মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৮
প্রকাশ : 2018-03-14

দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শরিক হতে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নিজস্ব শিল্প পার্ক গড়ে তোলার জন্য সরকার তাদের ৫শ একর বা তারও বেশি জমি বরাদ্দে প্রস্তুত রয়েছে। সারাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার ব্যবসায়ীদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধা প্রদান করছে। এই সুবিধা গ্রহণ করে সেখানে শিল্প স্থাপনের জন্য সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ীরা এগিয়ে আসতে পারে। গতকাল মঙ্গলবার সিঙ্গাপুরের হোটেল সাংগ্রীলাতে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ব্যবসায়ী ফোরামের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুর, সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন, বাংলাদেশ বিজনেস চেম্বার অব সিঙ্গাপুর যৌথভাবে নতুন অধ্যায়ের পথে বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব শীর্ষক প্রতিপাদ্য নিয়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে বিদেশী ব্যবসায়ীদের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনিয়োগের স্থান উল্লেখ করে তিনি সরকারের ব্যবসায়ীদের জন্য আইন দ্বারা বিদেশী বিনিয়োগের সুরক্ষা প্রদান, কর অবকাশ, যন্ত্রাংশ আমদানী করে শিল্প স্থাপনে স্বল্প শুল্ক ধার্য, যে কোন সময় লভ্যাংশসহ শতভাগ মূলধন প্রত্যাহারের সুবিধা, রেমিট্যান্স রয়্যালিটি প্রদান, তরুণ ও কর্মদক্ষ জনশক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক বেতন ভাতার সুবিধার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, জাপান এবং নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশী পণ্যের কোটামুক্ত এবং শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জাতিকে আমাদের ডিজিটাইজেশনের অংশ হিসেবে রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১-এর মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরের পথে এগিয়ে চলেছি। যেখানে ২০২১ নাগাদ দেশকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত সমৃদ্ধশালী হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। শেখ হাসিনা বলেন, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই শহরের ভোক্তা শ্রেনী হবে। যা একটি বিশাল বাজারের সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, গেল অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, রিজার্ভের পরিমান বর্তমানে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। যেখানে ২০০৫ সালে এই রিজার্ভের পরিমান ছিল ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমাদের রপ্তানীর পরিমান ছিল ৩৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার, দারিদ্রের হার যেখানে ২০০৫ সালে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, তা বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৭২ বছর ৬ মাস হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে জনগণের মাথাপিছু আয় ১৬শ ১০ মার্কিন ডলার। ক্রয় সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বীকৃতি হিসেবে শিগগিরই বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গ্রাজুয়েশন লাভ করতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের তৈরী পোষাক শিল্পের খ্যাতি বিশ্বজোড়া উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৭ সালে তৈরী পোষাক খাতে আমাদের রপ্তানীর পরিমান ছিল ৩০ বিলিয়ন ডলার। সেক্ষেত্রে পোষাক রপ্তানীর শীর্ষ দেশ চীনের পরের অবস্থানটিই বাংলাদেশের। তিনি বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ তৈরী পোশাক খাতে রপ্তানীর পরিমান ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। ওষুধ শিল্পের সমৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় চাহিদার ৯৭ শতাংশ মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আমাদের তৈরী ওষুধ বিশ্বের ১২০টি দেশে রপ্তানী হচ্ছে। দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাত এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে এখন বিশ্বমানের হালকা ও মাঝারি ধরনের সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরী হচ্ছে। একইসঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগে দেশের বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে গড়ে উঠছে অত্যাধুনিক আইটি পার্ক। ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানীর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেই এগিয়ে যাচ্ছে দেশের আইটি খাত। ব্যবসায়ী সপ্রদায়ের অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শেষে দু দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য জোরদারের অংশ হিসেবে দু দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে চারটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সিঙ্গাপুরের বাণিজ্য শিল্প মন্ত্রী লিম হং কিয়াং অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং ইন্টারন্যাশনাল এন্টারপ্রাইজ সিঙ্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত সিইও ক্যাথি লাই এবং সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশনের চেয়ারম্যান এসএস তেও অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, বিদ্যুৎ জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং সিঙ্গাপুর ও বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সিঙ্গাপুরে নিজের নামের অর্কিড উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ইউনেস্কো বিশ্ব হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনের ন্যাশনাল অর্কিড গার্ডেনে নিজের নামের একটি অর্কিড উন্মোচন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রথম সফরটি স্মরণীয় করে রাখতে অর্কিডটির নাম ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা রাখা হয়েছে। গত রবিবার সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের আমন্ত্রণে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশটিতে তার প্রথম সরকারী সফরে যান শেখ হাসিনা। সিঙ্গাপুরের জাতীয় ফুল অর্কিডের যে প্রজাতির নাম ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা রাখা হয়েছে, বোটানিক বাগানের কর্মকর্তারা সানপ্লাজা পার্ক ও সেলেটার চকোলেট প্রজাতির শংকরায়নের মাধ্যমে সেটি উদ্ভাবন করেন। সিঙ্গাপুর জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিচালক ড. নাইজেল টেইলর সি হর্ট সকালে এখানে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা অর্কিডটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি, তার স্ত্রী পেপী সিদ্দিক ও তাদের দু সন্তান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। নতুন অর্কিডটির শংকরায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বাগানের ব্যবস্থাপক ডেভিড লিম বলেন, ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা অর্কিডটির শংকরায়ন এবং পত্র-পল্লবে বিকশিত হতে সাড়ে চার বছর সময় লেগেছে। এই হাইব্রিড অর্কিড ২৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। প্রতিটি গাছেরই ১৫টি ফুলের থোকা ধরে। প্রতিটি প্রস্থে ৫ সে.মি. হয়। প্যাঁচানো প্রতিটি ফুলের গোড়া গাঢ় পিঙ্গল রঙের এবং ফুলের মাঝখানে হালকা বাদামী ও ধবধবে সাদা প্রান্ত থাকে। সিঙ্গাপুরের রীতি অনুসারে ১৯৫৭ সাল থেকে দেশটিতে সফরকারী বিভিন্ন দেশের প্রায় আড়াইশো রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের নামে স্থানীয় অর্কিডের নামকরণ করা হয়েছে বলেও ডেভিড লিম জানান। তাদের সফরকে স্মরণীয় করে রাখতেই এটা করা হয়। ডেনড্রোবিয়াম শেখ হাসিনা অর্কিডটি এখন থেকে গার্ডেনের ভিআইপি গ্যালারির শোকেসে শোভা পাবে। প্রধানমন্ত্রী পুরো অর্কিড বাগানের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। বাগানটিতে ১ হাজার প্রজাতি ও ২ হাজার শংকরায়নকৃত উদ্ভিদ রয়েছে। সফর সংক্ষিপ্ত করে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গাপুরে সরকারি সফর একদিনের জন্য সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত সোমবার নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সফর সংক্ষিপ্ত করে তিনি দেশে ফিরেন। প্রধানমন্ত্রী এবং তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি নিয়মিত ফ্লাইট গতকাল সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিটে ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতকি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের আমন্ত্রণে চারদিনের সরকারি সফরে রবিবার সিঙ্গাপুরে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার বিকালে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা ছিলো। কিন্তু সোমবার বিকালে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনের এয়ারক্রাফট বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় দুর্গত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে তার সফর একদিন সংক্ষিপ্ত করেন। সিঙ্গাপুর সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন এবং সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট হালিমা ইয়াকুবের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মানে সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত ভোজসভায় যোগদান ছাড়াও তিনি হোটেল সাংগ্রীলাতে সিঙ্গাপুর-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম এবং বিজনেস রাউন্ডটেবিলে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। শেখ হাসিনা বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম বাণিজ্যিক বন্দর পোর্ট অব সিঙ্গাপুর পরিদর্শন করেন। তিনি ইউনেস্কোর একটি বিশ্ব ঐতিহ্য সিঙ্গাপুর বোটানিক গার্ডেনের ন্যাশনাল অর্কিড গার্ডেন পরিদর্শন করেন এবং নিজের নামে একটি অর্কিড উন্মোচন করেন।

জাতীয় পাতার আরো খবর