প্রকাশ : 2018-01-11

পায়ের গন্ধ দূর করবেন কীভাবে?

ছোট থেকে বড় অনেকেই পায়ে মোজা পরতে ভয় পান। কারণ কিছুক্ষণ পায়ে পরে থাকলেই মোজা থেকে কটু গন্ধ বেরয়। এমনকী এও দেখা গিয়েছে, মোজা না পরলেও পায়ে গন্ধ হচ্ছে অনেকের। গন্ধ হয়ে থাকে জুতো। প্রতিদিন রোদে না শুকিয়ে নিলে পায়ে পরা যায় না। খেয়াল করলে দেখা যাবে এই সব মানুষের পায়ের সঙ্গে হাতের তালুও ঘামে। বস্তুত, এই ঘাম বেরনোর সঙ্গেই রয়েছে শরীরে দুর্গন্ধ হওয়ার মূল যোগাযোগ। #ঘাম কেন হয়? ঘাম হল আমাদের শরীর থেকে বেরনো তরল পদার্থ। ত্বকের নিচে থাকা এক্রাইন গ্রন্থি থেকে ঘাম নির্গত হয়। দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘর্মগ্রন্থির যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। দেহের উষ্ণতার তুলনায় বাইরে পরিবেশের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে আমরা ঘামতে শুরু করি। এভাবেই শরীর ঠান্ডা হয়। মানবশরীরে প্রায় ৪০ লক্ষ এক্রাইন গ্রন্থি ছড়িয়ে রয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সারা শরীরে ঘর্মগ্রন্থি ছড়িয়ে থাকলেও হাত পায়ের তালুতে ঘর্মগ্রন্থির ঘনত্ব সবচাইতে বেশি। কারও কারও ক্ষেত্রে হাতের এবং পায়ের তালু বেশি ঘামে। এইসব মানুষের হাত ও পায়ের তালুর এক্রাইন গ্রন্থি কোনও কারণ ছাড়াই বেশি পরিমাণে ঘাম নিঃসরণ করে। এই ধরনের সমস্যাকে বলে পামোপ্লান্টার হাইপারহাইড্রোসিস। বাচ্চা থেকে বড় সবাই এই অসুখে ভুগতে পারেন। দেখা গিয়েছে, আবেগ, মানসিক চাপ নানা কারণে হাত এবং পায়ের তালু ঘামতে থাকে। অফিসের একটু কঠিন কাজ পড়ে গেলে, টেনশন হলে, বাড়ির বাইরে হঠাৎ কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে পড়লে হাতের ও পায়ের তালু ঘামার সঙ্গে হাত কাঁপার সমস্যাও হয়। ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে হাত ঘামার কারণে পরীক্ষার খাতা ভিজে যায়। বড়দের ক্ষেত্রে জরুরি কাগজে সই করার সময় কাগজ ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। এমনকী যাদের হাতের তালু ঘামার সমস্যা থাকে তাদের সেনাবাহিনীতেও নেওয়া হয় না। কারণ ঘামের কারণে হাত থেকে অস্ত্র পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দেখা গিয়েছে যাঁদেরই বেশি ঘাম হয়, তাঁরা শরীর থেকে খুব খারাপ গন্ধ হওয়ার অভিযোগ জানান। #কেন হয় দুর্গন্ধ? আসলে শরীর থেকে ঘাম বেরলে বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করতে থাকে। এই ব্যাকটেরিয়ার নাম স্ট্যাফাইলোকক্কাস হোমিনিস। এই ব্যাকটেরিয়াই দুর্গন্ধের মূল উৎস। তাই যাঁদের পা বেশি ঘামে তারা মোজা পরলে পায়ে আর মোজায় বেশ দুর্গন্ধ হয়। # চিকিৎসা: এই ধরনের সমস্যার চটজলদি সমাধান নেই। তবে নানাভাবে চিকিৎসা করার সুযোগও রয়েছে। রোগীর অবস্থা বুঝে চিকিৎসক অ্যালুমিনিয়াম হেক্সাহাইড্রেট লোশন, ফর্ম্যালডিহাইড এবং গ্লুটারালডিহাইড দ্রবণ, বটুলিনিয়াম টক্সিন জাতীয় ইঞ্জেকশন ও আয়নটোফোরেসিস পদ্ধতিতে চিকিৎসা করার কথা ভাবেন। এমনকী দরকার পড়লে অপারেশনও রয়েছে। #লোশন: প্রতিদিন রাতে পা শুকনো করে মুছে নিয়ে তারপর অ্যালুমিনিয়াম হেক্সাহাইড্রেট লোশন মাখতে হবে। সকালে উঠে পা ধুয়ে ফেললেই চলে। রোগীকে একটানা বেশ কিছুদিন ধরে এইভাবে লোশন দিয়ে চিকিৎসা করতে হতে পারে। সাধারণত যে পথে ঘাম বেরিয়ে ত্বকে আসে, সেই কূপের মুখ বন্ধ করে দেয় লোশন। তবে পায়ের ফাটা অংশে এই লোশন ব্যবহার করা যাবে না। সেক্ষেত্রে পায়ে নানা ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। # দ্রবণ: রোগীরা চাইলে ফর্ম্যালডিহাইড এবং গ্লুটারালডিহাইড দ্রবণে হাত এবং পা ডুবিয়ে রাখতে পারেন। এভাবে ত্বকের উপরে আক্রান্ত জায়গাগুলির চিকিৎসা করা যায়। # আয়নটোফোরেসিস: একটি যন্ত্র এবং ট্যাপ কলের জলের সাহায্যে মৃদু বিদ্যুৎ তরঙ্গ (১৫ থেকে ২০ মিলি অ্যাম্পেয়ার) প্রয়োগ করা হয় ত্বকের উপরিভাগে। পর পর ১০ দিন ৩০ মিনিট করে এই চিকিৎসা চালাতে হয়। এরপর সপ্তাহে ১ বা ২ দিন এই চিকিৎসা করালেই চলে। এর সঙ্গে অ্যান্টিকোলিনার্জিক ওষুধও দেওয়া হতে পারে। # বটুলিনাম টক্সিন: হাত ও পায়ের ঘাম ও দুর্গন্ধ বাগে আনতে বটুলিনাম টক্সিন ইঞ্জেকশন দেওয়া যায়। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এই চিকিৎসা প্রায় ব্যথাহীন। ক্ষুদ্রাকৃতি সুঁচের সাহায্যে হাত পায়ের তালুতে ইঞ্জেকশনের সাহায্যে ওষুধ পুরে দেওয়া হয়। # মুখে খাওয়ার ওষুধ: মুখে খাওয়ার অ্যান্টিকোলিনার্জিক ওষুধ রয়েছে। ওষুধগুলি ঘাম নিঃসরণ রোধ করে। তবে এই ওষুধগুলির কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। নিয়মিত এই ওষুধ সেবনে রোগীর মুখ ও চোখে চোখ শুষ্কভাব দেখা যায়। হতে পারে কোষ্ঠকাঠিন্য। কারও কারও ক্ষেত্রে ইউরিন করতেও সমস্যা দেখা দেয়। দুঃশ্চিন্তা কমানোর যে সমস্ত ওষুধ রয়েছে সেগুলি খেলেও সমস্যা কিছুটা কমে, তবে এই ধরনের ওষুধের প্রতি রোগীর আসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। #অপারেশন: রোগীর শোচনীয় অবস্থা না হলে এবং সব ধরনের চিকিৎসা ব্যর্থ হলে তারপর অপারেশনের কথা ভাবেন চিকিৎসক। তবে সার্জারি করালে রোগীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়। এই অপারেশনের নাম সার্জিকাল সিমপ্যাথেকটমি। বড়সড় কাটাছেঁড়া করতে হয় না। মিনিমালি ইনভেসিভ এন্ডোস্কোপিক পদ্ধতিতে সার্জারি করা হয় বলে রোগীর শরীরে সামান্য ক্ষত তৈরি হয়। রোগী খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। ঘরোয়া উপায় #পায়ের দুর্গন্ধের কারণ কী? # শরীরের অত্যধিক ঘাম এবং মৃত কোষ হল ব্যাকটেরিয়ার খাবার। সেই খাবার খেয়ে ব্যাকটেরিয়া একধরনের রাসায়নিক নিঃসরণ করে। এই রাসায়নিকই দুর্গন্ধের উৎস। সারা শরীরের অন্যান্য অংশের থেকে পায়ে বেশি দুর্গন্ধ হওয়ার কারণ হল পা বেশি ঢাকাঢাকিতে থাকে। দেখবেন, বেশিরভাগ মানুষেরই মোজা খোলার পর পা থেকে দুর্গন্ধ বেরচ্ছে। মোজা এবং ঢাকা জুতো পরার কারণে পায়ে বায়ু চলাচলে সমস্যা হয়ে অতিরিক্ত ঘাম তৈরি হয়। তবে এছাড়াও নির্দিষ্ট অঞ্চলে রক্ত সঞ্চালন কম হওয়াও অত্যধিক ঘামের অন্যতম কারণ। ডায়াবেটিস মেলিটাস, হার্টের রোগ ইত্যাদি বিভিন্ন সমস্যা থেকে পায়ে স্বাভাবিক রক্তসঞ্চালন ব্যহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, বায়ু, পিত্ত এবং কফ হল শরীরের চালিকাশক্তির উৎস। শরীরে এগুলির অসামঞ্জস্যতা নানাবিধ সমস্যা ডেকে আনে। এখানে সমস্যার মূলে রয়েছে পিত্ত। আয়ুর্বেদ মতে, পিত্ত প্রকৃতির মানুষের ঘাম বেশি হয়। পিত্ত প্রকৃতির মানুষের লক্ষণগুলি হল—এরা গরম সহ্য করতে পারেন না। অম্ল জাতীয় খাদ্য খান (টক)। অন্যান্যদের তুলনায় একটু বেশিই চনমনে থাকেন ইত্যাদি। এছাড়াও পিত্ত বৃদ্ধিকারক আহার (খাদ্য) এবং বিহারের (জীবনযাপন) মাধ্যমেও অনেকের শরীরে পিত্ত বৃদ্ধি পায়। আবার শরীর গঠনের সাতটি ধাতুর মধ্যে মেদ ধাতুর (ফ্যাট) পরিমাণ বেশি থাকলেও অতিরিক্ত ঘাম হয়। # শীতে পায়ে দুর্গন্ধের সমস্যা বাড়ে কেন? #এভাবে শীত বলে নির্দিষ্ট কোনও ঋতুকে দায়ী করা ঠিক নয়। আসলে সমস্যাটা হল ঘামের। বেশিরভাগ মানুষ সারা বছর খোলা জুতো পরেন। মোজাও পরেন না। ফলে পায়ে ভেন্টিলেশনের কোনও সমস্যা হয় না। তাই দুর্গন্ধও থাকে না। অথচ শীত আসতেই শুরু হয় মোজা এবং পা ঢাকা জুতোর ব্যবহার। সেখান থেকে ঘাম। ঘাম থেকে দুর্গন্ধ। তাই শীত বলে আলাদা করে বলা যায় না। যাঁদের বেশি ঘাম হয়, তাঁরা সারা বছরই এই সমস্যায় ভুগতে পারেন। # চিকিৎসা কী? # চিকিৎসার প্রথম ধাপ হল শরীরের সেই নির্দিষ্ট জায়গার যত্ন। এটা দুভাবে করা যেতে পারে। প্রথমটি হল, পায়ের ভেন্টিলেশন নিশ্চিত করা। আর দ্বিতীয়টি অবশ্যই সেই জায়গার ব্যাকটেরিয়া নিধন। এবার এমন কয়েকটি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা পদ্ধতি সম্বন্ধে জেনে নেওয়া যাক # জলে কয়েকটি নিম পাতা ফেলে ফুটিয়ে ফেলুন। এবার সেই জল সহনযোগ্য ঊষ্ণতায় এলে পা দুটিকে ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে। নিমের অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতা জীবাণু নিধনে বিশেষভাবে কার্যকরী # অগ্নেয়গিরি থেকে উঠে আসা লাভা জমে পাথরে (ভলক্যানিক রক) পরিণত হয়। এই পাথরের নাম জিওলাইট। বাজারে প্যাকেটের মধ্যে জিওলাইট ভরে বিক্রি করা হয়। এই পাউচ প্যাকেটটি মোজার মধ্যে ভরে ব্যবহার করলেও পায়ের দুর্গন্ধ দূর হয় # গরম জলে চা মিশিয়ে তার মধ্যে দুটি পা আধঘণ্টা চুবিয়ে রাখলেও উপকার পাবেন। চায়ে উপস্থিত ট্যানিন নামক পদার্থটি ভালো অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ক্ষমতাসম্পন্ন # স্নান করার মোটামুটি আধঘণ্টা আগে পায়ে চন্দনাদি তেল ভালো করে মালিশ করে নিলেও পায়ে দুর্গন্ধের সমস্যা প্রতিহত করা সম্ভব # পায়ে ব্রাহ্মী তেল লাগালেও দুর্গন্ধ দূর হয় # এক্ষেত্রে আয়ুর্বেদের পঞ্চকর্ম থেরাপির অন্তর্গত বিরেচন (পারগেশন) অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন উপায়ে শরীরে ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রায় ৩০ বার মলত্যাগ করানো হয় # আমলকী হল পিত্তনাশক ফল। তাই প্রতিদিন ১ চামচ বা ৩ থেকে ৬ গ্রাম আমলকী চূর্ণ (পাউডার) ঘি-এর সঙ্গে মিশিয়ে খেলে শরীরের পিত্তবৃদ্ধিজনিত সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে # প্রতিদিন ১ চামচ ত্রিফলা চূর্ণ (হরীতকী, আমলকী ও বহেরা) ঘি মিশিয়ে খেলে ভালো ফল পাবেন # বিভিন্ন যোগ ব্যায়ামের মধ্যে পিত্তনাশক হিসাবে প্রাণায়াম করা খুবই উপকারী। তাই নিয়মিত প্রাণায়াম করুন # এছাড়াও নিয়মকরে ব্যবহৃৎ মোজা ও জুতো পরিষ্কার করতে হবে। চেষ্টা করুন খোলা জুতো পরার। মোজা সুতির কাপড়ের হলেই ভালো। দিনের শেষে পা ভালো করে পা ধুয়ে নিন। পায়ের গন্ধ দূর করবেন কীভাবে?