বুধবার, জানুয়ারী ১৭, ২০১৮
প্রকাশ : 2018-01-07

মোবাইলে বেশি কথা বললে কী কী ক্ষতি হতে পারে

নানা সমীক্ষা থেকে জানা যাচ্ছে, মোবাইলের রেডিয়েশনের ফলে শুধু শরীর নয়, ক্ষতি হয় মনেরও। আমাদের অজান্তেই মোবাইলের অদৃশ্য তরঙ্গ পাল্টে দেয় দেহ-মনের রসায়ন। মোবাইল ব্যবহারের করার আগে বেশ কিছু সাবধানতা গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য। * মোবাইল ফোন থেকে শরীরে সমস্যা তৈরি হয় কীভাবে? ** মোবাইল ফোনের এক প্রান্তের বার্তা অন্য প্রান্তে পৌঁছানোর কাজটি ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের মাধ্যমে হয়। সমস্যা হল, এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন মানব শরীরেও গৃহীত হয়। সাধারণত মোবাইলের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশেনের মাত্রা ৪৫০ থেকে ৩৮০০ মেগাহার্টজের মধ্যে থাকে। এবার প্রশ্ন হল, ঠিক কতটা পরিমাণ ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন শরীরে গৃহীত হলে সমস্যা সৃষ্টি করে? উত্তর হল, ঠিক যতটা পরিমাণ রেডিয়েশন থেকে শরীরের কেমিক্যাল বন্ড ভেঙে যায় বা শরীরের মধ্যে আয়োনাইজিং এফেক্ট তৈরি হয়। বিষয়টিকে একটু বুঝিয়ে বলি, আসলে আমাদের শরীরের সমস্তটাই রাসায়নিক পদ্ধতিতে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। মাত্রাতিরিক্ত ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন শরীরের রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে ফেলতে সক্ষম। আবার রেডিয়েশনের মাধ্যমে শরীরে আয়োনাইজিং এফেক্ট তৈরি হলেও কোষের মধ্যে হঠাৎ পরিবর্তন আসে। তৈরি হয় নানাবিধ শারীরিক সমস্যা। মোবাইলের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন মানুষের ক্ষতি করতে পারে বলে প্রাথমিক পর্যায়ে মোবাইলের স্রষ্টারা বিশ্বাসই করতেন না। তাঁদের যুক্তি ছিল, মোবাইল থেকে এতই সামান্য পরিমাণে রেডিয়েশন উৎপন্ন হয় যে তা শরীরে কোনও ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। তবে বর্তমানে বিভিন্ন গবেষণায় অত্যধিক মোবাইল ব্যবহারের বিভিন্ন ক্ষতিকর শারীরিক প্রভাবগুলি নিয়ে নানা মতামত উঠে আসছে। * কী কী সমস্যা হয়? ** বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী মোবাইল ফোন থেকে মানবশরীরে ঘটে যাওয়া নেতিবাচক প্রভাবগুলিকে দুভাবে চিহ্নিত করা যায়। প্রথমটি হল ছোটদের উপর প্রভাব। আর দ্বিতীয়টি প্রাপ্তবয়স্কদের উপর প্রভাব। এবার ছোটদের উপর ক্ষতিকর প্রভাবের প্রশ্নে বলি, প্রাপ্ত বয়স্কদের তুলনায় ছোটদের শরীরে ৬০ শতাংশ বেশি হারে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন গৃহীত হয় বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে। এর কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, ছোটদের মস্তিষ্কের হাড় এবং সফ্ট টিস্যু সরু এবং পাতলা হওয়ার জন্যই প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ রেডিয়েশন গৃহীত হয়। তাই এটা সহজেই অনুমেয় যে মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব বড়দের তুলনায় ছোটদের অনেক বেশি। ছোটদের মধ্যে অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের মুখ্য সমস্যা হল লার্নিং ইম্পেয়ারমেন্ট। জটিল এই সমস্যায় ছোটদের নতুন কিছু শেখার আগ্রহ এবং ক্ষমতা দুই-ই কমে আসে । * অনেক বাচ্চাই শুয়ে-বসে বিভিন্ন ভুল শারীরিক কায়দায় মোবাইল ব্যবহার করে। এভাবে ব্যবহারে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা হওয়ায় আশঙ্কা থাকে * দীর্ঘক্ষণ মোবাইল স্ক্রিনে চোখ রাখার জন্য মাথা ব্যথার সমস্যা হওয়ারও আশঙ্কা থাকে * রাতে মোবাইল ব্যবহারে ঘুমের সমস্যা হয় * ক্লান্তি এবং দুর্বলতাও আসতে পারে * দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে * কান গরম হয়ে আসে। বড়দের ক্ষেত্রে তালিকার প্রথমেই রয়েছে মাথা ব্যথা। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় মোবাইলের ব্যবহারে ঘুমের সমস্যা, দুশ্চিন্তা এবং উত্তেজনা বৃদ্ধির মতো সমস্যাও হামেশাই ঘটে। এছাড়াও মোবাইলের ব্যবহার অনেকক্ষেত্রেই দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মোবাইল কানে রাস্তা পারাপার, রেললাইন পার বা গাড়ি চালালে যে কোনও মুহূর্তে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আবার বেশ কিছু গবেষণায় মোবাইল ফোনের বেশি ব্যবহারের সঙ্গে ক্যান্সার এবং প্রজননের অক্ষমতার দিকেও নির্দেশ করা হয়েছে। এখানে বলা দরকার, ইতিমধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা হু মোবাইল রেডিয়েশনকে প্রোবাবেল কার্সিনোজেনিক হিসাবে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ মোবাইলের রেডিয়েশন থেকে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার একটা আশঙ্কা রয়েছে বলেই সংস্থার মতামত। তবে এই বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ এখনও পর্যন্ত নেই। অপরদিকে কোনও শক্তিশালী প্রমাণ না মেলায় প্রজনন ক্ষমতা হ্রাসজনিত সমস্যাটিকেও তেমন কোনও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। * কী করলে ভালো হয়? ** বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল থেকে এটা পরিষ্কার যে সুস্থ শরীরে বাঁচতে মোবাইল ফোনের ব্যবহার কমানোই একমাত্র উপায়। তবে ঠিক কতটা কমালে ভালো হয়? উত্তরে বলা যায়, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সারা দিনে ৩০ মিনিটের বেশি মোবাইল ফোনে কথা বলা উচিত নয়। আর বয়স ১৮ বছরের নীচে হলে মোবাইল ফোনে কথা বলার সময়টা সারাদিনে ২০ মিনিটের মধ্যে রাখাই শ্রেয় * মোবাইল কেনার আগে অবশ্যই মোবাইলের স্পেসিফিক অ্যাবসর্পশন রেট বা সার ভ্যালু সম্বন্ধে জেনে নিন। বর্তমানে সরকারি নিয়ম মতো সব মোবাইল ফোনেই এই ভ্যালু উল্লেখিত থাকে * ফোনটিকে শরীর থেকে অন্তত ২০ সেন্টিমিটার দূরে সরিয়ে রাখলে রেডিয়েশনের প্রভাব কম পড়ে * মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল কম থাকলে মোবাইলের রেডিয়েশনের প্রভাব অনেকাংশে বেড়ে যায়। তাই এমন সময় মোবাইল ব্যবহার না করাই ভালো * রাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার ঘুমের সমস্যার প্রধান কারণ। তাই কোনওভাবেই রাতে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। ঘুমানোর সময় মোবাইল ফোন শরীর থেকে অনেকটা দূরে রেখে শোওয়াই ভালো। পারলে ঘুমের সময় মোবাইল বন্ধ বা সাইলেন্ট মোডে রাখুন * মোবাইল ব্যবহার করার সময়ে সঠিক দেহভঙ্গি বজায় রেখে কথা বলুন। বেঁকে-টেরে বসে বা শুয়ে কথা না বলাই ভালো * দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ফোন কানে নিয়ে কথা বলার বদলে হেডফোন ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে হেডফোনের বেশি ব্যবহার আবার কানের নানাবিধ ক্ষতি করে। তাই এক্ষেত্রেও মেপেবুঝে চলতে হবে * মোবাইলে চোখ রেখে বা কথা বলতে বলতে অন্য কাজ না করাই ভালো * মোবাইলে ব্যবহার করতে করতে রাস্তায় হাঁটা, রেললাইন পারাপার, রাস্তা পার, গাড়ি চালানো একদমই উচিত নয় * ছোটদের উপর মোবাইলের খারাপ প্রভাবকে লক্ষ করে বলা যায়, বয়সের গণ্ডি ১৮ না পেরনো পর্যন্ত মোবাইল না ব্যবহার করাই ভালো।