প্রকাশ : 2018-01-07

বুলেটের মাধ্যমে নয়, ব্যালটে ক্ষমতা বদল হবে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ভোটারবিহীন বলে অভিযোগ উত্থাপনকারীদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কোনভাবেই ভোটারবিহীন ছিল না। শত বাধা ও খালেদা জিয়ার জ্বালাও-পোড়াও এবং আগুনে শত শত মানুষ হত্যার মধ্যেও শতকরা ৪০ ভাগেরও বেশি ভোট পড়েছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে। জনগণ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছে বলেই আমরা আজ সরকারের চতুর্থ বছর পূর্ণ করছি। আওয়ামী লীগ জনগণের ভোটেই নির্বাচিত। খালেদা জিয়া ওই সময় দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই যেন না থাকে সেই চেষ্টা ও ষড়যন্ত্রই করেছিল। কিন্তু জনগণ তা সফল হতে দেয়নি। নির্বাচন হয়েছে বলেই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার রাতে গণভবনে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সূচনা বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে আরও বলেন, বিএনপি এখন কথায় কথায় গণতন্ত্রের কথা বলে। অনেকে বলে বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছে। তারা জনগণকে গণতন্ত্র দেয়নি। গণতন্ত্র দিয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী, রাজাকার, আলবদর, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের। যাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল তাদের রাজনীতি করার অধিকার দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর খুনীদের পুরস্কৃত করেছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, জিয়াউর রহমান কিভাবে ক্ষমতায় এসেছে? কিন্তু কোন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিএনপির জন্ম? অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জেনারেল জিয়া রাষ্ট্রপতি সায়েমকে অস্ত্র দিয়ে ভয় দেখিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিল। সাবেক রাষ্ট্রপতি সায়েম সাহেব তার লেখা বইতেই সবকিছু লিখে গেছেন। যে দলটির জন্মই অবৈধভাবে সেই দলটির নেতারা গণতন্ত্রের বুলি আওড়ান কীভাবে? ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশের কিছু লোক আছে যারা যেনতেনভাবেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ভোটারবিহীন নির্বাচন বলার চেষ্টা করেন। এই নির্বাচনকে বানচাল করার নামে খালেদা জিয়ারা নির্বিচারে পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেছে, শত শত ভোট কেন্দ্রে আগুন দিয়েছে, প্রিসাইডিং অফিসারকে পর্যন্ত পুড়িয়ে হত্যা করেছে। কিন্তু এত বাধার মধ্যেও জনগণ সবকিছু প্রতিহত করে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছে। ৪০ ভাগেরও বেশি ভোট পড়েছে। জনগণ ভোট দিয়েছে বলেই আওয়ামী লীগ চার বছর ক্ষমতায় আছে। এরশাদ ও খালেদা জিয়ার আমলের নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কই ৮৮ সালে এরশাদ তো ভোটারবিহীন নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে খালেদা জিয়া দেড় মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। জনগণের আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার মানসিক সমস্যা দেখা দিল কি-না, সেটাও বলতে পারছি না। পরীক্ষা করে দেখা দরকার, তার মাথা ঠিক আছে কি-না। পদ্মা সেতু নিয়ে খালেদা জিয়ার অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করছি। খালেদা বলেছেন, পদ্মা সেতু নাকি জোড়াতালি দিয়ে করা হচ্ছে। তিনি মানুষকে পদ্মা সেতুতে উঠতে মানা করেছেন। আমরা দেখব, খালেদা এবং বিএনপি নেতারা পদ্মা সেতুতে ওঠেন কি-না। খালেদা জিয়া অনবরত অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, এই মহিলা কত মিথ্যা কথা বলে। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব কিছু মিথ্যাতে ভরা। মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত সব কিছু নকল। মিথ্যা কথা বলে, সবকিছু মিথ্যা ও জালিয়াতি করে। এখন আবার বলছেন, আমাদের নৌবাহিনীর জন্য আনা সাবমেরিন ফুটো হয়ে গেছে। এটা পানির নিচে ডুবে গেছে! সেনাবাহিনীর বউ (খালেদা জিয়া) হয়েও এটা বোঝেন না যে, সাবমেরিন ডুবে যায় না, এটা পানির নিচে যায়। জানি না এই কথা শোনার পর আমাদের নৌবাহিনীর সদস্যরা কী বলবেন। আর দেশের জনগণই বা কী বলবে। বুঝতেছি না, তার মাথায় কিছু আছে কি না। তিনি বলেন, খালেদা শুধু একটা বিষয়ই ভাল বোঝেন তা হলো লুটপাট, অর্থ বানানো, ধ্বংস, মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা। তিনি এগুলোই কেবল বোঝেন, আর কিছু বোঝেন না। খালেদা জিয়ার টুইট বার্তার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া টুইট করেছেন, আওয়ামী লীগ বুলেটে বিশ্বাস করে, আর তিনি ব্যালটে বিশ্বাস করেন! আমি ৮১ সালে দেশে ফিরে বলেছিলাম, ক্ষমতা বদল হবে বুলেটে নয়, ব্যালটে। বুলেটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে জিয়া, তার স্ত্রী তার থেকে আরও একধাপ এগিয়ে দেশ বিক্রির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। বুলেটে-বন্দুকের নলে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তাদের মুখে এ কথা শোভা পায় না। আর জানি না, টুইট তিনি নিজে লিখেছেন, নাকি কাউকে দিয়ে লেখিয়েছেন, সন্দেহ। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনীদের সংসদে এনে বিরোধী দলের আসনে বসিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনী হুদা যার ফাঁসি হয়েছে, সেই হুদাকে পর্যন্ত এমপি বানিয়ে সংসদে বসিয়েছিলেন বিএনপি নেত্রী। ভোটারবিহীন নির্বাচন জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ারাই করেছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার দেয়া উকিল নোটিসের জবাব দেয়া হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার গোটা পরিবারের সম্পদের হিসাব বের করেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। আর এটা বললাম কেন, এজন্য আমাকে নোটিস দেন। এ রকম নোটিস বহু দেখেছি। সময়মতো এই নোটিসের জবাব দেব। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, যদি সৎসাহস থাকে, সত্যি কোন অপরাধ করে না থাকেন, যেসব মিডিয়া খবর দিয়েছে, তাদের নোটিস দিন। তাদের প্রতিবাদ জানান। তাহলে বোঝা যাবে, সততার একটা শক্তি আছে। তিনি সেটাও পারেননি। এ প্রসঙ্গে সরকার প্রধান আরও বলেন, খালেদা জিয়ার গোটা পরিবারের সম্পদের যে হিসাব এসেছে, তা তো বাংলাদেশের কেউ বের করেনি। এটা তো আন্তর্জাতিকভাবে বেরিয়েছে। বিভিন্ন মিডিয়া বের করেছে। সেখান থেকে খবর এসেছে। সেই কথাটি বললাম কেন, এজন্য আমাকে আবার নোটিস দেন। নোটিস আমাকে দেবেন কেন? যেসব মিডিয়া এগুলো বের করেছে, যেসব দেশের সরকার এই তথ্যগুলো দিয়েছে, সেখানে তো নোটিস দিতে যাননি। সেখানে নোটিস দিয়ে বা তাদের কাছে প্রতিবাদ জানালে না হয় সত্যতা বুঝতাম। সব অন্তর্জ্বালা আমাকে দিয়ে মেটাতে চান বিএনপি নেত্রী। কারণ তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার সেই ঐতিহাসিক ভাষণ আজও জাতিকে অনুপ্রাণিত ও স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। বিশ্বের আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসে যতগুলো ভাষণ রয়েছে এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ব্রিটিশ সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক জ্যাকব এফ ফিল্ড বিশ্বের আড়াই হাজার বছরের বিভিন্ন শ্রেষ্ঠ ভাষণ নিয়ে গবেষণা করে একটি বই বের করেছেন। ওই বইয়ে আড়াই হাজার ভাষণের মধ্যে মাত্র ৪১টি ভাষণ স্থান পেয়েছে। আর ওই ৪১ ভাষণের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্যতম ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর সেই শ্রেষ্ঠ ভাষণ আজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণকে ওয়ার্ল্ডস ডকুমেন্টারি হেরিটেজহিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি বাঙালী জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের ও মর্যাদার বিষয়। স্বাধীনতা পরবর্তী বিভিন্ন দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু। একটি প্রদেশকে রাষ্ট্রে উন্নীত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে বঙ্গবন্ধু মাত্র অল্প সময়ের মধ্যে গড়ে তুলেছিলেন। দেশকে গড়ে তোলার পাশাপাশি বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল তখনই বাঙালীর জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে। তিনি বলেন, পরাজিত পাকিস্তানসহ আমাদের স্বাধীনতার যারা বিরোধী ছিল সেসব বড় বড় দেশের পাশাপাশি একাত্তরের পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধী এদেশীয় শত্রুরা নানা চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে দেশকে আবার পিছিয়ে দেয়া হয়। তিনি বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশীয় রাজাকার-আলবদর-আলশামসরা যদি বেইমানী, মোনাফেকী ও গাদ্দারি না করত তবে পাক হানাদারদের পক্ষে এতো শহর-বন্দর-গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া বা গণহত্যা চালানো সম্ভব ছিল না। সূচনা বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকের শুরুতেই প্রারম্ভিক বক্তব্য রাখেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। এরপর অনেক রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে আগামী নির্বাচন, সারাদেশে সাংগঠনিক সফরের মাধ্যমে দলকে শক্ত সাংগঠনিক শক্তির ওপর দাঁড় করানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে আগামী ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস এবং ১২ জানুয়ারি বর্তমান সরকারের মেয়াদের চতুর্থ বর্ষ পূর্তির দিনটি জাঁকজমকভাবে পালনের সিদ্ধান্ত হয় বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।

জাতীয় পাতার আরো খবর