প্রকাশ : 2018-12-06

আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ বিকল্পই বাদ

অনলাইন ডেস্ক: আগামী নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে যাদের মনোনয়নের চিঠি দেয়া হয়েছে, তাদের বেশির ভাগকেই হতাশ হতে হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, মূল প্রার্থীরা টিকে যাওয়ায় বিকল্পদের দলের প্রতীক পাওয়ার সম্ভাবনা কম। যে ১২টি আসনে একজন করে বিকল্প নেতাকে মনোনয়নের চিঠি দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে সর্বোচ্চ তিনজনের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। এদের মধ্যে একজন আবার একটি শরিক দলের প্রধান। গত ২৫ থেকে ২৭ নভেম্বর মোট ২৬৬ আসনে প্রার্থী দেয় আওয়ামী লীগ। ১৪টি আসনে মনোনয়নের চিঠি দেয়া হয় দুইজনকে। এদের মধ্যে দুইজন জমা দেননি। ফলে ১২টি আসনে রয়ে গেছে দুইজন করে প্রার্থী। ৩০ ডিসেম্বরের ভোটকে সামনে রেখে এরই মধ্যে প্রার্থিতা জমা এবং মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ হয়ে গেছে। বাতিল হয়ে যাওয়া প্রার্থীরা নির্বাচন কমিশনে আপিলও করেছেন। তাদের আবেদন নিষ্পত্তি হবে আগামী তিন দিন। আর ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। সেদিন রাজনৈতিক দলগুলো জানিয়ে দেবে, কোন আসনে তাদের দলের প্রার্থী কে। ফলে বিকল্প কারও পক্ষে ভোটে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকবে না। আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, কিছু আসনে একাধিক প্রার্থী দেয়ার কারণ ছিল, পছন্দের প্রথম প্রার্থীর বিষয়ে আইনি জটিলতার আশঙ্কা। তবে যাচাই-বাছাইয়ে সবাই বৈধ প্রার্থী হয়ে গেছেন, ফলে বিকল্পদের বেশির ভাগকে নিয়ে আর ভাবতে চাইছেন না তারা। এর মধ্যে একটি আসন ছিল কিশোরগঞ্জ-১। আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই আসনের সংসদ সদস্য। তিনি অসুস্থ এবং চিকিৎসা নিচ্ছেন থাইল্যান্ডে। তাকে নিয়ে আশঙ্কা ছিল দলে। এ কারণে মশিউর রহমান হুমায়ুনকে বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়। তবে আশরাফের অবস্থা এখন আগের চেয়ে ভালো এবং চিকিৎসকরা তার সুস্থতার বিষয়ে আশাবাদী। তিনি হাঁটাচলাও করছেন। আর তার মনোনয়নপত্র বৈধও ঘোষণা হয়েছে। এই অবস্থায় আশরাফকেই প্রার্থী করতে চাইছে আওয়ামী লীগ। হুমায়ুন অবশ্য এরই মধ্যে নিজ উপজেলা হোসেনপুরে জনসংযোগ শুরু করে দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু না হলেও নানাভাবে তিনি ভোটারদের কাছে যাচ্ছেন। বরগুনা-১ আসনে আওয়ামী লীগ ভরসা রাখতে পারে পুরনো কান্ডারি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ওপর। তিনি চারবার এই আসন থেকে জিতেছেন। তার মনোনয়ন বৈধ হয় কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। তাই সেখানে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে রাখা হয় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবিরকে। বৈধ হয়েছে দুইজনেরই মনোনয়ন। আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, শম্ভু আমাদের পরীক্ষিত প্রার্থী। বারবার জিতেছেন। প্রমাণ দিয়েছেন জনপ্রিয়তার। তার মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় এখন প্রার্থী পাল্টানোর যুক্তি দেখছি না। টাঙ্গাইল-২ আসনে প্রথমে মনোনয়ন পেয়েছিলেন প্রবাসী ব্যবসায়ী তানভীর হাসান (ছোট মনির)। পরে বিকল্প হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয় মশিউজ্জামান রুমেলকে। তিনি বর্তমান সংসদ সদস্য খন্দকার আসাদুজ্জামানের ছেলে। ছোট মনি মনোনয়নের চিঠি পাওয়ার পর গণমাধ্যমে খবর আসে, তার দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে। তিনি বাংলাদেশের পাশাপাশি জার্মানিরও নাগরিক। তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় কেউ বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলেনি বা তুললেও টেকেনি। এই আসনটিতে ছোট মনিরের বদলে রুমেলকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা। একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, রুমেলের বাবা সংসদ সদস্য, বয়সের কারণে ভোটে লড়তে পারছেন না, কিন্তু ব্যাপক জনপ্রিয়। রুমেলও কাজ করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। তাকেই হয়তো শেষ পর্যন্ত আমরা বেছে নেব। ঢাকা-৫ আসনের হাবিবুর রহমান মোল্লা আবারও মনোনয়ন পেতে পারেন। ২৫ নভেম্বর তার পাশাপাশি বিকল্প প্রার্থী হিসেবে কাজী মনিরুল ইসলাম মনুকেও দেয়া হয় দলের চিঠি। এই আসনটিতে হাবিবুর রহমান নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে লড়েছেন। হেরেছেন একবার। সবশেষ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে প্রায় ৫৪ হাজার ভোটে পরাজিত করেন তিনি। ফলে শেষ পর্যন্ত পরীক্ষিত সেনাকেই বেছে নেয়া হতে পারে। ঢাকা-৭ আসনে হাজী মো. সেলিমের মনোনয়ন বাতিল হতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল আওয়ামী লীগের। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তার সাজা হয়েছিল। তবে উচ্চ আদালতে সেই রায় টেকেনি। যদিও এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে দুদক। যাচাই-বাছাইয়ে হাজী সেলিমের মনোনয়ন বৈধও ঘোষিত হয়েছে। তাই চূড়ান্তভাবে তাকেই দলীয় প্রতীক দেয়া হতে পারে। এই আসনে হাজী সেলিম ২০১৪ সালে দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নৌকার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনকে হারিয়ে জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। তাই এ আসনে তার বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছিল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসনাতকে। যাচাই-বাচাইয়ে তার মনোনয়নও বৈধ ঘোষিত হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, এখানে আওয়ামী লীগেরও সন্দেহ ছিল তিনি (সেলিম) নির্বাচন করতে পারবেন না। তাই ওই আসনে দুইজনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনী আইনে তিনি টিকে গেছে এখানে। তো আমাদের কিছু করার নেই। ঢাকা-১৭ আসনের আকবর হাসান পাঠান ফারুকের মনোনয়ন স্থগিত করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। পরে বৈধ ঘোষণা করা হয়। এ আসনে ফারুকের বিকল্প হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের খানকে। দুইজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নের ক্ষেত্রে ফারুককেই এগিয়ে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের সম্পাদকম-লীর একজন সদস্য। আসনটি চাইছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও। ২০০৮ সালে এই আসনটি তাকেই দেওয়া হয়েছিল। তবে এবার সেখানে তাকে ছাড় দেয়া হবে কি না, এই বিষয়টি নিশ্চিত নয়। জামালপুর-১ আসনের আবুল কালাম আজাদের বিকল্প প্রার্থী নূর মোহাম্মদ। যাচাই-বাচাইয়ে দুইজনের প্রার্থিতাই বহাল রয়েছে। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নে এগিয়ে আছেন সাবেক মন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ। দেওয়ানগঞ্জ ও বকশিগঞ্জ মিলে আসনটি। এর মধ্যে বকশীগঞ্জের নেতাকর্মীরা আজাদকে মনোনয়ন না দেয়ার অনুরোধ করে কেন্দ্রে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তারা সবাই নুর মোহাম্মদের পক্ষে। তিনি বকশীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবে আজাদ চারবারের সংসদ সদস্য। আর এরই মধ্যে দলের সবুজ সংকেত পেয়ে যাওয়ার দাবি করেছেন তার ঘনিষ্ঠজনরা। নূর মোহাম্মদ ২০০৮ সালে দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। ভোট পান হিসেবে ৪৯ হাজার ৬৪৯টি। এক লাখ ১৫ হাজার ৭২২ ভোট পেয়ে জেতেন আজাদ। ধানের শীষে পড়ে ৭০ হাজার ৬৮০ ভোট। তবে কপাল খুলতে পারে জামালপুর-৫ আসনের বিকল্প প্রার্থী মোজাফফর হোসেনের। এই আসনে ১৯৯৬ সাল থেকেই জিতে আসছেন রেজাউল করিম হীরা। জিতেছেন মোট চারবার। এবারও পেয়েছেন দলের মনোনয়ন। তবে শিল্পপতি মোজাফফর এলাকায় এসে হীরার রাজত্বে ভাগ বসাতে চাইছেন। জেলা আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতাকর্মী তার পক্ষে অবস্থানও নিয়েছে। আর তার সমর্থকরা মনোনয়নের সবুজ সংকেত পাওয়ার দাবি করছেন। এরই মধ্যে হীরার অনুসারীরা অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। চাঁদপুর-১ আসনে মহিউদ্দীন খান আলমগীরের পাশাপাশি গোলাম রহমানকে এখানে মনোনয়নের চিঠি দেয়া হয়। দুইজনই সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মহিউদ্দীন খান আলমগীরের সাজা হয়েছিল দুর্নীতির মামলায়। তবে উচ্চ আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেয়। এর বিরুদ্ধে আবার আপিল করেছে দুদক। তাই তার মনোনয়ন বৈধ হয় কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন ছিল। দলের একজন সম্পাদকদ-লীর সদস্য জানান, দুইজনকে মনোনয়ন দেয়ার পর নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই মহীউদ্দীন খান আলমগীরের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাই তাকে বাদ দেয়া কঠিন। চাঁদপুর-২ আসনে প্রথমে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াকে একাই মনোনয়ন ফরম দেয়া হয়। দুই দিন পর চিঠি দেয়া হয় সাবেক ছাত্রনেতা নুরুল আমিন রুহুলকেও। যাচাই-বাচাইয়ে দুইজনের মনোনয়ন ফরমই বৈধ ঘোষণা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়কের আমলে সাজা হয়েছিল মায়ার। পরে উচ্চ আদালতে পেয়েছেন খালাস। আপিল বিভাগের নির্দেশে সেই মামলা আবার শুনানির পর এসেছে একই রায়। ফলে মায়ার মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন একজন সাংগঠনিক সম্পাদক। চাঁদপুর-৪ আসনেও দুইজনকে চিঠি দেয়া হয়েছিল। ২৫ নভেম্বর শামছুল হক ভূঁইয়াকে এবং দুই দিন পর জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুল ইসলামকে বিকল্প প্রার্থী করা হয়। যাচাই-বাচাইয়ে দুইজনের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে রিটার্নিং কর্মকর্তা। আর এতে শামসুলের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়া বেড়ে গেছে। শামসুল হক ভূঁইয়ার খেলাপি ঋণ থাকতে পারে বলে তথ্য ছিল। তিনি ফারমার্স ব্যাংক থকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি বলে অভিযোগ আছে। তবে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসায় খেলাপি হিসেবে তাকে বিবেচনার সুযোগ ছিল না। নড়াইল-১ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি এবং জাসদের একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া। রিটার্নিং কর্মকর্তা দুইজনেরই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতারা জানিয়েছেন, এই আসনে আম্বিয়াকে ছাড় দেয়া হবে এবং এরই মধ্যে তাকে বিষয়টি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুক্তি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। দুইজন জমা দেননি চিঠি মনোনয়নের চিঠি পেয়েও প্রার্থিতা জমা না দেয়ায় আগেই বাদ পড়ে গেছেন দুইজন। এরা হলেন বরিশাল-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস এবং বরিশাল-৫ আসনে জেবুন্নেসা হিরন। বরিশাল-২ আসনে আওয়ামী লীগের হয়ে লড়বেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহে আলম। আর বরিশাল-৫ আসনে নৌকা নিয়ে লড়বেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জাহিদ ফারুক শামীম।

রাজনীতি পাতার আরো খবর