মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৬, ২০১৮
প্রকাশ : 2018-01-06

দাবি মেনে নেয়ায় নন-এমপিও শিক্ষকদের উচ্ছ্বাস

এমপিওভুক্তিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসের পর অবশেষে ছয়দিন ধরে চালিয়ে যাওয়া আমরণ অনশন প্রত্যাহার করেছেন শিক্ষকরা। নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে অবস্থান নিয়ে ছয়দিন ধরে অনশন করছিলেন তারা। এর আগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সম্মতি ও শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের আশ্বাস পেলেও আন্দোলন প্রত্যাহার না করে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন শিক্ষকরা। এ অবস্থায় শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়ে তারা কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার একান্ত সচিব-১ সাজ্জাদুল হাসান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন, মাউশির মনিটরিং বিভাগের পরিচালক প্রফেসর সেলিম মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে অনশনরত শিক্ষকদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সাজ্জাদুল হাসান বলেন, নন-এমপিও শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন, আপনাদের কাছে তারবার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য। তিনি আপনাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন অনশন ভেঙ্গে যার যার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য। শিক্ষা সচিব মোঃ সোহরাব হোসাইন নন-এমপিও শিক্ষকদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান। পরে শিক্ষা সচিব জানান, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নন-এমপিও শিক্ষকদের অনশনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ সময় শিক্ষকরা আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠেন। তারা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিয়ে নানা সেøাগান দিতে থাকেন। আন্দোলনরত শিক্ষকদের সংগঠন নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার ঘোষণা করেন, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব-১ সাজ্জাদুল হাসান শুক্রবার বিকেলে অনশনস্থলে এসে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের বিষয়টি জানালে তারা কর্মসূচী প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। জননেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আমাদের মানবিক বিষয়টি বিবেচনা করে উনার একান্ত সচিব সাজ্জাদ সাহেবকে পাঠিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, সাজ্জাদ সাহেব আমাদেরকে মেসেজ দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আমরা অনশন ভঙ্গ করে কর্মসূচী প্রতাহার করেছি। ছয়দিনের অনশনে অর্ধশতাধিক শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের চিকিৎসাও দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দাবি পূরণের আশ্বাস পেয়ে অনশন ভাঙ্গার পর আনন্দে মেতে ওঠেন আন্দোলনরত শিক্ষক-কর্মচারীরা। আন্দোলন আমরা প্রত্যাহার করেছি। সকলে কাজে ফিরে যাচ্ছেন। গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, আমাদের বিশ্বাস ছিল প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবি মেনে নেবেন। তাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনশনস্থল ছাড়িনি। শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে কর্মসূচী প্রত্যাহার করিনি। আমরা এমপিওভুক্তির সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চেয়েছিলাম সেটি পেলাম। নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বিনয় ভূষণ রায় বলেন, আমরা শনিবার (আজ) থেকেই ক্লাসে ফিরব, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনব। আশা করি, নন-এমপিও সব স্কুল এবার এমপিওভুক্ত হয়ে যাবে। আমরা জানতে পেরছি, ইতোমধ্যে সেই কাজ শুরুও হয়ে গেছে। সর্বশেষ ২০১০ সালে এক হাজার ৬২৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করে সরকার। এরপর থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি বন্ধ রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী বলে আসছিলেন সরকারের কাছ থেকে অর্থ পেলে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করতে মন্ত্রণালয়ের কোন অসুবিধা নেই। ২ জানুয়ারি শিক্ষকদের অনশন ভাঙাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, অনেক চেষ্টার পর তিনি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করতে পেরেছেন। এবার নীতিমালা করে এমপিওভুক্তির কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। দেশে বর্তমানে এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে সোয়া পাঁচ হাজার। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাউশির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মতি অনুসারে ইতোমধ্যেই নতুন এমপিওভুক্তির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশোধিত এমপিও নীতিমালার খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে চূড়ান্ত হয়ে আসার পর শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন চাওয়া হবে। এরপর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত করা হবে। এমপিওভুক্তির দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীদের টানা আন্দোলন শুরু হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই কার্যক্রম শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এমপিও প্রত্যাশীদের যাচাই-বাছাই করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে শিক্ষা অধিদফতরকে (মাউশি)। এ মুহূর্তে থোক বরাদ্দ পেলে দুই থেকে আড়াই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হতে পারে। ছয় মাস পর ২০১৮-২০১৯ সালের বাজেটে আরও আড়াই হাজার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী ভাল ফল, প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ কয়েকটি বিষয় মূল্যায়ন করে শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির জন্য নির্বাচন করা হবে। ২০০৯ সালের ১৬ জুন সর্বশেষ নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির পর আর কোন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হয়নি। বর্তমানে সারাদেশে প্রায় সাড়ে সাত হাজার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বাইরে আছে। এমপিও সংক্রান্ত মাউশির করা প্রস্তাবে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, সারাদেশের এমপিওবিহীন সাত হাজার ১৪২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে বার্ষিক দুই হাজার ১৮৪ কোটি ২৭ লাখ ৫২ হাজার ২৫০ টাকা লাগবে। তবে জাতীয়করণে অযোগ্য-মানহীন প্রতিষ্ঠান নিয়ে অভিযোগ যেমন আছে তেমনি যেনতেনভাবে গজিয়ে ওঠা বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা নিয়েও আছে অনেক অভিযোগ। অভিযোগের অন্যতম কারণ; অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান এবং এর অযোগ্য-মানহীন শিক্ষক। যাদের প্রায় প্রত্যেকের নিয়োগ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করার মাধ্যমে শিক্ষার স্বার্থ কতটুকু রক্ষা হবে তা নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে বলে বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, আজকের এ অবস্থানের জন্য দায়ী যত্রতত্র প্রতিষ্ঠান অনুমোদন। তাই যেখানেসেখানে অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান খোলার সুযোগ বন্ধ করতে হবে।

জাতীয় পাতার আরো খবর