প্রকাশ : 2017-12-19

এবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে তোলপাড় সর্বত্র

পাবলিক ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের উদ্বেগের মধ্যেই শিক্ষার এ সঙ্কট এবার নতুন মোড় নিয়েছে। এতদিন পাবলিক ও নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়েই ছিল উদ্বেগ। এবার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অব্যাহত ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে সর্বত্র। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সহস্রাধিক স্কুলের পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। এক সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। পরীক্ষা বন্ধ করে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করলেও শিশুদের অভ্যন্তরীণ এ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ভয়াবহ চেহারায় বাড়ছে উদ্বেগ।এদিকে শিশুদের অভ্যন্তরীণ এ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অব্যাহত ঘটনায় রীতিমতো বিচলিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরও হতচকিত। বার্ষিক পরীক্ষার এ প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা নিয়ে এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট অধিদফতর আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য দেয়নি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ ই এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হচ্ছেন না। তবে অতিরিক্ত সচিব (বিদ্যালয়) ড. এ এফ এম মনজুর কাদিরের সঙ্গে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছিলেন, প্রশ্ন ফাঁস ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। এ থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারের সকল সংস্থা ছাড়াও জনসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তাতে ভবিষ্যত কোন দিকে যাবে তা আল্লাহই জানেন বলেও হতাশা প্রকাশ করেন সরকারের এ কর্মকর্তা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর আগে তো এমন হয়নি। তবে আমরা মাঠপর্যায় থেকে তদন্ত করে তথ্য সংগ্রহ করছি। কারন কি? কারা জড়িত? সকল তথ্য পেলে সেভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। আসলে সরকারের কোন পক্ষেরই সঙ্কট সমাধানে চেষ্টার কমতি নেই। তারপরেও সমাধান হচ্ছে না। জনগণকে এর বিরুদ্ধে জাগিয়ে তুলতে হবে।জানা গেছে, গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পাশে মুন্সীগঞ্জে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় জেলা সদরের ১১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা জানান, পরীক্ষার আগের রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ ওঠে ও আমার ই-মেইলে সেই প্রশ্ন পাঠায় কয়েকজন। যার পরিপ্রেক্ষিতে পরীক্ষা স্থগিত করার নির্দেশ দেই। এ নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পঞ্চানন বালা বলেন, প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় সদরের ১১৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর বাংলা পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়। তবে প্রথম শ্রেণীর পরীক্ষা যথারীতি সম্পন্ন হয়েছে। স্থগিত ওই পরীক্ষা পরে নেয়া হবে। এ ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এডিএম শওকত আলম মজুমদারকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।তার আগে গত ৯ ডিসেম্বর শনিবার বরগুনা সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। পরে ওই বিষয়ের পরীক্ষা বাতিল করে নির্ধারিত সময়ের (সকাল ১০টা) তিন ঘণ্টা পরে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন প্রশ্ন করে পরীক্ষা নেয়া হয়। এ ঘটনায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করার অভিযোগে ওই বিদ্যালয়ের দুই শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়া হয় এবং এ বিষয়ে পৃথক দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরপর গত ১১ ডিসেম্বর বরগুনাতেই ইংরেজী পরীক্ষার চতুর্থ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়। বিষয়টি জেলা প্রশাসন আমলে নিয়ে শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে ১২ ডিসেম্বর বরগুনা সদর উপজেলার ২৪৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ইংরেজী পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এ ঘটনায় জেলা প্রশাসন দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে।কমিটির সদস্যরা হলেন- বরগুনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) মোঃ মাহবুবুল আলম ও বরগুনা প্রাইমারী টিচার্স ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সুপার মোঃ জাহাঙ্গীর আলম। এ ঘটনায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আয়লা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম সরোয়ার ননীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে হাজির করা হলে আদালত তাকে জামিন দেন।তার দুদিন পর বরগুনার স্কুলগুলোয় চলমান বার্ষিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীর গণিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর বেতাগী উপজেলার ১৪০টি বিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত করেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ আবদুল মজিদ জানান, ১৬ ডিসেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি নজরে আসে। তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস পরদিন অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করার ঘোষণা দেন। গণিত পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় পরীক্ষা স্থগিত করে আগামী ২১ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার নতুন প্রশ্নে এই পরীক্ষা নেয়া হবে।সর্বশেষ সোমবারই নাটোরে পরীক্ষা শুরুর আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে পাওয়া গেছে প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণীর গণিত পরীক্ষার হাতে লেখা প্রশ্নপত্র। আর এ ঘটনায় ১০২টি বিদ্যালয়ের পরীক্ষা বাতিল করেছে উপজেলা শিক্ষা কমিটি। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঘটনার শুরুতেই পদক্ষেপ নিয়ে পরীক্ষা বন্ধ করেন। সদর উপজেলার আগদিঘা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিপ্রা রানী দত্ত বলছিলেন, সোমবার সকাল থেকে সদর উপজেলার প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে আগদিঘা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রথম এবং চতুর্থ শ্রেণীর গণিত বিষয়ে পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শুরুর কিছু আগেই বিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থীর কাছে হাতে লেখা প্রশ্ন পাওয়া যায়। যা মূল প্রশ্নের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। পরে আমি বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বানু এবং প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা শিক্ষা কমিটির সদস্য সচিব আলী আশরাফকে জানাই। তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পান। পরে সদর উপজেলার ১০২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম ও চতুর্থ শ্রেণীর গণিত পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করেন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বানুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলী আশরাফ দাবি করেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনায় দ্রুত এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া বাতিল করা পরীক্ষা আগামী ২১ তারিখের মধ্যেই নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।কিন্তু এসব প্রশ্ন ফাঁস কি ভাবে হচ্ছে, কোথা থেকে হচ্ছে? প্রশ্নপত্র ছাপা ও বিতরণের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা বলছেন, আসলে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ছাপানো এবং বিতরণ -এই তিনটি পর্বের মধ্যে প্রায় ৪০টি ধাপ আছে। প্রতিটা ধাপেই ফাঁস হবার ঝুঁকি আছে। কোচিং বাণিজ্য হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কেন্দ্রবিন্দুতে। কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এবং পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকারী-বেসরকারী স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনরা এর সঙ্গে জড়িত। এদের একটা সিন্ডিকেট তৈরি হয়ে গেছে।তবে প্রাথমিকের বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় উদ্বেগ এখন অভিভাবকদের। তাদের প্রশ্ন কিভাবে প্রাথমিকের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়? কে এ কাজে জড়িত? প্রশাসন জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। অনেকে মনে করেন, এভাবে সরকারী বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে শিক্ষর্থীদের কিন্ডারগার্টেনে পড়ানোর আগ্রহ বাড়বে। রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীর অভিভাবক নাসরিন বেগম বলছিলেন, এমন করে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আমরা হতাশ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস করে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে একটি মহল। অসৎ ও লোভী শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্যে তাদের সফল্য দেখানোর জন্য এ জঘন্য কাজ করছেন। এ স্কুলেরই আরেক অভিভাবক সজল চৌধুরী বলছিলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস হলে শিক্ষার্থীরা কী শিখবে? এমন করে প্রশ্ন ফাঁস হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ কমে যাবে। এতে শিশুরা লেখাপড়ায় ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করবে। ফলে আমরা সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছি।অভিভাবক সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নিপা সুলতানা বলছিলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা উচিত। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের জঘন্য কাজ করার সাহস কেউ না পায় সে ব্যবস্থা করা উচিত।নিজ জেলায় একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বরগুনার সচেতন নাগরিক সমাজ। তারা এ প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান। বরগুনা পাবলিক পলিসি ফোরামের আহ্বায়ক মোঃ হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে। আমরা আমাদের আগামীর ভবিষ্যত জাতিকে একটি মেধাশূন্য জাতিতে পরিণত করে ফেলছি। তাই আমাদের এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দেয়া উচিত।বরগুনার বেতাগী উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আঃ মন্নান বলেন, অপরাধ যে করেছে তার শাস্তি হোক এটা আমরা চাই। নৈতিকতা যারা বিকিয়ে দিতে পারে তারাই এমন কাজ করে। তবে তদন্তের মাধ্যমে দোষীকে চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।