ব্রেকিং নিউজ


add_27
মুসলমানদের পরাশক্তি হতে হবে

৩১ মার্চ ২০২২, নিউজ একাত্তর ডট কম : ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে বৈশ্বিক বিভাজন স্পষ্ট হয়েছে। পুনরায় শুরু হয়েছে স্নায়ুযুদ্ধ, যার একদিকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন তার মিত্ররা, অন্যদিকে চীন-রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন মিত্ররা। এর বাইরের মানুষ নির্জোটকে কার্যকর ও শক্তিশালী করার কথা বলছে। কিন্তু তার নেতৃত্ব দেবে কে? মুসলমানদের আকাক্সক্ষা- বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে মুসলমানদের পরাশক্তি হতে হবে। সে জন্য মুসলমানের সংখ্যা, আর্থিক ও সামরিক শক্তি এবং অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যই যথেষ্ট। এখন প্রয়োজন উদ্যোগ ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। বর্তমানে মুসলমানের সংখ্যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যের উপর ভিত্তি করে ভিজুয়াল ক্যাপিটালিস্ট ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যার ৮৪% ধর্ম বিশ্বাসী। এর মধ্যে প্রধান ধর্মগুলো হচ্ছে: খ্রিস্টান, ইসলাম, বৌদ্ধ ও হিন্দু। তন্মধ্যে ৩১% খ্রিস্টান (২৪০ কোটি), ২৫% মুসলমান (১৮০ কোটি), হিন্দু ১২০ কোটি, মাত্র ০.২% ইহুদি। তবে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হিসেবে শীর্ষে রয়েছে ইসলাম। তাই মুসলমানের ১৮০ কোটি থেকে বেড়ে ৩০০ কোটি হবে ২০৬০ সালে। বর্তমানে মুসলিম অধ্যুষিত দেশ ৫৭টি, যারা ওআইসির সদস্য। এর বাইরে আরও কয়েকটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ রয়েছে। উপরন্তু বহু অমুসলিম দেশে অসংখ্য মুসলমান রয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক রয়েছে ভারতে, প্রায় ২০ কোটি। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার মতে, বর্তমানে বিশ্বের মোট সম্পদের ৬০% রয়েছে মুসলিম দেশে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামরিক ক্ষেত্রেও কয়েকটি মুসলিম দেশ খুবই অগ্রগামী। তবুও মুসলমানরা নিগৃহীত, নিষ্পেষিত, শোষিত, বঞ্চিত ও দরিদ্র। মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে মিয়ানমারের আরাকান, ভারতের কাশ্মীরসহ সমগ্র দেশে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও মুসলমানরা ব্যাপক ধর্মীয় বিদ্বেষের শিকার। অনেক অমুসলিম দেশে মুসলিম নারীদের বোরকা ও হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়ায় ভয়াবহ আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক প্রাণহানি ছাড়াও দেশগুলো ধ্বংস করেছে সভ্যতা, গণতন্ত্র ও মানবতাবাদের মুখোশধারী পশ্চিমারা। তারা শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও বৈষম্য করে। ইউক্রেনের খ্রিস্টান-ইহুদি শরণার্থীদের এখন যেভাবে সাদরে গ্রহণ করছে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম শরণার্থীদের ক্ষেত্রে তা করেনি, বরং বাধা দিয়েছে! ইসরাইলে ইহুদিদের দ্বারা ফিলিস্তিনি মুসলিমদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে বহুদিন থেকেই। উপরন্তু ফিলিস্তিনে জোরপূর্বক ইহুদি বসতি স্থাপন করাচ্ছে ইসরাইল। তাই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ইসরাইলের ভেতর ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপারে ইসরাইলের নীতি, আইন, আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদের সমতুল্য। ইসরাইল জাতিসংঘের নীতি, সিদ্ধান্ত ও বিশ্ব জনমত লঙ্ঘন করেই এসব করছে আমেরিকার সহায়তায়। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনেট মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনের উত্তম পথ- দু’রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান’ প্রত্যাখান করেছেন। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে, বিধর্মীরা বিশ্বব্যাপী ইসলাম ভীতি ছড়াচ্ছে। তাই প্রায়ই বিধর্মী জঙ্গিদের আক্রমণে মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে বিভিন্ন দেশ। এমনকি মসজিদে পর্যন্ত হামলা হচ্ছে। তাই গত ১৫ মার্চ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ওআইসি’র পক্ষে পাকিস্তান ১৫ মার্চকে ‘বিশ্ব ইসলাম ভীতি প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব করে, যা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এখন থেকে ১৫ মার্চ ‘বিশ্ব ইসলাম ভীতি প্রতিরোধ দিবস’ পালিত হবে বিশ্বব্যাপী। অবশ্য, মুসলমানদের চরম দুর্দশার জন্য তারা নিজেরাও দায়ী কম নয়। তাদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক অনৈক্য। রয়েছে মাজহাবি বিভক্তি! উপরন্তু তারা একে অপরকে চরম শত্রুও মনে করে এবং প্রায়ই হানাহানিতে লিপ্ত হয়। এছাড়া, অনেক মুসলিম দেশে ভাতৃঘাতি যুদ্ধ-সংঘাতে ব্যাপক নিহত-আহত ও সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। রাষ্ট্রের মধ্যে চরম শত্রুতাও রয়েছে। কিছু মুসলিম সন্ত্রাসী কর্মে লিপ্ত হয়েছে বিধর্মীদের ইন্ধন ও অর্থায়নে, যারা জঙ্গি বলে অভিহিত হচ্ছে। কিছু ধনাঢ্য মুসলিম চরম ভোগ-বিলাস ও অপচয়ে মত্ত। যারা শিক্ষিত, তারাও নানা ভাগে বিভক্ত। অনেক মেধাবী, বিজ্ঞানী ও গবেষক মুসলিম নিজ দেশে মূল্যায়িত না হওয়ায় অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানের কল্যাণ করছে! উপরন্তু বেশিরভাগ মুসলমান অশিক্ষিত ও দরিদ্র। আন্তঃমুসলিম দেশের মধ্যে ব্যবসা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, পর্যটন ইত্যাদি খুব কম, অমুসলিম দেশের সাথেই বেশি। বর্তমান বিশ্বে সর্বোত্তম রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থা হচ্ছে গণতন্ত্র, যার সূচনা ঘটিয়েছেন নবী করিম (সা.)। তিনি জীবদ্দশায় তার কোনো উত্তরসূরি মনোনীত করেননি। তার ওফাতের পর সাহাবীরা ও জনগণ মিলে তা মনোনীত করার লক্ষ্যেই তিনি সেটা করেছেন। এটাই গণতন্ত্রের মূল স্পিরিট। তবুও বেশিরভাগ মুসলিম দেশে গণতন্ত্র নেই! সুশাসন ও ইনসাফেরও একই অবস্থা! অধিকাংশ মুসলমান ইসলামের মূল নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে রীতি ও কুসংস্কারনির্ভর হয়ে পড়েছে। তাই হালাল রুজি ইবাদত কবুলের শর্ত হওয়া সত্ত্বেও তা পালন করা মুসলমানের সংখ্যা নগণ্য! এসব নানা কর্মে মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর বিধর্মীরা লাভবান হচ্ছে। অথচ মুসলমানের অতীত খুবই সমৃদ্ধ। আজকের আধুনিক সভ্যতার সূচনা ঘটিয়েছেন মুসলিম মনীষীরাই। উসমানিয়া সাম্রাজ্য ছিল, ছিল পারস্য সাম্রাজ্য, তুর্কী সাম্রাজ্যের পরিধিও ছিল প্রায় বিশ্বের অর্ধেক ও কয়েক শতাব্দীব্যাপী। শাসন ব্যবস্থাও ছিল খুবই কল্যাণকর। ফলে মুসলমানদের পুনরুত্থান ঘটতে পারে এই আশংকায় বিধর্মীরা শঙ্কিত। তাই তারা মুসলমানের পুনরুত্থান ঠেকাতে পরিকল্পতিভাবে ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী ব্যাপক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে! কিন্তু তাতে সফল হবে না তারা। ইসলামের পুনরুত্থান হবেই। কারণ, ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম, সর্বজনীন ধর্ম, কল্যাণের ধর্ম। ক্রমান্বয়েই মুসলমানের সংখ্যা বাড়ছে। জ্ঞানী-গুণীরাও মুসলমান হচ্ছে। তাই ঐক্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব পেলেই মুসলমানের বিজয় অবশ্যম্ভাবী। মুসলমানদের পরাশক্তি হওয়ার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন ঐক্য ও সম্প্রীতি। যে আল্লাহ ও তার রাসুলকে মানে ও বিশ্বাস করে সে-ই মুসলমান, সে-ই ভাই। পালন করতে হবে এই নীতি। জ্ঞানের উপর আল্লাহ ও তার রাসুল খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষা ছাড়া জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। তাই প্রতিটি মুসলিমকেই জ্ঞানী হওয়ার জন্য ধর্ম ও আধুনিক কর্মভিত্তিক এবং মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা এবং আবিষ্কার ও গবেষণার দিকে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শরিয়া আইন মেনে নারীরও শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিত হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মা শিক্ষিত না হলে সন্তানের শিক্ষার সমস্যা হয়। ধর্মীয় উগ্রতা, রীতি ও কুসংস্কার অনইসলামিক। তাই এসব ত্যাগ করতে হবে। ধর্মীয় পণ্ডিতদের দিয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি ফতোয়া কমিটি করতে হবে ওআইসিতে, যার শাখা করতে হবে সব মুসলিম দেশেই। এর প্রধান কর্ম হবে ধর্মীয় বিতর্কিত বিষয়ে সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করা। মুসলিম দেশগুলোর আন্তঃরাষ্ট্রের সব সংকট নিরসন করতে হবে ওআইসির মাধ্যমে। সব মুসলিম দেশেই সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে স্বীয় প্রচেষ্টায়। সব আর্থিক কর্মকাণ্ড করতে হবে নিজেদের মধ্যে। উপরন্তু ‘মুসলিম ফ্রি ট্যুরিস্ট ভিসা’ চালু করতে হবে। তাহলে পর্যটন খাতের ব্যাপক উন্নতি হবে। এছাড়া, আইডিবি’র মাধ্যমে মুসলমানের জাকাত সংগ্রহ করে গরিব মুসলিম দেশের শ্রমঘন খাতে বিনিয়োগ এবং তার মুনাফা দিয়ে শিক্ষা সহায়ক ফান্ড গঠন করতে হবে। তবে, এই শিল্পে শুধুমাত্র জাকাত হকদারদেরই নিয়োগ দিতে হবে। উপরন্তু একই পদ্ধতিতে শিক্ষা ফান্ড থেকে গরিব শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে হবে। এসব হলে গরিব মুসলিমদের কল্যাণ বেশি ও স্থায়ী হবে। তারা দারিদ্রমুক্ত হবে। সব মুসলিম দেশের সাধ্য মতো সামরিক শক্তি বাড়াতে হবে। কামানকে গুলতি দিয়ে মোকাবেলা করা যায় না। কামানকে মোকাবেলা করতে হয় কামান দিয়েই। প্রকৃত গণতন্ত্র, সুশাসন ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে হবে সব মুসলিম দেশেই। আধুনিক যুগে প্রচার মাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম। তবুও মুসলমানদের বিশ্ব মানের মিডিয়া নেই তেমন। ফলে মুসলমানরা বিধর্মীদের মিডিয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু এসবের অধিকাংশই ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী। তাই মুসলিম বিরোধী নানা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে। এতে সাধারণ মুসলমানরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। তাই তুরস্ক, পাকিস্তান ও মালয়েশিয়া যৌথভাবে বিশ্বমানের একটি টিভি চ্যানেল চালু করার চুক্তি করেছে গত ডিসেম্বরে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ওআইসির সম্মেলনকালে। উপরন্তু উক্ত সম্মেলনে ইসলাম ভীতির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে কাজ করার জন্য সব মুসলিম দেশ একমত হয়েছে। বলা হয়েছে, পাকিস্তানের রহমাতুল্লিল আলামিন অথরিটির মতো একটি শাখা গঠন করা হবে ওআইসিতে। এসব ভালো উদ্যোগ। তাই খুব দ্রুত হওয়া দরকার। অর্থাৎ মুসলমানদের শুধু সংখ্যায় বেশি হলেই চলবে না, সেই সাথে ধন, জ্ঞান, শক্তি, গণতন্ত্র, ঐক্য, সম্প্রীতি, বাণিজ্য, প্রচার, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য তথা সব ক্ষেত্রেই সর্বাধিক ও বিশ্বমানের হতে হবে। কারণ, বর্তমান যুগে কোয়ানটিটির চেয়ে কোয়ালিটি অধিক কার্যকর। এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের উদাহরণ যুক্তিযুক্ত। বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মধ্যে মোট ইহুদির সংখ্যা মাত্র ০.২%। তবুও ইহুদিরা খুবই শক্তিশালী। কারণ, তারা জ্ঞানে, সম্পদে, প্রচারে ও শক্তিতে সমৃদ্ধ। তাই সকলেই তাদেরকে সমীহ করে চলে। এই অবস্থায় পৌঁছতে হবে মুসলমানদের। তাহলেই মুসলমানদের ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। তারা পরাশক্তিও হবে। এটা বাস্তবতা ও সময়ের দাবি। লেখক: সরদার সিরাজ, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

add_28

নিউজটি শেয়ার করুন

Facebook
এ জাতীয় আরো খবর..
add_29
সর্বশেষ আপডেট
জনপ্রিয় সংবাদ

add_30
add_31
add_32

সংবাদ শিরোনাম ::