বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯
প্রকাশ : 2019-06-06

বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে

০৬জুন২০১৯,বৃহস্পতিবার,অনলাইন ডেক্স,নিউজ একাত্তর ডট কম:দেশে ধর্ষণের ঘটনা একে পর এক ঘটছেই। খবরের কাগজ উল্টালেই ধর্ষণের খবর পাচ্ছি। শতবর্ষী বৃদ্ধার ধর্ষিত হওয়ার খবর আমাদের সত্যিই ব্যথিত করে। বাড়িতে, কর্মস্থলে ও পথে-ঘাটে ধর্ষিত হয় নারী। ধর্ষকদের কাছে শিশু, বৃদ্ধাও রেহাই পায় না। মসজিদের ইমাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ড্রাইভার, হেলপার, সাংবাদিক, ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, রাজনৈতিক, পুলিশ, ব্যবসায়ী ঘরে বাইরে লাঞ্ছিত করে নারীদের। ওদের হাত থেকে আয়া, বুয়া,বুড়া কেউ বাদ যায় না। লাঞ্ছিত হয়, ধর্ষিত হয়।প্রশ্ন হলো ধর্ষণ রোধের উপায় কি? আলেম সমাজ বলবেন- 'পর্দা প্রথায় ফিরে আসলে ধর্ষণ আর হবে না।' আবার অনেকে বলবেন- 'কঠোর শাস্তি দিলে ধর্ষণ কমবে।' সবটাই মানি। ধর্ষকরা কুরুচিপূর্ণ হয় এ কথা কিন্তু সত্য। আমি বলব, আগে ধর্ষকদের মানুষিকতা বদলাতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের এ ব্যাপকতার পেছনে অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে, মূল্যবোধের অবনতি আর অপরাধীর শাস্তি না হওয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততাই এ জন্য দায়ী। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও নির্যাতনকারীরা বিভিন্ন উপায়ে পার পেয়ে যায়।আমরা জানি, বাংলাদেশের আইন ভারতের চেয়েও শক্তিশালী। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)-এর ৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ- কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে তবে সে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হবে। একই আইনের ৯(২) ধারায় আছে, 'ধর্ষণ বা ধর্ষণ-পরবর্তী কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটলে ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হবে।' একই সঙ্গে জরিমানার কথাও আছে। সর্বনিম্ন জরিমানা ১ লাখ টাকা। ৯(৩) ধারায় আছে, 'যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ওই ধর্ষণের ফলে কোনো নারী বা শিশু মারা যায় তাহলে প্রত্যেকের যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ড, কমপক্ষে ১ লাখ টাকা জরিমানা হবে।' ভারতে এ ক্ষেত্রে শুধু যাবজ্জীবনের কথা বলা আছে।অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসনে অযোগ্য লোক থাকায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাওয়া ও এর আরেক কারণ। এ ছাড়া ফৌজদারি আইনের দুর্বলতার কারণে অপরাধীর উপযুক্ত শাস্তি হয় না। এ বিষয়ে জনগণের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই এরা শাস্তি পাবে। শুধু আইন প্রয়োগের অভাবে এখানে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ মহামারী ব্যাপক রূপ নিয়েছে। আমাদের প্রচলিত ব্যবস্থায় অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান বেশ কঠিন। সব কিছুতেই আজ দলবাজি চলে। তাতে কিছু মানুষ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে। যৌন নির্যাতনের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক আছে। নারীর ওপর বলপ্রয়োগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটতে পারে। কখনও দেখা যায়, সামাজিকভাবে কোণঠাসা কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার আশায় অলীক কল্পনা করতে থাকে। কিন্তু কাঙ্খিত সমাধান না পেয়ে, বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। ঘরে-বাইরে নারীর ওপর আগ্রাসী যৌন আচরণ, যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ সবই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামোতে নারীর অধস্তনতাই প্রকাশ করে নানারূপে। তাই ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন, নারীর সম্মতি ছাড়া তার ওপর যে কোনো ধরনের আগ্রাসী যৌন আচরণ ক্ষমতা প্রদর্শনের, দমন-পীড়নের, কর্তৃত্ব করার কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। দৃষ্টিভঙ্গি পুরুষতান্ত্রিক বলেই নারীকে তারা গণ্য করে অধস্তন লৈঙ্গিক পরিচয়ের বস্তু হিসেবে- যা পীড়নযোগ্য। এটা খুবই আশঙ্কার কথা যে, সমাজে বেশিরভাগ নারীই নিরাপদ নয়। যারা উচ্চবিত্ত, সমাজের ওপরতলার মানুষ, এ জাতীয় বিপদ তাদের ছুঁঁতে পারে কম।এ দেশে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরাই বেশি। যারা নিম্নবিত্ত বাসিন্দা, তারা সম্ভবত এখনও ধর্ষণকে স্বাভাবিক মনে করেন। ভয়ে চুপ থাকেন। ইজ্জত হারিয়েও মুখ খোলেন না। তারা জানেন, আইন-আদালত করলে তাদের ভাগ্যে উল্টো বিপত্তি ঘটবে। অন্যায় করে অপরাধীরা এভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই দেশে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে আমরা ইমানি শক্তি হারিয়েছি। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ, যৌন কামনা ইত্যাদি নেতিবাচক প্রেরণা আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে। তাই সমাজ থেকে সুখ, শান্তি বা আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। নিঃশর্ত ভালোবাসা বা ভক্তি কমে যাওয়ার কারণে আমাদের গঠনমূলক মনোভাব বা সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে আমাদের ভোগের মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত যৌন কামনার প্রভাবে আমাদের মধ্যে ধর্ষণ, জেনা, পরকীয়া ইত্যাদির প্রবণতা বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী ভারতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে হৈচৈ পড়ে যায়। এ ব্যাপারে আমাদের দেশের জনগণ একেবারেই নীরব। সচেতন কম। প্রতিবাদ হয় না, হলেও খুবই সামান্য।আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে একাধিকবার চলন্ত বাসের ভেতর নারীর ওপর গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে সর্বস্তরের মানুষ তার জোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। আমাদের দেশে এমন ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটছে কিন্তু প্রতিবাদ নেই। নেই প্রতিকারও। ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, বাংলাদেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের হার ভারতের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশে সারা বছর ধর্ষণের ঘটনা নারী নির্যাতনের শতকরা ১৮ ভাগ, যা ভারতে ৯.৫ ভাগ। এ ছাড়া শুধু ঢাকায় সারা বছরে ধর্ষণের ঘটনা মোট নারী নির্যাতনের শতকরা ২০.৪৬ ভাগ, যা নতুন দিল্লিতে ৯.১৭ ভাগ। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের মতো সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অধিকাংশই এখনও তাদের ওপর নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনার কথা প্রকাশ করতে চান না। আর ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তারা পুলিশের কাছে থানায় কিংবা আদালতে মামলা করেন না। তাই সরকারের খাতায় প্রতি বছর যতগুলো ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি হবে বলে মনে করেন সমাজবিদরা।ধর্ষণ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ, লোভ-লালসা- নেশা, উচ্চাভিলাষ, সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই-ম্যাগাজিন, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ইত্যাদি মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে, তা বর্জন করতে হবে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যৌন শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। বাজে সঙ্গ ও নেশা বর্জন করতে হবে। ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগেও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নিজ নিজ পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, অশ্লীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অপরাধ তদন্তে ও অপরাধীদের বিচারাধীন রায় পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ধর্ষক যে-ই হোক তাদের দ্রুত আটক করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, সরকারকে নারীর মর্যাদার আসন নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের বদলে যেতে হবে। আসুন আমরা নারীর ওপর লোলুপ দৃষ্টি নয়; মায়া-মমতার দৃষ্টিতে তাকাই। পরনারীকে কখনও মা, কখনও বোন, কখনো বা মেয়ে ভাবতে হবে। তবেই ধর্ষণ, নারী নির্যাতন কমে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।ঘরের বাইরে নারীর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইন রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর বাস্তবায়ন নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজটিই এখন বেশি জরুরি।ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শহরেই বহু কর্মজীবী নারীকে সন্ধ্যার পর কর্মস্থল থেকে একাকী ঘরে ফিরতে হয়। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার প্রশাসন তা সুনিশ্চিত করবে, এমনটাই মানুষের প্রত্যাশা। ধর্ষকদের ধরতে হবে প্রথমে, এরপর সুষ্ঠু তদন্তও বিচারের মাধ্যমে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ধর্ষিতাদের সার্বিক সহায়তা দেয়াটাও সরকারে মানবিক কর্তব্য। এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যাতে নারীরা ঘরের বাইরে নিজেদের নিরাপদ ভাবে। কাজটা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। লেখকঃ লেখক: মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী , সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট , গবেষক ও সম্পাদক-নিউজ একাত্তর ডট কম ।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর