিতে নেই। জনমত সংগঠিত করে তীব্র আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানে সাফল্য কুড়াতে যে কারণেই হোক বিএনপি ব্যর্থই হয়নি, এখন কার্যত ক্ষমতায় আসার চেয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও বিএনপি সংসদে ২৯টি আসন নিয়ে বিরোধী দলে বসেছিল। এতে সংসদ শক্তি নিয়েই মানুষের সামনে দৃশ্যমান ছিল। বিএনপিরও রাজনীতিতে নিজেদের এত করুণ পরিণতি দেখতে হয়নি। গণমাধ্যম প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতার খবরকেও গুরুত্বসহকারে ঠাঁই দিয়েছে। কিন্তু ৫ জানুয়ারির পর পাঁচ বছর যে সংসদ সেটি ওয়াকআউট বর্জনের সরগরমে না হলেও মানুষের কাছে সরকারি দলের একচ্ছত্র সংসদ হিসেবে দৃশ্যমান হয়েছে। বিরোধী দল সংসদীয় রাজনীতির বিরোধী দলের চেহারা দেখাতে পারেনি। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজনৈতিক দল কংগ্রেস টানা ১০ বছর দেশ শাসনের পর বিগত নির্বাচনে এমন ভরাডুবির মুখে পড়েছিল যে সাংবিধানিকভাবে বিরোধী দলের মর্যাদাই পাচ্ছিল না। তবু নরেন্দ্র মোদির শক্তিশালী বিজেপি সরকারকে লোকসভায় ঘাম ঝরিয়ে ছাড়েন গান্ধী পরিবারের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের এমপিরা। কয়েকদিন আগে লোকসভায় রাহুল গান্ধী তুমুল বিতর্কে বিজেপি সরকার ও নরেন্দ্র মোদিকে তুলাধোনা করে দিয়েছেন। বক্তব্যের শেষে তিনি মোদির কাছে গিয়ে যখন জড়িয়ে ধরেন তখন ক্যারিশমাটিক নরেন্দ্র মোদি হতবিহ্বল হয়ে যান। রাহুল ফিরে আসার সময় ফের ডেকে তার পিঠ চাপড়ে দেন। রাহুলের পর নরেন্দ্র মোদিরও দীর্ঘ বক্তৃতায় পাই পাই জবাব দিতে হয়েছে। তুমুল বিতর্ক, হট্টগোল ও আনন্দধ্বনিতে ভারতের পার্লামেন্ট সেদিন প্রাণবন্ত ছিল। গণতন্ত্রের নবযাত্রায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আমরা ১৯৯১ সালের প্রাণবন্ত সংসদ ও মধ্যরজনীতে দুই নেত্রীর হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখেছি। সংসদ কাভার করতে গিয়ে একেক ইস্যুতে পার্লামেন্টারিয়ানরা তুমুল বিতর্ক করেছেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে আবদুর রহমান বিশ্বাস ছিলেন স্পিকার। প্রবীণ পার্লামেন্টারিয়ান প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হাউস থেকে বের করে দিতে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মসকে তলব করেছিলেন। মাগরিবের বিরতির পর নামাজ শেষে অধিবেশনকক্ষে বিরোধী দলের নেত্রী প্রবেশ করেই এ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। বিরোধী দলের উপনেতা মরহুম আবদুস সামাদ আজাদ নাজমুল হুদাকে বেহুদা বলে সংসদ মাতিয়েছিলেন। সরকারে বিএনপি বিরোধী দলে আওয়ামী লীগ কারাগারে থেকে পাঁচ আসনে বিজয়ী এরশাদের জাতীয় পার্টিও ৩৫টি আসন নিয়ে দুই পক্ষের স্বৈরাচার গালি খেয়ে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিল। ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ফাঁসিতে দণ্ডিত এনডিএফের সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও সরব ছিলেন। বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাগ্মিতা ছিল ভারসাম্য রক্ষার কৌশলমুখী। তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনে সেই পার্লামেন্ট যেমন ছিল স্মরণীয়, তেমন স্পিকার হিসেবে শেখ রাজ্জাক আলীর ভূমিকা ইতিহাসে সোনার হরফে লেখার মতো। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে পাইকগাছার উকিলও বলেছিলেন। অধিবেশন থাক বা না থাক সংসদের বিরোধী দলের উপনেতা আবদুস সামাদ আজাদের অফিসে বিরোধী দলের সবাই মিলিত হতেন। সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের বিরোধী দলের নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকার রেকর্ড অনন্য, অসাধারণ। সেই সংসদ কাভার করতে গিয়ে আমাদেরও হাতের নাগালে সংবিধান যেমন থাকত, তেমন সংসদের কার্যপ্রণালিবিধি প্রায় মুখস্থ ছিল। পার্লামেন্ট রিপোর্টিংয়ে পার্লামেন্টারিয়ানরা আমাদের সহযোগিতাও করেছেন। স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সংসদে সুপরিসর মিডিয়া সেন্টার দেন। আর প্রখর হিউমার সেন্সে সংসদ জমিয়ে তুলতে স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের তুলনা তিনি নিজেই। চলমান সংসদ রাজনীতিতে আকর্ষণ ও গৌরবের নয়। আগামী জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দল ও নবীন-প্রবীণের বাগ্মিতায় ও হিউমার সেন্সে একটি কার্যকর প্রাণবন্ত সংসদ দেখতে চাই। সেই সংসদে সব দলের জাতীয়ভাবে আলোচিত নেতাদের ঠাঁই হোক। অলঙ্কারসমৃদ্ধ হোক সংসদ। বিএনপি বিরোধী দলে বসার জন্য হলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। শক্তিশালী সরকারের পাশাপাশি শক্তিশালী জনসমর্থনপুষ্ট বিরোধী দলের অস্তিত্ব সংসদে থাকলে সেই সংসদ হবে সব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সব আলোচনা, বিতর্ক সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। অতীতের ভুলভ্রান্তি থেকে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও আত্মোপলব্ধির পথে শুভচিন্তার উদয় ঘটিয়ে সুমহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়া রাজনীতিবিদদের অনিবার্য দায়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনীতিতে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে তা আরও সরগরম হয়ে উঠুক। সব দল ও প্রার্থী বিনা বাধায় নির্বাচনী প্রস্তুতির জন্য নির্দ্বিধায় সভা-সমাবেশ ও জনসংযোগের অধিকার ভোগ করুক। নির্বাচন কমিশনের জন্য জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আগামী তিন সিটির নির্বাচন যে অ্যাসিড টেস্ট এটি মাথায় নিয়েই সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ তাদের ফরজ। কমরেড ফরহাদ সেনাশাসনবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যের মিছিল থেকে আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব— এ স্লোগান তুলেছিলেন। আর সেই স্লোগান সারা বাংলায় জনপ্রিয় করেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে মানুষ যাকে খুশি বিনা বাধায় তাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাক। আর আমরা হরতাল-অবরোধ, গুম-খুন, দমন-পীড়নমুক্ত উদার গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের ঐতিহ্যের রাজনীতিতে ফিরি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, যেতে দিই। লুটেরাদের জিব টেনে ধরুক রাষ্ট্র। আইনের খড়্গ নামুক দুর্নীতিবাজদের গলায়। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে সবার ভাগ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত হলে ব্যালটেই জানা যায় জনমতে কার পাল্লা ভারী। এসব হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখেই বিএনপিকে রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াইয়ে, সংসদীয় রাজনীতির স্বার্থেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ জরুরি। কোনো চ্যালেঞ্জই বৃথা যায় না। ফলাফল দেরিতে হলেও জোটে। সমাজে, রাষ্ট্রে রাজনীতিতে কত অসংগতি দেখি। আপস করেই বাঁচি। নিদারুণ অন্তহীন দহনে দগ্ধ হই। বলাও যায় না, লেখাও যায় না। মানুষের বুকের আওয়াজ তবু শুনতে পাওয়া যায়। যাই হোক, রাজনৈতিক অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জেই বিএনপি নির্বাচনে আসুক। আমরা কার্যকর প্রাণবন্ত বিতর্কের ঝড় তোলা সংসদ উপভোগ করি। লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন