প্রকাশ : 2018-08-02

সরকারকে শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে হবে

কয়েক দিন ধরে যেটি ঘটছে, সেটি খুব দুর্ভাগ্যজনক। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হলো, যেটি খুব স্বাভাবিক, সেটিই ঘটানোর চেষ্টা করছে সন্তানরা। একটি অসম্ভব-অস্বাভাবিক ঘটনাকে স্বাভাবিক করার সংগ্রামে নেমেছে তারা। আমাদের গণপরিবহন অস্বাভাবিক গণপরিবহন। যেখানে সরকারের প্রধান ভূমিকা পালনের কথা ছিল, সেখানে ব্যক্তিগত মালিকানায় পুরো বিষয়টি তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা শুধু লাভের আশায় নিম্নমানের গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছে, যার ফিটনেস নেই। রুট পারমিটও নেই অনেক গাড়ির। আমি শুনলাম, যে গাড়িটি শিক্ষার্থীদের চাপা দিয়েছে, সেটির কোনো রুট পারমিট ছিল না। কম বয়সী এবং অত্যন্ত অদক্ষ চালক দিয়ে গাড়িগুলো চালানো হয়। একটি অকারণ প্রতিযোগিতা চালু করা হয়েছে, যত বেশি ট্রিপ দেওয়া যাবে, তত বেশি লাভ হবে। এতে করে এদের হাতে মানুষকে খুন করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। পৃথিবীর কোনো দেশে এটি আমি দেখিনি। যে গতিতে, যে বেপরোয়াভাবে বাসগুলো চলে, এটি অস্বাভাবিক। যেভাবে এই চালকরা ধরা পড়ে, তখন তাদের পাশে যেভাবে ইউনিয়নগুলো দাঁড়িয়ে যায়; আমাদের নৌপরিবহনমন্ত্রী দাঁড়িয়ে যান, এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। কোনো রাষ্ট্রে আমি এমনটি ঘটতে দেখিনি। এটি করলে একজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে, বাধ্যতামূলকভাবে। কারণ, তিনি সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী। তিনি সাংসদ, আইনপ্রণেতাও বটে। তিনি যখন আইন লঙ্ঘনকারীকে সমর্থনের জন্য দাঁড়িয়ে যান, তখন তিনি আইন চরমভাবে লঙ্ঘন করেন। আইনপ্রণেতারা কখনও আইন লঙ্ঘনকারী হতে পারেন না। এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা আমাদের দেশে স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তায় নেমে আমি নিরাপদে পথ চলব, এটিই স্বাভাবিক। এখন এটিই অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবখানে গণপরিবহনের একটি অংশ শিক্ষার্থীদের জন্য থাকে। সেটি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে নয়, অনুন্নত দেশেও দেখেছি। শিক্ষার্থীদের জন্য হলুদ রঙের পৃথক বাস থাকে, সেটি স্বাভাবিক। আমাদের দেশে এটি কোনোদিনও হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো বাস নেই। তাদের গণপরিবহনে মারামারি করে, অসম বয়সী অনেক যাত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে উঠতে হয়; এটি চূড়ান্তভাবে অস্বাভাবিক। দুটি শিশু মারা গেল, কী নিদারুণ হত্যাকাণ্ড! এটি মেনে নেওয়া এত কষ্টকর যে এই খবরটি পড়তে গিয়ে সবার চোখ জলে ভিজেছে। আমাদের মন্ত্রী এটি শুনে হাসলেন, এটি চূড়ান্তভাবে অস্বাভাবিক। এই মন্ত্রীরা, সাংসদরা, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গাড়ির মালিক হয়ে যাচ্ছেন; এদের না পারা যায় ছোঁয়া, না পারা যায় ধরা। এমনকি এদেরকে কোনোদিন যদি আদালতে নেওয়া হয়, তখন পক্ষে সমস্ত দেশের পরিবহন শ্রমিকরা দাঁড়িয়ে যায়। আমি একটার পর একটা অস্বাভাবিক কথা বলে যাচ্ছি। ভিআইপিদের গাড়িগুলো যখন উল্টো পথে চলে যায়, এমন অস্বাভাবিক ঘটনা পৃথিবীর কোথাও ঘটে না। ফুটপাত দখল হয়ে যায়। ধানমণ্ডির ইউল্যাব থেকে বাসা পর্যন্ত আমি গতকাল হেঁটে এলাম। দেখলাম, একটি বড় আবাসন প্রতিষ্ঠান ফুটপাত দখল করে তাদের কর্মকর্তাদের গাড়ি পার্ক করে রেখে দিয়েছে। ফুটপাতে গাড়ি, সেই গাড়ি পুলিশ ধরতে পারে না। ফুটপাতে মোটরসাইকেল উঠে যায়, সেগুলো পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফুটপাতে নির্মাণসামগ্রী পড়ে থাকে, সেখানে তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এখন এই শিশু-কিশোররা রাজপথে নেমেছে অস্বাভাবিক অবস্থাকে স্বাভাবিক করতে। এটি আমার ভাবতে অবাক লাগে, যে বিষয়টি নিয়ে তাদের আন্দোলনে নামারই কথা নয়; সেই বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করছে তারা। কারণ, তারা একটি স্বাভাবিক অবস্থার গ্যারান্টি চাইছে। সেই তাদের ওপর কালকে দেখলাম পুলিশ লাঠিচার্জ করছে। আবারও সেই অস্বাভাবিক। স্বাভাবিক হওয়া কী উচিত ছিল? এদের সঙ্গে বসে আলাপ করা, এদের কাঁধে-মাথায় হাত রেখে বোঝানো, তাদের স্নেহ দিয়ে, ধৈর্য ধরে কথা শুনে একটি স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা। এটিই হতো স্বাভাবিক। সেটি না হয়ে তাদের ওপর লাঠিচার্জ হয়েছে। এটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। মানছি কেন? কারণ, আমাদের প্রজন্মের আর কোনো শক্তি নেই এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার। আমরা সবাই নানা স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের হাত-পা-মুখ বাঁধা। আমরা লোভের কাছে বলি হয়ে গেছি। ক্ষমতা চাই। ফলে আমরা কোনোদিন কোনো প্রতিবাদ করব না। প্রতিবাদ করলে যেভাবে নিয়ন্ত্রণের খÿ নেমে আসে, তাতে অনেকেই প্রতিবাদ করার সাহসটা হারিয়ে ফেলেছে। অথচ প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল যারা সরকার চালাচ্ছে, তাদের ভেতর থেকে। তাদের বলা উচিত, নির্বাচন করার সময় ভোটারদের যে প্রতিশ্রুতি তারা দেন, তার বিপরীতে যাওয়ার প্রতিবাদ করা উচিত। এর আগে যখন কোটা সংস্কারের আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা নিজেদের চিন্তাভাবনায় নেমেছিল; তাদের দেশদ্রোহী, সরকারদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারলাম। কিন্তু এই শিশু-কিশোরদের কি সেই আখ্যায় আখ্যায়িত করব? এরা তো সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামে নামেনি। তারা স্বাভাবিক অবস্থার গ্যারান্টির জন্য নেমেছে। এটি আসলে সরকারের পক্ষেই যাচ্ছে। তারা চাইছে স্বাভাবিক অবস্থা নিশ্চিত হোক। এটি হলে সরকারেরই লাভ। আমি মনে করি, যারা রাস্তায় নেমেছে, এদের কোনো লোভ নেই, অন্য কোনো চিন্তা নেই। তারা শুধু সহপাঠীর মৃত্যুর বেদনায় আহত হয়ে মাঠে নেমেছে। তারা এর পুনরাবৃত্তি চায় না। বয়স্ক প্রজন্ম এগুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে ধরে নিয়েছি। কিন্তু ওরা এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে মানতে পারছে না। আমি মনে করি, ভবিষ্যৎ কথা বলছে। যে প্রজন্ম রাস্তায় নেমেছে, তারা ভবিষ্যতের কর্ণধার। এরা যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে যাবে, তখন আমি হয়তো বেঁচে থাকব না। কিন্তু ভবিষ্যৎ এরাই। এরা কথা বলছে, এদের কথা শুনতে হবে। এদের কথা শুনলে সরকার, রাষ্ট্র ও সমাজ লাভবান হবে। এদের চাহিদা সামান্য। এরা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন করছে। তারা লাইসেন্স চেক করছে, এটি তো তাদের কাজ না, এটা পুলিশের কাজ। এটা অস্বাভাবিক। যে কাজটি পুলিশের করার কথা, রাষ্ট্রের করা কথা; সেই কাজটি এই শিক্ষার্থীরা করছে। এতে প্রমাণ হয়, আমরা রাষ্ট্র হিসেবে কতখানি পিছিয়ে পড়েছি। এই ভবিষ্যতের আশা-আকাঙ্ক্ষা থেকে একটি চিত্র উঠে এসেছে। এখন পর্যন্ত স্বস্তি পাচ্ছি এই ভেবে, তাদের আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়নি কিংবা তাদের ওপর সরকারি বা অন্য কোনো ছাত্রসংগঠন আক্রমণ করেনি বলে। তবে আজকে (গতকাল) ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ে পরিবহন শ্রমিকরা বাচ্চাদের গায়ে হাত তুলেছে। এই ভবিষ্যতের কথা সরকারকে শুনতেই হবে; কারণ এরাই ভবিষ্যতে ভোট দিয়ে সরকারকে নির্বাচিত করবে। সেইসঙ্গে গণপরিবহনকে সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্গঠিত করতে হবে। আর শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে হবে। লেখক: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ