প্রকাশ : 2019-12-06

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের অবদান চিরস্মরণীয়

০৬ডিসেম্বর,শুক্রবার,নিউজ একাত্তর ডট কম: আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গণপ্রতিরোধের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। গণসংগ্রামের ইতিহাসের ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল। ১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ সেই কালরাতের পরের ইতিহাস প্রতিরোধ যুদ্ধে ভাস্বর। শহর থেকে গ্রামে মানুষ প্রথমে হতচকিত ও হতভম্ব বনে গেলেও তার পরেই শামিল হয়েছিল প্রতিরোধ যুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর অবদান তেমনি এক অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধ পর্বে পুলিশের অবদান চিরস্মরণীয়। স্বাধীন দেশে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন অকুতোভয় পুলিশদের সে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বর্বর পাক হানাদার বাহিনী যখন নির্বিচারে বাঙালিদের হত্যা করেছিল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে তখন প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। ওয়্যারলেসযোগে রাজারবাগ থেকে প্রতিরোধের এ খবর সারা দেশের সব পুলিশ ফাঁড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়। এরপর প্রায় ১৩ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য পাকিস্তানি কমান্ড থেকে বেরিয়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ৩০৩ রাইফেল দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এবং নিঃশঙ্ক চিত্তে লড়াই করে দেশের তরে, মাতৃভূমির তরে জীবন উৎসর্গ করে। হানাদারদের ভারী অস্ত্রের গোলায় ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল সবকটি পুলিশ ব্যারাক, অসংখ্য পুলিশ সদস্য মৃত্যুবরণ করেন, তবুও কেউ মাথা নত করেনি। প্রকৃত অর্থে, মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ বাহিনীর বিদ্রোহই পাকিস্তান বর্বর বাহিনীকে হোঁচট খাইয়ে দিয়েছিল।১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যরা অস্ত্রাগারের ঘণ্টা পিটিয়ে সবাইকে সতর্ক ও একত্রিত করে। অস্ত্রাগারে কর্তব্যরত সেন্ট্রির রাইফেল থেকে গুলি করে অস্ত্রাগারের তালা ভাঙে এবং তৎকালীন আরআই মফিজ উদ্দিনের কাছ থেকে জোর করে অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ে নিজেদের মধ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিতরণ করে। প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পুলিশ সদস্যরা পুলিশ লাইনের চারদিকে, ব্যারাক ও বিভিন্ন দালানের ছাদে অবস্থান নেয় মাত্র ৫ মিনিট পর পাকসেনাদের কনভয় রাজারবাগ পুলিশ লাইনের মেইন গেটে এসে পৌঁছে এবং বাঙালি পুলিশ সদস্যরা কৌশলগত স্থানে পজিশন নেয়। রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে রাজারবাগ পুলিশ লাইনের দক্ষিণ-পূর্ব দিক (পুলিশ হাসপাতাল কোয়ার্টার সংলগ্ন) থেকে প্রথম গুলিবর্ষণ হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই প্যারেড গ্রাউন্ডের উত্তর-পূর্ব দিক (শাহজাহানপুর ক্রসিং) থেকে গুলির শব্দ পাওয়া যায়। ব্যারাকের ছাদে অবস্থানরত বাঙালি পুলিশ সদস্যরা পাকসেনাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে। শুরু হয় দখলদার পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ। রাত ১২টায় বাঙালি পুলিশ সদস্যদের মরণপণ প্রতিরোধে থমকে যায় ট্যাংক ও কামান সজ্জিত পাকবাহিনী। একটু পরেই মর্টার ও হেভি মেশিনগান দিয়ে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পিআরএফ-এর ৪টি ব্যারাকে আগুন ধরে যায়। পাকবাহিনী ট্যাংক বহরসহ প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করে। এ আক্রমণে পাকবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় আটশ। রাত ১২টা ৩০ মিনিটে পাকবাহিনীর ভারী অস্ত্রের মুখে বাঙালি পুলিশ সদস্যরা তাদের কৌশল পরিবর্তন করে। গেরিলা পদ্ধতিতে পাকবাহিনীর ওপর হামলা চালায় এবং অনেককে হতাহত করে। পুলিশের অপর একটি গ্রুপ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ মালিবাগ চামেলিবাগ প্রান্ত দিয়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সেদিনের সেই অস্ত্র আর গোলাবারুদ ব্যবহৃত হয়েছে সারা দেশে, সীমান্তবর্তী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে এবং সম্মুখযুদ্ধে। রাত ৩টা ৩০ মিনিটে কামান আর মর্টারের আক্রমণ থামে, তবে বন্দি হয় প্রায় দেড়শ বাঙালি পুলিশ, রাজারবাগ পুলিশ লাইন দখল করে নেয় দখলদার বাহিনী, তার আগেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনের কিছু বীর বাঙালি অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ রাজারবাগ ত্যাগ করেন। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর বাংলাদেশের পুলিশের নাম প্রথমে ইস্ট বেঙ্গল পুলিশ রাখা হয়। পরবর্তীতে এটি পরিবর্তিত হয়ে ইস্ট পাকিস্তান পুলিশ নাম ধারণ করে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত এ নামে পুলিশের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন ডিপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল, বেশ কয়েকজন এসপিসহ প্রায় সব পর্যায়ের পুলিশ সদস্য বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে জীবনদান করেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকেই প্রদেশের পুলিশ বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব হারিয়েছিল পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার। পরবর্তীতে পুলিশের এ সদস্যরা ৯ মাসজুড়ে দেশব্যাপী গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রে ১২৬২ জন শহীদ পুলিশ সদস্যের তালিকা উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত ঝিনাইদহের তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে ঐতিহাসিক গার্ড অব অনার প্রদান করেন।২০১৩ সালের মার্চ যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর স্থাপন একটি মহতী উদ্যোগ। সেই দিনের ত্বরিত সিদ্ধান্ত, সাহসিকতা ও বীরত্ব গাথার বিভিন্ন প্রমাণ বহন করছে এ বাংলাদেশ পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি সেইসব পুলিশ সদস্যকে যারা বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই সব মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনাসহ সব নারী যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। তোমাদের ঋণ শোধ হওয়ার নয়। লেখকঃ মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন চৌধুরী, সাংবাদিক,কলামিষ্ট ,সম্পাদক নিউজ একাত্তর ডট কম ও চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান,দৈনিক আজকের বিজনেস বাংলাদেশ ।

মুক্ত কলম পাতার আরো খবর