বুধবার, জুন ৩, ২০২০
প্রকাশ : 2020-04-28

সংবাদপত্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র

২৮এপ্রিল,মঙ্গলবার,অনলাইন ডেস্ক,নিউজ একাত্তর ডট কম: অবশেষে পার্লামেন্ট সদস্যরা প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। ইস্টারের দীর্ঘ ছুটির পর বুধবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে শেষ পর্যন্ত একজন এমপি প্রশ্ন করেছেন। লেবার পার্টির নতুন নেতা কির স্টারমার হাউস অব কমন্সে পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছেন। যদিও পরিসংখ্যান, সরবরাহ, পরীক্ষা ও কেয়ার হোম নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রশ্ন করে যাচ্ছে গণমাধ্যম। সংবাদপত্রে মন্ত্রীদের চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তুলনামূলক চিত্র দেখানো হয়েছে, রসদ স্বল্পতা ও অসত্য মিথ্যা ভাষণ প্রকাশ করা হয়েছে। এই সময়টাতেও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা কিছুটা হলেও বহাল থেকেছে। তবে সেটি এমপিদের মাধ্যমে নয় বরং গণমাধ্যমের সহায়তায়। আমি সাধারণত নিজের শিল্প নিয়ে ঢোল পিটাই না। সংবাদপত্রগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই আত্মতুষ্টির শিল্প। কিন্তু এই মহামারী যখন শেষ হয়ে যাবে তখন সংবাদপত্রগুলোর চলার পথ বন্ধ হয়ে গেলে বা দেউলিয়া হয়ে গেলেও সাধারণ মানুষ রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কোনো সাংবাদিকের সম্মানে লাইনে দাঁড়িয়ে হাততালি দেবে কিনা আমার সন্দেহ আছে। অন্যান্য গণমাধ্যম তাদের মতো করে কাজ করছে। তবে আমি বিবিসির মোর অর লেস, ব্রিফিং রুম এবং চ্যানেল ফোরে বিজ্ঞানীদের বিতর্ক অনুষ্ঠানের কমবেশি সমীহ করি। তবে ডাউনিং স্ট্রিটের ওই দৈনিক নিরস সংবাদ সম্মেলনের বিকল্প পেতে চাইলে অবশ্যই আমাদের আন্তরিকত সংবাদপত্রগুলোর দিকে নজর দিতেই হবে। গত সপ্তাহে আমরা যদি মাস্ক পরা নিয়ে মন্ত্রীদের ওপর নির্ভর করে থাকতাম বা তাদের ছাপোষা বিজ্ঞানীদের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতাম তাইলে কিন্তু কিছুই জানা যেত না। যদি আমরা কভিড-১৯ এ মৃত্যুর পরিসংখ্যানের বিষয়ে সরকারি বার্তার ওপর নির্ভরশীল থাকলে আমরা জানতেই পারতাম না যে, ওই সংখ্যাটা কেবল ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের হাসপাতালে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা, কেয়ার হোম বা বাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা এটিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে নেয়া হোয়াইটহলের (ব্রিটিশ সরকার) ভাইরাস মডেলটি স্বাধীন মহামারী বিশেষজ্ঞদের কিন্তু সংবাদপত্রের মাধ্যমেই চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। (পরে সেটি পরিত্যক্ত হয়)। স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, করোনা পরীক্ষা নিয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির এবং রাজধানীর অব্যবহৃত আইসিইউ শয্যা নিয়ে তথ্য কিন্তু সাংবাদিকরাই তুলে ধরেছিলেন, কোনো এমপি নন। অবশ্যই গণমাধ্যম খবর প্রকাশ সমাধানের মতো সমস্যাও বটে। মানুষের আগ্রহ ও নেতিবাচক সংবাদের প্রতি সংবাদপত্রের আসক্তির কারণেই সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি এবং ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিগুলো প্রধান শিরোনাম হয়ে ওঠে।বণিক বার্তা। বিবিসির নিউজ টেন তো দেখার অযোগ্য পড়েছে। এরা যেভাবে মানুষের আচরণ নিয়ে অসন্তোষের কথা প্রচার করতে তা নামান্তরে মান্য করো নয়তো মরো সরকারের এই বার্তাকেই শক্তিশালী করছে। এভাবে আতঙ্ক প্রচার করার ফলে হয়তো তারা দর্শক পাচ্ছে, কিন্তু এ কৌশল তো সাধারণ মানুষকে বিষয়টি বুঝতে কোনো সহায়তাই করছে না। এই মুহূর্তে করোনাভাইরাস নিয়ে জানা ও অজানার মধ্যে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে তা ত্রাসের রাজনীতির জন্য খুবই সহায়ক। এই সময়ের রাজনীতিকদের অনুপস্থিতির কারণেই সাংবাদিকদের মন্ত্রণালয়গুলোর বিভ্রান্তি ও বিমুঢ়তার পর্দা ভেদ করতে হচ্ছে। একমাত্র জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের সর্বশেষ চার্টকে কেমব্রিজের পরিসংখ্যানবিদ ডেভিড স্পাইজেলহল্টার অন্যান্য অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর সঙ্গে কভিড-১৯ এর মৃত্যুর একমাত্র নিরপেক্ষ তুলনা বলে অভিহিত করেছেন। এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে পাঁচ বছরের গড় মৃত্যুর তুলনায় অতিরিক্ত মৃত্যুর চিত্র। যদিও এটা খুশি হওয়ার মতো কোনো তথ্য নয়, তবে এটা অন্তত অর্থবহ। পার্লামেন্টে এমন তথ্য কেউ উল্লেখ করেননি। এগুলো আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছি। মানুষের জীবন বনাম অর্থনীতির বিতর্ক যখন ক্রমেই উচ্চকিত হচ্ছে, সেটিও আলোচনার একমাত্র প্ল্যাটফর্ম গণমাধ্যম। এই সঙ্কট থেকে মুক্তির নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক লকডাউনে রয়েছে। সরকার বলছে এটা এখন ভাবার সময় নয়। এ ধরনের বক্তব্য হয়তো তাদের মাঝেমধ্যে গৃহীত স্বৈরতান্ত্রিক নীতিতে কিছুটা আবরণ ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু এটা এই সময় সঠিক নীতি নয়। এই মহামারীতে অর্থনীতি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমনটি হয়নি। এ কারণে এই সময় সরকারের নীতি কৌশল নিয়ে পার্লামেন্টে গভীর পযালোচনা হওয়া উচিত। এটা জরুরি। এটি সাধারণ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও দরকারি। তথ্য হলো আশ্বস্ত করার উপকরণ। তর্ক-বিতর্কে হয় ক্ষমতায়ন, এটি মানুষের মধ্যে আতঙ্ক প্রশমন করে। সরকার যদি মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় মধ্যে চরম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই আগে আস্থা অর্জন করতে হবে। সংবাদপত্র এখন এক অদ্ভূত পরিস্থিতির মুখোমুখি: সীমিত বিজ্ঞাপনের বাজার বহু বিস্তৃত হয়ে যাওয়ার মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মধ্যে অনলাইন। দ্য গার্ডিয়ান, টাইমস, টেলিগ্রাফ ও ফিনান্সিয়াল টাইমসের অনলাইনে পাঠকদের সংখ্যা বেড়েছে, কিছু ক্ষেত্রে সেটা দ্বিগুণ হয়েছে। নির্ভরযোগ্য, সুসম্পাদিত এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক খবরের চাহিদা নিঃসন্দেহে আকাশচুম্বি। এতে অর্থযোগ প্রায় অসম্ভব। সংবাদপত্রের সুরক্ষা প্রাচীর হলো বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব। কিন্তু এ দুটি খাত থেকেই অনবরত আয় কমে যাচ্ছে। সংবাদপত্রগুলো ভালো সংবাদিকতার মূল দিয়ে যাচ্ছে আর লাভবান হচ্ছে গুগল ও ফেসবুকের মতো প্রতিষ্ঠান। এই সঙ্কটে স্থানীয় অনেক সংবাদপত্র টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। যেখানে ছাপা পত্রিকাগুলোর ভবিষ্যত আরো ভয়ঙ্কর। বড় যারা এদের খেয়ে ফেলছে তারা অবশ্য স্থানীয়দের এই করুণ দশায় তাদের দায় স্বীকার করছে। এরই মধ্যে বিবিসি তার স্থানীয় বার্তাসংস্থাগুলোর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু স্থানীয় সংবাদপত্রকে ভর্তুকি দেয়া শুরু করেছে। গুগল ছোট ও মাঝারি প্রকাশনাগুলোকে অনুদান দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এটা যেন টর্পেডোর আঘাতে ডুবতে থাকা জাহাজে লাইফর দেয়ার মতো উপহাস! তবে স্বাধীন সংবাদ পরিবেশন ও চলমান নানা বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা তুলে ধরা যে শিল্পের প্রধান কাজ তার জন্য রাষ্ট্রীয় সমর্থনের আইডিয়া আমি পছন্দ করি না। এখন নির্ভর করছে আগামী মাসগুলোতে সরকার কীভাবে পরিচালিত হয়। আমি এখনও বিশ্বাস করি, বেশিরভাগ পত্রিকা আগামী দিনগুলোতে নিজের মতো চলতে পারবে। এরই মধ্যে মন্ত্রীদের নির্দেশে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের বিজ্ঞাপন কমিয়ে আনা হয়েছে। গত বছরের কেয়ারএনক্রস রিপোর্টে সংবাদপত্র সংগঠনগুলোকে ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলো থেকে কিছু অর্থ দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। এটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আরো বিস্তৃত করার পদক্ষেপেরই একটি অংশ হতে পারে এটি। সংবাদপত্রগুলো এখন যেটি পারে সেটি হলো বর্তমানের এ সঙ্কট যাদের চরম ভোগান্তি ও যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের অব্যাহতভাবে প্রশান্তি দিয়ে যাওয়া। কিন্তু তারা যদি ক্রমেই অদৃশ্য হয়ে যেতে শুরু করে তবে তারা শুধু সরকারের করোনাভাইরাস নীতির আরেক শিকারে পরিণত হবে তা নয়। তারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র। লেখক: সাইমন জেনকিন্স, দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার কলাম লেখক

বিশেষ প্রতিবেদন পাতার আরো খবর